আরও একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত

পাইলটের খোঁজে চলছে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এখন পর্যন্ত সাতটি সামরিক বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, আহত ৩৬৫ সেনা ১৬০টির বেশি শত্রুপক্ষের ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে : ইরান ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ না খুললে নরক নেমে আসবে : ট্রাম্প

আজাদী ডেস্ক | রবিবার , ৫ এপ্রিল, ২০২৬ at ৭:১৩ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে উত্তেজনা নাটকীয় মাত্রা পেয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, দেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চল এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। ঘটনাটিকে যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকরা, কারণ একই দিনে একাধিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

ইরানের খাতামুলআম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদরদপ্তর জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি এফ১৫ যুদ্ধবিমান সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে। একইসঙ্গে একটি এ১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্য করে হামলার কথাও জানানো হয়েছে, যা পরে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে জানা গেছে, ১০ বিমানের পাইলট নিরাপদে বের হতে সক্ষম হলেও এফ১৫এর এক পাইলট এখনও নিখোঁজ। মার্কিন বাহিনী একজন ক্রুকে উদ্ধার করতে পারলেও অন্যজনের খোঁজে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পাইলটকে ঘিরে প্রতিযোগিতা : নিখোঁজ পাইলটকে ঘিরে কার্যত প্রতিযোগিতায় নেমেছে দুই পক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ ‘কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (সিএসএআর) অভিযান চালালেও ইরানও একইসঙ্গে ওই পাইলটকে খুঁজছে। রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী নিখোঁজ পাইলটকে উদ্ধারের জন্য ‘ব্ল্যাকহক’ হেলিকপ্টার পাঠালে সেগুলোর ওপর গুলি চালায় ইরানি বাহিনী। হেলিকপ্টারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, ফলে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। অন্যদিকে, ইরানের কোহগিলুয়ে ও বোয়েরআহমদ প্রদেশে স্থানীয় প্রশাসন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, পাইলটকে জীবিত ধরে দিলে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত পুরস্কারের কথাও বলা হয়েছে।

তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন কোনো পাইলটকে আটক করার খবর অস্বীকার করেছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে একজন পাইলট উদ্ধার করেছেএ দাবিকেও ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে তেহরান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে বড় ধাক্কা হিসেবে না দেখিয়ে বলেন, এটি চলমান যুদ্ধের অংশ। এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটা যুদ্ধ। আমরা যুদ্ধের মধ্যেই আছি। এটি আলোচনার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। তবে একই সময়ে নিজের প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘চুক্তি’ করতে বা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে আল্টিমেটাম দিয়েছেন। অন্যথায় ইরানে ‘জাহান্নাম নেমে আসবে’ বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাবি : ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড দাবি করেছে, নতুন ও সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই যুদ্ধবিমানগুলো ভূপাতিত করা সম্ভব হয়েছে। গতকাল রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিকারি বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য ‘চরম অপমান’। তিনি আরও জানান, এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হচ্ছে এবং শিগগিরই ইরান তাদের আকাশসীমায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।

ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ১৬০টিরও বেশি ড্রোন, একাধিক যুদ্ধবিমান এবং কয়েক ডজন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। ইরানের সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী রেজা এলহামি বলেন, এমকিউ, হার্মিস এবং লুকাস মডেলের উন্নত ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে। তার মতে, এটি ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতার প্রমাণ এবং শত্রুপক্ষের প্রোপাগান্ডা ভেঙে দিয়েছে।

সাতটি উড়োজাহাজ হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র : বর্তমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সাতটি সামরিক উড়োজাহাজ হারিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে কুয়েতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’এ তিনটি এফ১৫, ইরাকে কেসি১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান বিধ্বস্ত, সৌদি আরবে ই৩ সেন্ট্রি ধ্বংস, সর্বশেষ এফ১৫ই ও এ১০ যুদ্ধবিমান। এছাড়া একটি এফ৩৫ যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জরুরি অবতরণ করে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৩৬৫ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা ১৩ জনে স্থির রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে আকাশ প্রতিরক্ষার বড় অংশ ধ্বংস করলেও ইরানের বহনযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো কার্যকর রয়েছে, যা যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করেছে, তারা এখন পর্যন্ত ৪৯৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজারের বেশি ড্রোন প্রতিহত করেছে। বাহরাইন জানিয়েছে, তারা ৪৫৩টি ড্রোন ও ১৮৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীর হয়েছে। ইরানি বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেও তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে এবং সামরিকভাবে জবাব দেয়। একই সময়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি প্রস্তাবের ভোটও স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, কূটনৈতিক সমাধানের পথ তত সংকুচিত হচ্ছে।

এদিকে ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, দেশটির ৩০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এতে শিক্ষা ও গবেষণা অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধটি দ্রুত বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তাসবকিছুই এখন এই সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার দাবি করছে, অন্যদিকে ইরান প্রতিরোধ ও পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। নিখোঁজ পাইলটকে ঘিরে প্রতিযোগিতা এবং আকাশযুদ্ধের এই ধাপটি সংঘাতকে আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজলবায়ু সহনশীল পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ : ডিসি
পরবর্তী নিবন্ধচন্দনাইশে অলি আহমদের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল