প্রিয় পাঠক, আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই–এই কলামে আমি লিখেছিলাম ‘শিশুসাহিত্য গবেষণায় যুক্ত হোক নতুন মেধাবী মুখ’ শিরোনামে একটি রচনা। এতে বলেছিলাম, বহু ঘাত–প্রতিঘাত পেরিয়ে আমাদের শিশুসাহিত্য এখন সর্বপ্রান্তস্পর্শী মাধ্যম হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। সাহিত্যের অপরাপর শাখার মতো শিশুসাহিত্যও এগিয়ে গেছে সমান্তরালে, হয়েছে সুদূর প্রসারী ও দিগন্ত বিস্তারী। সম্ভাবনার বাংলাদেশে শিশুসাহিত্যের অগ্রযাত্রা রীতিমত গর্বের বিষয়। আমীরুল ইসলাম তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমাদের শিশুসাহিত্য কখনো জঙ্গিবাদ বা মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেয়নি। পাকিস্তান আমল জুড়ে ছিল মৌলবাদী চেতনার ও ধর্মীয় রাজনীতির সুবিধাবাদী বিকাশ। কিন্তু আমরা সেখানে বৃত্তাবদ্ধ থাকিনি। কিছুদিনের মধ্যে আমরা ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার সংগ্রামে আত্মত্যাগী হয়ে উঠলাম। এলো স্বাধীনতাসংগ্রাম। …আমরা মুক্তিকামী লেখকরা শিশুসাহিত্যের পথে এগিয়ে চললাম। গণমানুষের শিশুসাহিত্য, মানুষের অধিকার যেখানে বড় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বতন্ত্র ধারার শিশুসাহিত্য যাঁরা নির্মাণ করেছেন, তাঁদের তালিকা অনেক বড়। অনেকে জীবন উৎসর্গ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায়।’ সে হিসেবে বলা যায়, আমাদের শিশুসাহিত্যিকরা সবসময় সময়ের দাবি মিটিয়ে এসেছেন নানা সময়ে। আন্দোলনে–সংকটে পালন করেছেন যুগান্তকারী ভূমিকা। লুৎফর রহমান রিটন বলেন, ‘শিশুসাহিত্যিকদের ফুলপাখি নদী নিয়েই লিখলে শুধু হবে না, লিখতে হবে সমাজের অবকাঠামোগত বিষয়, অন্যায় অবিচার নিয়ে, মানবিকতার পক্ষে, সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, অসামপ্রদায়িকতার পক্ষে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে। আমি আমার সারাজীবন সেই কাজটাই একাগ্রচিত্তে করেছি।’
বলেছিলাম, ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য’ বিষয়ে গবেষণা খুব কমই হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলা ভাষায় আমাদের দেশে স্বাধীনতা–উত্তরকালে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে রয়েছে, উৎসে ফেরার ছলচাতুরী – হায়াৎ মামুদ (প্রকাশক : দি মিডিয়া, ঢাকা), ১৯৯৬, শিশুসাহিত্য : নানা প্রসঙ্গ– আতোয়ার রহমান (প্রকাশক : বাংলা একাডেমি, ঢাকা), ১৯৯৮, শিশুসাহিত্যের কতিপয় রথী– আতোয়ার রহমান (প্রকাশক : বাংলা একাডেমি, ঢাকা), ২০০১, শিশুসাহিত্যের রূপরেখা – আহমাদ মাযহার (প্রকাশক : শোভা প্রকাশ, ঢাকা), ২০০৯, বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য : মনন ও মনীষা – আহমাদ মাযহার (প্রকাশক : কথাপ্রকাশ, ঢাকা), আমাদের শিশুসাহিত্য : নানারঙের ঢেউ – সুজন বড়ুয়া ( প্রকাশক : অক্ষর প্রকাশনী, ঢাকা) ২০১৭, শিশুসাহিত্যের আলো ছায়া –আমীরুল ইসলাম (প্রকাশক–সপ্তডিঙা, ঢাকা) প্রভৃতি। সেই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হয়েছে আমার কয়েকটি গবেষণাগ্রন্থ। সেগুলো হলো: বাংলাদেশের ছড়া : রূপ ও রূপকার– রাশেদ রউফ (প্রকাশক :বইপত্র, ঢাকা), ২০০৭, আমাদের শিশুসাহিত্য : ছন্দোময় সোনালি রেখা– রাশেদ রউফ (প্রকাশক : চন্দ্রাবতী একাডেমি, ঢাকা), ২০১৬, বাংলাদেশের কিশোরকবিতা : গতিপ্রকৃতি ও অগ্রগতি (প্রকাশক : ইন্তামিন প্রকাশন, ঢাকা), ২০১৮ ও শিশুসাহিত্য ও আমাদের দায়বদ্ধতা – রাশেদ রউফ (প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু, চট্টগ্রাম), ২০১৯। এছাড়াও আছে আরো কয়েকটি গ্রন্থ। উল্লিখিত বইগুলোতে দেশের শিশুসাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের ওপর আলোচনা স্থান পেলেও শিশুসাহিত্যগবেষণা নিয়ে খুব একটা হয় নি।
আমাদের প্রত্যাশা পূরণে অতি সম্প্রতি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হলো আলম সাইফুলের অসাধারণ গবেষণা গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যভাবনা (১৯৭১–২০০০)’। গ্রন্থের বিশেষত্ব হলো, ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য–গবেষণাভাবনা: একটি পর্যালোচনা’ এবং ‘১১ জন কৃতী লেখকের শিশুসাহিত্যকর্মের পাঠ–প্রতিক্রিয়া’। আলোচ্য গ্রন্থে শিশুসাহিত্যগবেষণা বিষয়ে বিশদ আলোচনাটি গ্রন্থটির অমূল্য সংযোজন বলে আমি মনে করি। এছাড়া, ১১ লেখকের শিশুসাহিত্যকর্মের পাঠ–প্রতিক্রিয়ায় এসেছে এমন কয়েকজন কৃতী লেখক, যাঁদের শিশুসাহিত্যকর্ম নিয়ে ইতোপূর্বে তেমন আলোচনাই হয় নি। যেমন, মোহাম্মদ ফেরদাউস খান, আবদুল্লাহ আল মুতী, আলাউদ্দিন আল আজাদ ও শওকত আলী। তাছাড়া যাঁদের ওপর আলোচনা স্থান পেয়েছে, তাঁরা হলেন, শওকত ওসমান, আতোয়ার রহমান, শামসুর রাহমান, ফয়েজ আহমদ, সুকুমার বড়ুয়া, বিপ্রদাশ বড়ুয়া ও সেলিনা হোসেন।
‘শিশুসাহিত্যের কতিপয় রথী’ গ্রন্থে যাঁদের স্থান দিয়েছেন গ্রন্থকার আতোয়ার রহমান, তাঁদের বাদ দিয়ে বাকি ১১জনকে রাখা হয়েছে আলোচ্য গ্রন্থে। তবে কবি ও কথাসহিত্যিক হিসেবে খ্যাত হলেও দেশের বেশ কয়েকজন লেখক শিশুসাহিত্য রচনায়ও দিকপালের ভূমিকা পালন করেছেন বা করছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন : সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫–২০১৬), আল মাহমুদ (১৯৩৬–২০১৯), রাহাত খান (১৯৪০– ২০২০), আসাদ চৌধুরী (১৯৪৩–২০২৩), নির্মলেন্দু গুণ (১৯৪৫), হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭–২০০৪), হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮–২০১২) প্রমুখ। এছাড়া শিশুসাহিত্যিক হিসেবে পুরোধাব্যক্তিত্ব হলেন এখলাসউদ্দিন আহমদ (১৯৪০–২০১৪), বুলবন ওসমান (১৯৪০-), শাহজাহান কিবরিয়া (১৯৪১-), আলী ইমাম (১৯৫০–২০২২), জুবাইদা গুলশান আরা (১৯৪২–২০১৭), লুৎফর রহমান রিটন (১৯৬১-), আমীরুল ইসলাম (১৯৬৪-)। তাঁদের প্রত্যেকেরই ছড়াসমগ্র কিংবা শিশু–কিশোর সাহিত্যসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের ওপরও পৃথক আলোচনা সংযোজন করা গেলে গ্রন্থের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতো নিঃসন্দেহে। গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায় ‘উপসংহার ও প্রস্তাবনা’–য় যদিও এ বিষয়ে স্পষ্ট করা হয়েছে। এ রচনার একেবারে শেষের দিকে লেখক আলম সাইফুল উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশের আরও অনেক প্রথিতযশা শিশুসাহিত্যিকের সাহিত্য–কর্মের পাঠ আলোচনার দাবি এড়ানো যায় না; তাঁদের সাহিত্যকর্মের পাঠ–পর্যালোচনা ব্যতীত আলোচ্য গবেষণাটি পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।’ এই বক্তব্যটি গবেষকের সরল স্বীকারোক্তি। তিনি এখানে কয়েক জনের নামও উল্লেখ করেছেন। যাঁরা শিশুসাহিত্যে অবদান রেখেছেন এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে স্বীকৃতি লাভ করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন : মাহবুব তালুকদার, মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির, হেলেনা খান, মুশাররফ করিম, শাহজাহান কিবরিয়া, রফিকুল হক, আখতার হুসেন, ফরিদুর রেজা সাগর, শরীফ খান, কাইজার চৌধুরী, আসলাম সানী, রাশেদ রউফ, ঝর্ণাদাশ পুরকায়স্থ, আনজীর লিটন, রফিকুর রশীদ, ধ্রুব এষ, তপংকর চক্রবর্তী, তপন বাগচী প্রমুখ। গবেষণার সময়কাল যেহেতু ১৯৯১–২০০০ সাল, সেহেতু এঁদের অনেকেরই কণ্ঠস্বর হয়তো সেই সময়ে স্পষ্ট হয়নি। এ বিবেচনায় গবেষক পার পেয়ে গেলেন।
গবেষক আলম সাইফুল দিনাজপুর সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের নতুন পাড়ায় ১৯৭১ সালের ৩১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯১ সালে মানবিকে স্নাতক ও ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯৬ সালে স্নাতকোত্তর এবং ঢাবির আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে ২০০৩ সালে মনোভাষাবিজ্ঞানে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৭ সালে সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জন করেন এমবিএ ডিগ্রি। এ ছাড়া সম্পন্নকৃত তাঁর গবেষণাকর্ম ও সাহিত্যকর্ম হলো : ‘বাঙালির ভাষা সংস্কৃতি সমাজভাবনা‘, ‘পাণ্ডুর জীবনের কর্ণে সোনার দুল‘ এবং ‘বাঙালি শিশুর বাঙলা ভাষা অর্জন : মনোভাষিক বিশ্লেষণ‘ শিরোনামে গ্রন্থ।
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে ‘গবেষণা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যদিও আমরা জানি, এ ধরনের কোনো গবেষণাই পূর্ণাঙ্গ হয় না। একটা প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে ধীরে ধীরে পরবর্তীকালে গবেষকরা একে পূর্ণাঙ্গতা দান করেন। এ গ্রন্থ তেমন এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যেটি আমাদের প্রত্যাশাকে স্পর্শ করেছে। আগামীতে এটি আরো পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ হবে–সেই প্রত্যাশা আমাদের। বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানাই, আর আলম সাইফুলকে জানাই অভিনন্দন।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী;
ফেলো, বাংলা একাডেমি।











