আমার বাবা ও একুশের ভোর

ফারজানা নাজ শম্পা | শুক্রবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

বাহান্নর ফেব্রুয়ারির কুয়াশা ভেজা প্রভাতে

ঢাকার আকাশ নেমেছিল নিঃশব্দ প্রত্যাশায়,

যেন শহর জানত আজ জন্ম নেবে ইতিহাস,

রক্তের অক্ষরে আঁকা হবে ভাষার মানচিত্র।

১৯৫২ কেবল একটি বছর নয়,

এ ছিল মাতৃভাষা বাংলা রক্ষার অগ্নিশপথ,

বুকের গভীরে জমে থাকা প্রতিবাদের দীপ্ত আগুন

সেদিন প্রথম জ্বলে উঠেছিল রাজপথ জুড়ে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাঙ্গণে

এক তরুণ ছাত্র নির্ঘুম চোখে দেখছিল সময়ের রূপান্তর,

সে আমার বাবা ড. মকসুদুর রহমান

দেশ ও মানুষ বাঁচানোর স্বপ্নে যার যাত্রা সেদিনই শুরু।

রাষ্ট্র বলেছিল অন্য ভাষায় কথা বলতে,

নিজস্ব শব্দ বিস্মৃত হতে,

কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার শাসকদের বুলেটের আঘাতে

ঢাকার রাজপথ রক্তিম হয়ে উঠল প্রতিবাদের ক্রন্দনে।

তবু থামেনি মিছিল,

হাতে অস্ত্র ছিল না, ছিল কণ্ঠের অগ্নিস্বর

রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’

আকাশ ভেদ করে উঠেছিল সেই উচ্চারণ।

বিকেলের আলো হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়,

পাকিস্তানি হানাদার শাসকের

গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে নগরী,

মাটির বুকে লুটিয়ে পড়ে

সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরের স্বপ্ন।

রক্ত মিশে যায় ধুলোর সঙ্গে,

ধুলো হয়ে ওঠে পতাকার প্রতীক,

লাল সবুজের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে

একটি ভাষার জন্মসনদ।

সেই থেকে ফেব্রুয়ারির হাওয়া

বসন্তের নয়, বহন করে শহীদের কণ্ঠস্বর,

যা আজও প্রতিধ্বনিত হয় মিনারের শুভ্র প্রাচীরে।

রাত পেরিয়ে ভোর নামলে

মানুষ খালি পায়ে এগিয়ে যায় শ্রদ্ধার পথে,

নীরব ফুলের স্তবকে জমে থাকে

অপরিশোধিত ঋণের দীর্ঘশ্বাস।

একুশের স্মৃতি অমর করে

বিশ্বজুড়ে জ্বলে আন্তর্জাতিক

মাতৃভাষা দিবসের দীপশিখা,

ভাষার মর্যাদা আজ মানবতার শপথ।

একুশ মানে নত না হওয়া,

একুশ মানে অদম্য উচ্চারণ,

একুশ মানে ভাষার ভেতর লুকিয়ে থাকা

স্বাধীনতা আর মায়ের ডাকে অনন্ত সাড়া।

যতদিন পৃথিবীতে মানুষ থাকবে,

ততদিন এই ফেব্রুয়ারির প্রভাত শেখাবে

ভাষা কেবল শব্দ নয়,

মাতৃভাষা মানুষের আত্মার পরিচয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএই দিনে
পরবর্তী নিবন্ধদূর পরবাসে বাংলা ভাষার গুরুত্ব