আরব সাগর থেকে বাংলাদেশিসহ ১৮ নাবিক উদ্ধার

বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ১১ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ

আরব সাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার সময় জাহাজটিতে ছয়জন বাংলাদেশি নাবিকসহ বিভিন্ন দেশের মোট ২২ জন ক্রু সদস্য ছিলেন। প্রাণঘাতী এই হামলার পর আগুন, বৈরি আবহাওয়া এবং উত্তাল সাগরে প্রায় ২১ ঘণ্টা মৃত্যুভয়ের মধ্যে ভেসে থাকার পর শেষ পর্যন্ত তাদের উদ্ধার করে পাকিস্তান নৌবাহিনী। গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টা নাগাদ জাহাজটিতে হামলার ঘটনা ঘটে। তবে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কারা জাহাজটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জাহাজটির ছয় বাংলাদেশি নাবিকের মধ্যে পাঁচজন পাকিস্তানের করাচিতে নিরাপদে রয়েছেন। অপর একজন এখনো ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজে অবস্থান করছেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সবাই শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন।

জাহাজটির নাম ‘এমভি গোল্ড অটাম’। এটি চীনের সাংহাই বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে ওমানের সোহার বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিল। হামলার সময় জাহাজটি ওমান উপকূল থেকে প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইল দূরে আরব সাগরে অবস্থান করছিল, যা ইরানযুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির ঠিক আগমুহূর্তে সংঘটিত হয়।

জাহাজে থাকা বাংলাদেশি নাবিক এহসান সাবরি রিহাদ হামলার ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, দুপুরের খাবারের পর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ বিকট শব্দে জাহাজ কেঁপে ওঠে। দ্রুত ইঞ্জিন কক্ষে গিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক পেলেও ডেকে উঠে দেখেন ক্রেনের নিচে আগুন জ্বলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, যা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তারা।

তিনি জানান, একের পর এক আঘাতে জাহাজের বিভিন্ন অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ আঘাতে জাহাজের একপাশে বড় গর্ত সৃষ্টি হয়। এতে মূল ইঞ্জিন অচল হয়ে পড়ে। আগুনে জাহাজটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে জাহাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন ক্যাপ্টেন। এরপর নাবিকেরা লাইফবোটে আশ্রয় নেন। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি লাইফবোট ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্য লাইফবোটের ইঞ্জিনও বিকল হয়ে যায়। উত্তাল সাগরে দুলতে থাকা লাইফবোটে শুরু হয় আরেক দুঃসহ অধ্যায়। ঢেউয়ের পানি ঢুকে পড়ায় সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। চরম আতঙ্কে মৃত্যু আসন্ন ভেবে অনেকেই দোয়া পড়তে থাকেন।

প্রায় সাত ঘণ্টা পর তারা একটি জাহাজ দেখতে পান এবং সংকেত দেওয়ার পর সেটির সহায়তায় যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন। পরে পাকিস্তান নৌবাহিনী উদ্ধার অভিযানে এগিয়ে আসে। বুধবার সকাল নাগাদ পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ ‘পিএনএস হুনাইন’ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজে আটকে থাকা ১৪ জনকে উদ্ধার করে। এরপর অন্য জাহাজ থেকে আরও চারজনকে উদ্ধার করা হয়।

মোট ১৮ জনকে নিয়ে উদ্ধারকারী জাহাজটি করাচি বন্দরে পৌঁছায়। সেখানে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে ক্যাপ্টেনসহ চারজন নাবিক এখনো ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজে অবস্থান করছেন, যাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি রয়েছেন। জাহাজটি ডুবে না যাওয়ায় সেটিকে পরে টেনে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

উদ্ধার হওয়া নাবিকদের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নাবিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, জাহাজটিতে হামলা কারা চালিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাটি এমন একটি সময়ে ঘটেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের সমুদ্রপথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই হামলা আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলেও সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলেবাননে ইসরায়েলি হামলায় বাংলাদেশি নারী নিহত
পরবর্তী নিবন্ধকক্সবাজারে সুপেয় পানির সংকট, ভোগান্তি