নদী, বয়স পঁয়তাল্লিশ ছুঁই ছুঁই, হঠাৎ করে জানিয়ে দিলেন–তিনি আর সংসার করতে চান না। তিনি চুপচাপ নিজের মত বাঁচতে চান। সব সম্পর্ক থেকে নিঃশর্ত মুক্তি চান। কোনো দেনা–পাওনা না নিয়েই। কিন্তু বিপরীতে, তার স্বামী এই বিচ্ছেদ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। তার যুক্তি–মেয়ে বড় হয়েছে, ছেলে বড় হয়েছে। সংসার অনেকটাই গুছে গেছে, এখন সময় শুধু দু’জন মিলে একসাথে কাটানোর। তবু নদী তাঁর নিজের মত করে বাঁচতে চাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল। নিজের জীবনটা নতুন করে উপভোগ করার প্রত্যাশায়। শঙ্খনীল আর নদী–এই দম্পতির গল্প অনেকেই জানে। সমাজে তারা ‘সুখী দম্পতি’র উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। পঁচিশ বছরের সংসার, একটি মেয়ে, একটি ছেলে–সব মিলিয়ে বাইরের চোখে নিখুঁত পরিবার। অথচ, আজ নদী দাঁড়িয়েছেন বিচ্ছেদের জন্য, কোর্টের রায় চেয়ে। বিচারক প্রশ্ন করেন, ‘আপনার স্বামী কি অন্য কোনো সম্পর্কে জড়িত?’ আপনার স্বামী কি আপনাকে জ্বালায়! কষ্ট দেয়! নদী হাসি মিশ্রিত উত্তর, ‘আজও ওর জীবনে আমি ছাড়া কেউ নেই। কারণ আমিই ওর সবচেয়ে প্রিয়।’ তাহলে সে কি নেশা করে? “না। ওরকম কিছু না। এক সময় আমি গৃহিণী ছিলাম। প্রায় ১৪ বছর। কিন্তু এখন আমি নিজেও আয় করি, একজন কর্মজীবী নারী–আমার ওপরে অত্যাচার করার এখন আর সাহস নেই! কিন্তু এক সময় সাহস হয়তো ছিল!’ বললেন নদী। তাহলে বিচারক বললেন– একসময় তাহলে আপনি খুবই অত্যাচারিত হয়েছেন বৈকি?- বিচারকের এই প্রশ্নে যেন জমে থাকা এক নদীর জল একসাথে বয়ে গেল। দু‘নয়নে! “আজকের ভালোটা দেখেই আপনি বিচার করতে চাইছেন, বিচারক মহাশয়। কিন্তু কেউ দেখেছে আমার গত পঁচিশ বছরের ক্লান্তি, প্রতিদিন না বলা বেদনা, প্রতিটি দিনের অভিমান, প্রতিটি রাতে চুপচাপ কাঁদা? আমার স্বামী একজন ভালো মানুষ, খারাপ বাবা, ভালো অফিসার। কিন্তু ভালো প্রেমিক? না, সে কোনোদিন হতে পারেনি।
আমি না দেখে তাকে বাবা–মায়ের চাপে বিয়ে করেছিলাম। বিশ্বাস ছিল, এই সম্পর্কটা হবে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, যত্নে মোড়া। কিন্তু বিয়ের পর সেই আমার তো না। তার বউ হওয়া মানে রান্না করা, কাজের ভার নেওয়া, শাশুড়ির অপমান সহ্য করা, ননদের কটূ–কথা শোনা, দেবরের লোলুভ দৃষ্টি,-এসবই যেন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে গেল। আমি তখন কিছুই করতাম না, অসহায় একজন, বার বার আত্মহত্যা করার চিন্তা, তবু সংসারের প্রতিটি দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলাম এই আশায়–ভালোবাসা ফিরে পাবো। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। শ্বশুরবাড়ির গঞ্জনা, শারীরিক কষ্ট, আর ঘরের চাপ–সবকিছুর মাঝেও আমি চাইতাম, আমার স্বামী একটিবার পাশে এসে বলুক, ‘চলো, আজ দুজন মিলে ঘুরে আসি। তোমাকে একটা শাড়ি নিয়ে দিই, আমার জন্য এক গুচ্ছ রজনীগন্ধা’ কিন্তু সে চুপ থেকেছে। কিছুই ছিল না আমার জন্য।
সন্তান হওয়ার পর শরীরে কিছু বদল এল, চোখে ঘুমের অভাবে কালি, গায়ে ক্লান্ত্তি তখন আমি বুঝলাম, তার দৃষ্টিতে আমি কেমন যেন অচেনা। তার কাছে বাবা–মা,ভাই–বোন হয়ে উঠলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি শুধু এক সংসার সামলানো মানুষ, তার বউ নই। একবার নয়, বহুবার বলেছি, আমি আবার ভালোবাসা পেতে চাই, তোমার প্রেমিকা হয়ে থাকতে চাই। তোমার বন্ধু হতে চাই, সে শোনেনি। আমি তবুও থেকেছি। কারণ, ছেলে–মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে। বাবার স্নেহ থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করতে চাইনি। কিন্তু আমার স্বামী? সে কি একবারও আমার অভিমান বুঝতে চেয়েছে? আমার কদর বুঝতে চেয়েছে? সে আমাকে দিয়েছে সবচেয়ে ভালো বউ’র খেতাব, বন্ধুদের সামনে আমার ‘সহ্যশক্তি’র প্রশংসা করেছে। কিন্তু নিজের ভালোবাসাটা কোনোদিন তুলে দেয়নি। আমি তার একটিবার পাশে থাকাও পাইনি, একটিবার জিজ্ঞেস করাও পাইনি-‘তুমি কেমন আছো?’ আমি পঁচিশ বছর সংসার করেছি, মায়ের দায়িত্ব পালন করেছি, নিজের জীবনকে ফুরিয়ে দিয়েছি যেন। বিনিময়ে আমি পেয়েছি–শূন্যতা, হতাশা, অবহেলা! তবে আজ আর না। আজ আমি শুধু একজন ‘বউ’ হয়ে বাঁচতে চাই না। আমি স্বাধীন মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই। আমি একটু সুখ চাই, নিজের মতো করে। একটু শান্তি চাই, যেটা কাউকে বোঝাতে হয় না। একটু ভালোবাসা চাই–নিজের জন্য। বেশি কিছু চেয়েছি কি আমি? উইরঅনার—’
নদীর কথা শুনে পুরো আদালত স্তব্ধ। এমন সৎ, এমন গভীর হৃদয়ের কথা শুনে কিছু বলার থাকে না কারোরই। বিচারকের চোখেও যেন জল। নিস্তব্ধতা সবার মাঝে– এই দাবি কি নদীর একার? না কি, এই গল্পটা পৃথিবীর অনেক নদীর?
লেখক : আইনজীবী











