আহা! পরচর্চায় কী সুখ!

রুমানা নাওয়ার | মঙ্গলবার , ৩ মার্চ, ২০২৬ at ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ

কতকত সময় আমরা বেহুদা নষ্ট করি। সুন্দর মুহূর্তকে অসুন্দর করে তুলি লাগামহীন কথাবার্তায়। যে কথার কোন ভ্যালুজ নেই। আগেপরে কোনই উপকার নেই। শুধুই অপকারিতা। একজন থেকে দুজন হলেই অন্যকে নিয়ে পরচর্চায় মাতি। সেটা ঘরে যেমন বাইরেও তেমন। অফিসে বা আড্ডায় হরহামেশা চালাই। আহা কী যে সুখ খুঁজে পাই এতে বুঝিনা। সিম্পল সিলি সব বিষয়ে পরচর্চায় মাতে আহাম্মকের দল। অথচ চাইলে সময়গুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ অর্থবহ হয়ে উঠতে পারতো। তা না। আমরা উল্টো পথেই চলতে খুশী। আলাপের কত বিষয় আছে। সেটা হতে পারে আপনার প্রিয় মানুষটাকে নিয়ে। আপনার পঠিত কোন উপন্যাস নিয়ে। বা সামপ্রতিক দেখা কোন নাটক। কোন প্রবন্ধ নিবন্ধ। কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। অথবা মহামানব। এরকম হাজারো বিষয় আছে আলাপসালাপের। একবার শুরু করুন না। দেখবেন কি যে মজা কি আনন্দ এতে। বা আপনার ভাবনা অনুভূতি। আপনি যে বিষয়টা বা যে জিনিসটা পছন্দ করেন তা নিয়ে বলুন। অন্যরা শুনুক। আপনার ভিতরের মানুষটাকে জানুক। কেন প্রতিদিন প্রতিদিন নিজেকে সস্তা করছেন আরেকজনের কাছে। তেল নুন তরকারি চালডালের গল্প আর কত।আপনার পাশের মানুুষটি এসবে হয়তো অভ্যস্ত না। আপনার ওসব বস্তাপচা রাজনীতি গেরস্থালীর কথা পরচর্চা ওর কর্ণকুহরে পৌঁছায় না। তার মন অন্যকোথায় অন্যকোন খানে। এ পচা গন্ধ যুক্ত বাক্যালাপ তারজন্য না। তাকে, আপনি অমিয় বাণী শোনান। এমন সব বিষয়আশয় আলাপের সারবস্তু করুন যা অন্যরা মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে শুনবে।নিজেদের আলোকিত করবে। ভবিষ্যতের পথটা সুগম কল্যাণকর হবে। আপনার চলারপথ আপনার আদর্শ মনোভাবনা অন্যের আদর্শ করুন। সমাজ বদলাতে না পারুন। নিজেকে বদলান। নিজের ক্ষেত্র টাকে ফলপ্রসূ কল্যাণমুখী করুন। হাজারজন উপকৃত না হোক আপনার আশপাশের দুচারজন উপকৃত হোক। তাহলেই আপনি সার্থক। আমি চাকুরিতে প্রথম যখন জয়েন করি। কি বোরিং ফিল করছিলাম। অজপাড়াগায়ে পোস্টিং। মন চাইতো ছুটে পালাই। বড় দুবোন টিচার ছিলো। বড়োভাইয়া ওদের দেখিয়ে বলতোওদের অফিসার হতে হবে তোকে। মন খারাপটা ওখানে তো ছিলোই। তারচেয়ে বেশী ছিল। পরিবেশ পরিস্থিতি ছোটছোট বাচ্চাগুলো। এখানে এত সমালোচনা এত পরচর্চা। আমি রীতিমতো হতাশ। কী হবে এখানে থেকে। নিজের যা কিছু অর্জন তাও হয়তো হারাতে বসবো। আমার ঐ অস্থির সময়টায় পালাই পালাই জীবনটায় একজন মৃদুল কান্তি চৌধুরী স্যারের আগমন। আমার সামনে আলোরদূত হয়ে আসলেন। অবসর সময়ে উনি আমার চর্মচক্ষু এবং মর্মচক্ষে এনে দিলেন আলোর নাচন। সমাজনীতি রাষ্ট্রনীতি ধর্ম বিজ্ঞান এমন কোন বিষয় নেই তিনি আলাপ করতেন না। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতোন শুনতাম উনাকে। আমার মনটা থিতু হতে লাগলো আস্তে আস্তে। স্যার অনেক বেশী ডিগ্রী ধারী ছিলেন না। কিন্তু তাঁর জ্ঞান পাণ্ডিত্য তাঁর দর্শন এত বেশী সমৃদ্ধ ছিলো। হাজারো ডিগ্রিধারী উনার কাছে কুপোকাত। একজন মৃদুল কান্তি চৌধুরী আমার আইডল। আপনি না। চাকরি জীবনের এই ১৯ বছরে আর একজন ও মৃদুল কান্তি চৌধুরী পাইনি আমি। এ আফসোস আমার থেকেই যাবে।বয়সের ব্যবধান অনেক ছিলো আমাদের। আমার প্রাথমিকের শিক্ষাগুরু। তবুও আমাদের মতের মিল ছিলো।উনার আদর্শিক মত আর পথের অনুসারী ছিলাম আমি। ধর্ম নিয়ে ও উনার কি সুন্দর ব্যাখ্যা। হিন্দু বিধবাদের উপর চাপিয়ে দেয়া আচারের ঘোর বিরোধী ছিলেন। আরও নানা অসঙ্গতি নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। মুচকি হাসি মুখে রেখে এত সুন্দর করে কথা বলতেন। শুধুই শুনতে ইচ্ছে করতো। আমিও মুগ্ধ শ্রোতা ছিলাম। উল্লেখ্য স্যার মারা গিয়েছেন। কিন্তু স্মৃতিতে জাগরূক আজও। আমৃত্যু থাকবে উনি আমার মনে, চিন্তাচেতনায়। একজন মৃদুল কান্তি চৌধুরী শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় বেঁচে থাকুক সারাজীবন। স্যারের জন্য অতল শ্রদ্ধা। প্রতিটি ক্ষেত্রে, গল্পের আসরে কিংবা আড্ডায় চর্চা হোক সুন্দরের।

লেখক : গল্পকার ও লেখক

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাজনীতিতে ট্যাগিং -এর অবসান চাই
পরবর্তী নিবন্ধসদ্য চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের পুনর্বহাল : মানবিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন