আসাদ চৌধুরীর ‘ফাগুন এলেই’

ভাষা, আশা ও প্রতিবাদের কাব্যভুবন

খোরশেদ মুকুল | শুক্রবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

আসাদ চৌধুরীর (১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩৫ অক্টোবর ২০২৩) কবিসত্তার এক বিশাল অংশ জুড়ে আছে তাঁর স্বদেশভাবনা ও জাতীয় চেতনা। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতাপরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরএই দীর্ঘ ঐতিহাসিক পর্বের প্রতিটি বাঁক তিনি গভীর মনোযোগে প্রত্যক্ষ করেছেন। শহিদ মিনার তাঁর মনে স্বাধীনতার অনিবার্য আকাঙক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে। দেশের প্রগতিশীল ও বৃহত্তর আন্দোলনগুলোর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়। ফলে এসব আন্দোলন ও সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী মানুষদের প্রতি তাঁর হৃদয়ে জন্ম নিয়েছে গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালোবাসা, যার প্রতিফলন ছড়িয়ে আছে তাঁর অসংখ্য কবিতায়। সমাজে বিরাজমান অসাম্য, শোষণ ও বৈষম্য আসাদ চৌধুরীকে গভীরভাবে আহত করেছে। শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চিত জীবন তাঁকে শুধু বেদনাহতই করেনি, করেছে ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী। তিনি প্রত্যাশা করেন এমন এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে শোষণ ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে এবং স্বাধীনতা পূর্ণ মহিমায় প্রতিষ্ঠা পাবে। তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজন আদর্শবাদী, ত্যাগী ও সাহসী মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস। প্রবহমান সময়ের প্রতিটি স্পন্দন যেন তাঁর কবিতার শরীরে লেগে থাকে, এই কালসচেতনতা ও রাজনৈতিক মনস্কতা তাঁর কবিতার এক অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। সময়ের নানাবিধ আলোড়ন তাঁর সংবেদনশীল সত্তায় যে তরঙ্গ ও বোধের জন্ম দিয়েছে, তারই শৈল্পিক ও পরিশীলিত শব্দবিন্যাসে তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর নিজস্ব কাব্যভুবন।

এই উপমহাদেশ দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক চিন্তা ও শাসনের নিগড়ে আবদ্ধ থাকলেও তার বীর সন্তানরা যুগে যুগে শোষণ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ফুঁসে উঠেছে। বেনিয়াদের শাসন শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপরও ভয়াবহ আঘাত হেনেছিল। সেই আগ্রাসনের পরিণতি উপলব্ধি করেই বিদ্রোহ ধীরে ধীরে রূপ নেয় বৃহৎ আন্দোলনে। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েও আমরা পাকিস্তানি শাসকদের বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার হই, বিশেষত উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায়। বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আমরা তা প্রতিহত করি। দমনপীড়ন, গুলি ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় রাষ্ট্রভাষার অধিকার; ভাষার জন্য প্রাণদানের অনন্য গৌরব লাভ করে বাঙালি জাতি। এই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শেকড়সন্ধানী চেতনার ধারক কবি আসাদ চৌধুরী; যিনি ভাষা আন্দোলন, দেশ ও সংস্কৃতিকে কাব্যে ধারণ করেছেন। বরিশালের উলানিয়ায় জন্ম নেওয়া এই বহুমাত্রিক প্রতিভা কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, সম্পাদনা ও আবৃত্তিতে সমান কৃতিত্ব রেখে বাংলা সাহিত্যে এক দায়বদ্ধ, কালসচেতন শিল্পমানস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হলেও বাংলা সন মোতাবেক তা ১৩৫৮ সালের ৮ ফাল্গুনই হয়, বৃহস্পতিবার। ফাল্গুন ও চৈত্র মিলে যে বসন্তের আবির্ভাব, সেই ঋতুরাজের কোলে বসেই রচিত হয়েছিল আমাদের ভাষার রক্তাক্ত ইতিহাস। রক্তাক্ত কৃষ্ণচূড়ার পিচ্ছিল গালিচা। প্রকৃতিতে বসন্ত মানেই নবজাগরণ, ডালে ডালে কচি পাতা, প্রকৃতির অলিখিত কবিতায় ফুলের উল্লাস, আর বাতাসে কোকিলের কুহুতান। সেই কুহু কুহু ধ্বনিতে চারপাশ ভরে ওঠে এক মায়াবী আবেশে। আমরা সেই বসন্তের ফুল হাতে নিয়ে শহিদ মিনারে অর্পণ করি আমাদের শ্রদ্ধা, আমাদের অশ্রু ও অঙ্গীকার; আমাদের আশা ও প্রতিবাদ। কিন্তু আসাদ চৌধুরী কেবল প্রকৃতির এই রোমান্টিক সৌন্দর্যে থেমে থাকতে চান না। কুহু ডাকে মত্ত কোকিলকে তিনি নিছক ‘কোকিল’ বলে ডাকতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর কাছে কোকিল কোনো পাখি নয়; সে ভাষা, আশা ও প্রতিবাদের প্রতীক। নামকরণে কোকিলের কিছু আসে যায় না, কিন্তু মানুষের চেতনায় তার অর্থ বদলে যায়। তাই এই আগুনরাঙা ফাগুন তাঁর কবিতায় নিছক ঋতু নয়; এটি এক দুর্বার প্রতিবাদের ঝড়, যেখানে বসন্তের ফুল ঝরে পড়ে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষার অধিকারে। যেমনটি তিনি তার ‘ফাগুন এলেই’ কবিতায় লিখেছেন,

আমি যে তার নাম রেখেছি আশা,

নাম দিয়েছি ভাষা,

কত নামেই ‘তাকে’ ডাকি

মিটে না পিপাসা।

ফাগুন আনে ফুলের তোড়া

কখনো প্রতিবাদ

ফাগুন যেন পাগলা ঘোড়া,

মানতে চায় না বাঁধ।

এই কবিতাংশে আসাদ চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে প্রকৃতির প্রতীকের ভেতর দিয়ে গভীরভাবে রূপায়িত করেছেন। “কত নামেই ‘তাকে’ ডাকি/ মিটে না পিপাসা”বলার মাধ্যমে ভাষার জন্য বাঙালির অতৃপ্ত আকাঙক্ষা ধরা পড়ে। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপরিচয় ও মর্যাদার প্রতীক। এর পরের স্তবকে ফাগুন দ্বৈত রূপে হাজির হয়, একদিকে ফুলের তোড়া, অন্যদিকে প্রতিবাদ। এই দ্বৈততা ভাষা আন্দোলনের বাস্তবতারই শিল্পরূপসৌন্দর্য ও রক্ত, বসন্ত ও বুলেট একসঙ্গে সহাবস্থান করে। “ফাগুন যেন পাগলা ঘোড়া,/ মানতে চায় না বাঁধ” এই উপমাটিও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দমননীতি, নিষেধাজ্ঞা ও রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে অদম্য গণপ্রতিরোধের প্রতীক। সার্বিকভাবে, কবি এখানে ফাগুনকে ইতিহাস, ভাষা ও প্রতিবাদের এক অনিবার্য শক্তিতে রূপ দিয়েছেন, যা কোনো শাসনের বাঁধ মানে না, মানতে পারে না।

ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ঋতু, প্রকৃতি ও প্রতীকের মাধ্যমে আরও এক ধাপ গভীরে নিয়ে গেছেন কবি। তাছাড়া ভাষা আন্দোলন যে শুধু প্রতিবাদের ঘটনা ছিল না, বরং আত্মপরিচয়ে ফেরার এক মহাযাত্রাএই উপলব্ধিই এখানে প্রধান। কবি শহিদ মিনারকে নিছক স্থাপত্য বা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেখেন না; তিনি তাকে রূপ দেন প্রত্যাবর্তন, শিকড় ও ঘরে ফেরার প্রতীকে। ফলে কবিতাটি স্মরণ আর সংগ্রামের মধ্যবর্তী এক আবেগঘন সেতু হয়ে ওঠে। কবি বলেন,

ফাগুন এলেই অলি এসে জোটে

কলিরা পায় লোটে,

তাকে তোমরা শহীদ মিনার বলো।

আমি যে তার নাম রেখেছি ফেরা,

নিজের ঘরে ফেরা, ঘর থেকে যে পথে ওড়ে

তেমন বিহঙ্গেরা।

এখানে কবি ফাগুনকে ভাষা আন্দোলনের প্রতীকী সময়রূপে ব্যবহার করেছেন। “ফাগুন এলেই অলি এসে জোটে/ কলিরা পায় লোটে”এই চিত্রকল্পে ‘অলি’ হয়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে ওঠা জনমানস, আর ‘কলি’ রূপ নেয় দীর্ঘদিন অবদমিত প্রতিবাদী চেতনার। প্রকৃতির উপাদান ব্যবহার করেও কবি আসলে একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন; যখন মানুষ ভয়, নিষেধাজ্ঞা ও দমননীতি অগ্রাহ্য করে ভাষার দাবিতে একত্রিত হয়েছিল। এখানে ফাগুন মানে ঋতু নয়, বরং জাগরণ ও আন্দোলনের কাল।“তাকে তোমরা শহীদ মিনার বলো” পঙক্তির মাধ্যমে প্রচলিত নামকে মেনে নিয়েও তিনি তা নতুন অর্থে পুনর্নামকরণ করেছেন-“আমি যে তার নাম রেখেছি ফেরা,/ নিজের ঘরে ফেরা”। শহীদ মিনার তাঁর কাছে শুধু স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং ভাষা, পরিচয় ও মর্যাদায় ফিরে আসার প্রতীক। “ঘর থেকে যে পথে ওড়ে / তেমন বিহঙ্গেরা” পঙক্তি শহীদদের আত্মত্যাগকে তুলে ধরেতাঁরা ঘর ছেড়েছেন ঘর হারানোর জন্য নয়, জাতিকে তার শেকড়ে ফেরানোর জন্য। ফলে পঙক্তিগুলো ভাষা আন্দোলনকে স্মৃতির বাইরে নিয়ে আসে, আত্মপরিচয়, প্রত্যাবর্তন ও জাতিসত্তার পুনর্জাগরণের এক মানবিক কাব্যভুবনে রূপান্তরিত করে।

ফাগুনকে ইতিহাস, আত্মসমালোচনা ও প্রতিবাদের সমন্বিত প্রতীকে রূপ দিয়েছেন কবি এই কবিতায়। যেখানে ফাগুন শুধু আন্দোলনের সময়কাল নয়, হয়ে ওঠে আত্মদর্শনের আয়নাও বটে, যেখানে জাতি নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে চেনে, নিজের ভুলচুক সংশোধনের তাগিদ পায়। ভাষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা কবির কাছে কেবল গৌরবের স্মৃতি নয়; তা আত্মশুদ্ধি ও দায়বদ্ধতার পাঠও। তাই প্রকৃতি, পাখি, অলি, কলিসবকিছু মিলিয়ে ফাগুন এখানে এক নৈতিক ও ঐতিহাসিক চেতনার নাম। কবি বলেন,

ফাগুন যেন ফুপুর আরশী

দেখি নিজের মুখ,

ফাগুন শেখায়, শুধরে লও হে

জীবনের ভুলচুক।

ফাগুন এলেই অলি এসে জোটে

কলিরা পায় লোট

বলবে তাকে শহীদ মিনার? বলো।

ফাগুন যেন ফুপুর আরশী/ দেখি নিজের মুখ”এই উপমায় ফাগুন হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের দর্পণ। ভাষা আন্দোলনের ফাগুন আমাদের সামনে দাঁড় করায় প্রশ্নের মুখে; আমরা কে, কোথায় ভুল করেছি, কীভাবে সেই ভুল সংশোধন করা যায়। তাই কবি বলেন, “ফাগুন শেখায়, শুধরে লও হে/ জীবনের ভুলচুক”এটি নিছক স্মরণ নয়, বরং আত্মসমালোচনার আহ্বান। একইভাবে, “ফাগুন এলেই অলি এসে জোটে/ কলিরা পায় লোট” এখানে অলি হলো জাগ্রত জনতা, আর কলি হলো সুপ্ত চেতনা, যা আন্দোলনের স্পর্শে প্রস্ফুটিত হয়। কবি যেন পাঠককে বাধ্য করেন নতুনভাবে ভাবতে: শহিদ মিনার কি শুধু একটি স্থাপনা, নাকি তা চেতনার সমবেত রূপ? এই প্রশ্নোত্তরময় কাঠামোর মধ্য দিয়ে কবি নামকরণকে অস্বীকার করেন না, কিন্তু তাকে চূড়ান্তও মনে করেন না। কোকিল, শহিদ মিনারসবই ছাপিয়ে উঠে আসে তাদের অন্তর্গত অর্থ: ভাষা, আত্মপরিচয়, প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগ।

আসাদ চৌধুরী এই কবিতায় ভাষা আন্দোলনকে কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং তা বাঙালির সামগ্রিক আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ফাগুন তাঁর কাব্যে নিছক ঋতু নয়এটি প্রতিবাদ, আত্মজাগরণ ও আত্মসমালোচনার সময়চিহ্ন। কোকিল, অলি, কলি কিংবা শহীদ মিনারসব প্রতীকই নামের গণ্ডি অতিক্রম করে ভাষা, আশা, প্রত্যাবর্তন ও আত্মত্যাগের গভীর অর্থ বহন করে। শহীদ মিনার হয়ে ওঠে ঘরে ফেরার প্রতীক, আর শহীদরা রূপ নেয় সেই বিহঙ্গে, যারা নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে জাতিকে তার শেকড়ে ফিরিয়ে এনেছেন। এভাবে আসাদ চৌধুরীর কবিতা স্মৃতিচারণের সীমা ছাড়িয়ে ইতিহাসকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে, প্রজন্মকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং ভাষা ও স্বাধীনতার দায় নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর কাব্যভুবনে ভাষা আন্দোলন তাই এক অনিবার্য মানবিক ও কালজয়ী চেতনার নাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসিয়াম সাধনার মাস চরিত্র নির্মাণের উত্তম সময়
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্য ও শব্দ বিলুপ্তি প্রসঙ্গ