চব্বিশের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে এর পাশাপাশি এই মামলার অপর ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ সর্বসম্মতিক্রমে গতকাল বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারক হলেন– মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় ঘোষণাটি সরাসরি সম্প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। খবর বাংলানিউজের।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন– সাবেক এএসআই (সশস্ত্র) মো. আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এরা দুইজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। অন্যদিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক তিন আসামি হলেন– সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ (বেরবি) এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব। রায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন– বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরবি’র সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ ও বেরোবি ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি পোমেল বড়ুয়া। ৫ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন– সাবেক উপ–পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ–পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরবি’র সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, বেরবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরবি’র অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) রংপুরের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন, বেরবি’র সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম। ৩ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন– সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, বেরবি’র সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, বেরোবি ছাত্রলীগের সহ–সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, বেরোবি ছাত্রলীগের সহ–সভাপতি আখতার হোসেন, বেরবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, বেরোবি ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরবি’র এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল, বেরবি’র সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া ও বেরবি’র এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু। এছাড়া প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের হাজতবাস সময়কেই কারাদণ্ড হিসেবে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর ও গাজী এমএইচ তামীমসহ অপর প্রসিকিউটররা। অন্যদিকে আসামি বেরোবি’র তৎকালীন প্রক্টর শরিফুল ইসলামের পক্ষে ছিলেন– অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটো, আসামি এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় ও আনোয়ার পারভেজ আপেলের পক্ষের ছিলেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। আর পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী সুজাদ মিয়া।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের সেই ভিডিওটি দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে আবু সাইদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বেরোবি’র তৎকালীন ভিসি হাসিবুর রশীদসহ ৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে গত বছরের ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২। বিচারিক প্রক্রিয়ায় এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
দুই হাত প্রসারিত করে আবু সাঈদ বুঝতে পারেননি… : আবু সাঈদ তার দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন রাস্তায়। কিন্তু ওনার সামনে তো মানুষ ছিল না, সেটা উনি বুঝতে পারেননি বলে উল্লেখ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। চব্বিশের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার শুরুতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চব্বিশের গণআন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাইদ। তিনি আশা করছিলেন যে, মানুষ তো আমার সামনে। মানুষ আমাকে আক্রমণ করবে না। সে তার দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন রাস্তায়। কিন্তু ওনার সামনে তো মানুষ ছিল না, সেটা উনি বুঝতে পারেনি। আসলে অমানুষগুলো খোলা রাস্তায় ওরে গুলি করে মারছে।













