আমি এখনো প্রেসিডেন্ট, আমাকে অপহরণ করা হয়েছে

নিউ ইয়র্কের আদালতে মাদুরো ।। এবার গ্রিনল্যান্ড দখলের আওয়াজ তুললেন ট্রাম্প, ইরানের সঙ্গেও যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে

| মঙ্গলবার , ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৪:৩১ পূর্বাহ্ণ

মাদকসন্ত্রাসবাদ মামলায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গতকাল নিউ ইয়র্কের আদালতে বিচারকের সামনে হাজির করা হয়। বিচারক মাদুরোকে নিজের পরিচয় দিতে বললে তিনি স্প্যানিশ ভাষায় বলেন, আমি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। তখন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, তিনি বৈধ নেতা নন। তার উত্তরে মাদুরো বলেন, আমি নির্দোষ। আমাকে ভেনেজুয়েলার কারাকাসে আমার বাড়ি থেকে ধরে আনা হয়েছে। আমি এখনো আমার দেশের প্রেসিডেন্ট। আমি একজন ভদ্র মানুষ, সৎ মানুষ। আমাকে অপহরণ করা হয়েছে।

মাদুরোকে কারাগারের পোশাক ও হাতকড়া পরিয়ে আদালতে আনা হয়। আদালতে তোলার সময় তার কানে ছিল হেডফোন, যার মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছিল। এটি ছিল একেবারেই প্রক্রিয়াগত বা নিয়মমাফিক শুনানিযেখানে অভিযুক্তকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো জানানো হয় এবং সেগুলোর জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। মাদুরোর মামলার বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পড়ে শোনানোর পর তার বক্তব্য জানতে চান। তখন মাদুরো বলেন, ‘এখানে যে অভিযোগগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি আমি করিনি।’ তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও আদালতে মাদক সম্পর্কিত অভিযোগ থেকে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।’ আদালতের কার্যক্রম চলাকালে সাংবাদিকরা ফ্লোরেসের মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা থাকতে দেখেছেন। ফ্লোরেসের আইনজীবী মার্ক ডনেলি বিচারককে বলেন, তার মক্কেলকে অপহরণের সময় তিনি গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। প্রথমবারের এই শুনানি নিয়ে নিউইয়র্কে ম্যানহাটনের এই আদালত আগামী ১৭ মার্চ মাদুরোর পরবর্তী হাজিরার দিন ধার্য করেন।

আমেরিকার দীর্ঘ দিনের অভিযোগ, মাদক পাচার এবং অন্যান্য অপরাধের জন্য তেল সম্পদকে ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলা। ওই তেল আদতে চুরি করা হয় ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন খনি থেকে। তার পর তা বিক্রি করে জঙ্গি কার্যকলাপে ব্যবহার করা হয়। আর সব কিছুই হয়েছে মাদুরোর নির্দেশে! তাই তাকে গ্রেফতার করে মার্কিন বিচারব্যবস্থার সামনে আনা হয়েছে।

এদিকে ফের একবার বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড দখল করার ইচ্ছাপ্রকাশ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প সেখানেও সামরিক অভিযান চালাবেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আবহে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন গ্রিনল্যান্ডের ‘অভিভাবক’ ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডরিকসেন। ট্রাম্পকে তার বার্তা, হুমকি দেওয়া বন্ধ করুন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। এখন এটা কৌশলগত ব্যাপার।’ কেন আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ডের উপর কর্তৃত্ব আরোপ করা প্রয়োজন, তাও ব্যাখ্যা করেছেন ট্রাম্প। তার দাবি, গ্রিনল্যান্ডের সর্বত্র রাশিয়া এবং চীনের জাহাজ ঘোরাফেরা করছে।

ডেনমার্ক আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। ঐতিহ্যগত ভাবেই ডেনমার্ক দীর্ঘ দিন ধরে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ। সেই ঘনিষ্ঠতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের উদ্দেশে বলেন, ‘আমেরিকার কাছে আমার আর্জি ঘনিষ্ঠ সঙ্গীকে হুমকি দেওয়া বন্ধ করুন।’ একই সঙ্গে খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে দেশ বা যে দেশের মানুষ বলছেন, আমরা বিক্রি হব না, তাদেরও হুমকি দেওয়া বন্ধ করুন।’ ডেনমার্কের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ৫৬ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ড প্রায় ৩০০ বছর ধরে কোপেনহাগেন (ডেনমার্কের রাজধানী)-এর নিয়ন্ত্রণে। নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি পরিচালনা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত দায়িত্ব দ্বীপটির স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃপক্ষ পালন করেন। আর বিদেশ এবং প্রতিরক্ষানীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি নেয় ডেনমার্ক সরকার। দ্বিতীয় দফায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে ট্রাম্প গত ১১ মাসে একাধিক বার গ্রিনল্যান্ড দখলের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

অপরদিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ইরানকে নিয়ে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলা ও ইরানের উত্তেজনার মূল কারণ ও গতিপথ আলাদা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি আলজাজিরাকে বলেন, ‘নতুন এক আইনহীন আচরণ সবকিছুকে অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।’ জামাল আবদি মনে করেন, মাদুরোকে অপহরণের ঘটনা ইরানকে এমন কিছু করতে প্ররোচিত করতে পারে যাতে সামরিক সংঘাতের পট প্রস্তুত হতে পারে। যেমন: নিজেদের সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ বাড়িয়ে আঘাত হানা। ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’র সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি মনে করেন, ভেনেজুয়েলার এই ঘটনা ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চবাদী’ লক্ষ্যের বহিঃপ্রকাশ, যা কূটনীতির পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তেহরানের দিক থেকে আমি যা দেখছি ও শুনছি, তাতে বোঝা যাচ্ছে, তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী নয়। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসন চায় ইরান পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করুক। ফলে কূটনীতির সুযোগ কমে আসছে এবং সংঘাতের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। এখন ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তিন পক্ষই সম্ভাব্য সংঘাতের পথে রয়েছে।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধনদভীকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ
পরবর্তী নিবন্ধসূর্যহীন দিন, তীব্র শীত