আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ

বাঙালি ঐতিহ্যের চিন্ময়স্মারক

কমলেশ দাশগুপ্ত | সোমবার , ২৯ নভেম্বর, ২০২১ at ৮:১২ পূর্বাহ্ণ

পুরো ঊনিশ শতক জুড়ে প্রায় সব বিষয়ে যেমন বিচার-আচার, শিক্ষা, বাণিজ্য, ধন সম্পদে জমিদার, জোতদার মহাজনদের আধিপত্য প্রবল আকার ধারণ করেছিল। গ্রামে, গঞ্জে, মৌজায় নগরে বন্দরে ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কই ছিল বেশি।
উচ্চবর্ণের মুসলিমরাও উর্দু ও ফারসী ভাষা ও সাহিত্যের অনুগ্রাহী হয়ে গেল। ফলে এদেশের ধর্মান্তরিত নিম্ন সমাজের নির্জিত মুসলিমরা স্বদেশে ঐতিহ্যের, শেকড়ের সন্ধান পেলো না! শিক্ষিত হিন্দু সমাজ বা জমিদার শ্রেণি বা উচ্চবংশীয় হিন্দু সমাজের প্রতাপসম্পন্ন পরিবেশে এই চট্টগ্রামে শুধু মুসলিমরা নয় নিম্নবর্ণের হিন্দু, বৌদ্ধরাও অবহেলিত ছিল যদিও তৎকালীন সময়ে নিম্নবর্ণ থেকে আগত হিন্দুরাই বেশীরভাগই ধর্মান্তরিত হয়ে ছিল।
কাজেই একে তো শিক্ষাহীন এবং অস্পৃশ্য নিম্নশ্রেণী তদুপরি ইংরেজরা প্রশাসনের বা ইংরেজদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন এই মুসলিম সমাজের আলোকপ্রাপ্তির অনুপস্থিতি আরো তীব্র হলো।
কলকাতা শহর ও মফঃস্বল শহরে উনিশ শতকের মধ্যভাগ অবধি অর্থাৎ ১৮৬০ খৃষ্টাব্দের পূর্বে, এ অবস্থার পরিবর্তনের কোন আভাস মেলেনি। বলতে গেলে স্যার সৈয়দ আহমেদ ও আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার আগ অবধি।
স্বদেশ, স্বজাতি, স্বদেশপ্রেম আত্মবিস্মরণ এবং এইসঙ্গে মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিকে উর্দুভাষিদের ভ্রমাত্মক প্রচারণার (বাংলা ভাষা ও শিক্ষা সব হিন্দু জাতির সৃষ্টি এবং সবই হিন্দু শাস্ত্রীয়) ফাঁদে ফেলে তৎকালীন বৃহত্তর বঙ্গে মুসলিম সমাজকে চূড়ান্তভাবে স্বদেশে পরবাসী করে দেয়। এইরকম একটি সময়ে উনিশ শতকের অন্ত্যপর্বের সূচনায় ১৮৭১ খৃস্টাব্দে ১১ অক্টোবর পটিয়া উপজেলার সুচক্রদন্ডী গ্রামের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের পূর্বেই তিনি পিতৃহীন হন এবং পটিয়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় মাকে হারান। ১৮৯৩ খৃস্টাব্দে তিনি পটিয়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পিতৃমাতৃহীন আবদুল করিমের পিতামহ আইনুদ্দিন তাঁর মেজছেলের কন্যা বদিউননিসার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন এবং জীবননির্বাহের প্রয়োজনে এই অনাথ সন্তানকে মৌরসী সম্পত্তির অংশীদার করে নেন। প্রবেশিকা পরীক্ষার পর চট্টগ্রাম কলেজে এফ এ ক্লাসে অধ্যয়নরত অবস্থায় টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হন এবং এর কারণে তাঁর উচ্চশিক্ষারও যবনিকাপাত ঘটে।
বিদ্যালয়ে ছাত্র থাকা অবস্থায় তাঁর পুঁথি পাঠ ও কিতাবে আগ্রহ জন্মে।এই সময়ে হাতে লেখা জটিল কলমী পুঁথিপাঠে অভ্যস্ত হন। ১৮৯৭-৯৮ খৃস্টাব্দের দিকে তিনি ‘সাপ্তাহিক অনুসন্ধান’ ‘সাপ্তাহিক প্রকৃতি’ ‘উইকলি হোপ’ পত্রিকাসহ আটটি পত্রিকার গ্রাহক ও পাঠক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি চল্লিশটি পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। কোনরকম পারিবারিক দুর্যোগ, সংকট বা প্রতিবন্ধক অবস্থা তাঁকে এই পত্রিকা পড়ার নেশা থেকে বিরত করতে পারেনি।
অসময়ে আকস্মিক শিক্ষা জীবনে ইতি ঘটার পরে তিনি প্রথমে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলে, সীতাকুণ্ড মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদে এবং এই বিদ্যালয় থেকেই তিনি শিক্ষকতার পেশা পরিবর্তন করে চট্টগ্রামের প্রথম সাবজজ আদালতে শিক্ষানবীশ হিসেবে যোগ দেন। কিছুকাল পটিয়া মুনসেফ আদালতেও ছিলেন। ‘পলাশীর যুদ্ধ’ খ্যাত কাব্যগ্রন্থের কবি নবীনচন্দ্র সেন ১৮৯১ খৃস্টাব্দে কমিশনারের পার্সোন্যাল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে পুনরায় চট্টগ্রাম আসেন। তখন অক্ষয় চন্দ্র সরকার সম্পাদিত ‘মাসিক পূর্ণিমায় আবদুল করিমের প্রবন্ধ পাঠ করেন এবং লেখকের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ হয়। ১৮৯৮ খৃস্টাব্দে তিনি আবদুল করিমকে কমিশনার অফিসের কারণিক হিসেবে নিয়োগ দান করে চট্টগ্রাম আদালত ভবনে নিয়ে আসেন। এছাড়া আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ রাজকৃষ্ণ সেন প্রতিষ্ঠিত আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে এবং বিভাগীয় স্কুল ইন্সপেক্টর অফিসে কারণিক ছিলেন। আবদুল করিম ৬৫ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৩৯ খৃস্টাব্দ থেকে তিনি মাসে ৬০ টাকা সরকারি পেনশন এবং সাহিত্যিক হিসেবে ষাট টাকা সম্মানী পেতেন। ১৯৫৩ খৃস্টাব্দ অবধি তাঁর মাসিক আয় ছিল ১২০ (একশো বিশ টাকা)।
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের এই জীবনপঞ্জীর চেয়ে সাধারণ জীবনের প্রতি তাঁর আলোক সম্পাতের পরিমাপ ও বিস্তৃতির ক্ষেত্র অনেক বড়ো। এই প্রসঙ্গে মনস্বী প্রবন্ধকার আবদুল হকের মন্তব্যটি যোগ করতে চাই সেটি হলো ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পেছনে সমাজের সর্বাত্মক এবং অনমনীয় সমর্থনকে অন্যতম উপাদান হিসেবে প্রেরণা দিয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানদের উত্তরাধিকার স্বত্বের চেতনা। এই চেতনা সমাজে যারা সঞ্চারিত করেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ- এই অর্থে যে, পুঁথি সংগ্রহ এবং এই সংক্রান্ত গবেষণায় বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তিনিই ছিলেন অগ্রণী এবং মহত্তম কর্মী। এই চেতনার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদেরই অবদান। তাঁরই আজীবন সাধনার ফলে আহৃত বিপুল তথ্যপুঞ্জ সমাজ মানসে ঐ চেতনার জন্ম দিয়েছে এবং আত্মঘোষণার এক অনমনীয় সঙ্কল্প সঞ্চারিত করেছে।’ অন্য বিষয়ে উচ্চারিত আচার্য স্যার যদুনাথ সরকারের মন্তব্যটিও এই ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেটাও উল্লেখ করতে চাই ‘ধনী সমাজ নহে, পণ্ডিতবর্গ নহে, জাতীয় চিন্তায় শিক্ষিত নেতাদের সমাজ নহে; যাদের বলা হয় জনসাধারণ, যাহারা উচ্চ বর্ণ সমাজের বাহিরে…..।’ এইরকম সাধারণ মানুষের লিখিত সাহিত্যে রস বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সাহিত্যের এক সুবৃহৎ ভান্ডার আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সীমাহীন শ্রম ও ঐকান্তিক আগ্রহ এবং বাঙালি ঐতিহ্যের প্রতি আন্তরিক ভালবাসার বিনিময়ে আহরিত হয়েছিল। আমরা দেখেছি দৌলত কাজীর ‘সতীময়না লোর চন্দ্রানী’ আলাওলে ‘পদ্মাবতী’ শেখ ফজুল্লাহর গোরক্ষ বিজয়, মুক্তারাম সেনের ‘সারদামঙ্গল’ আলী রজার ‘জ্ঞানসাগর’ সৈয়দ সুলতানের ‘জ্ঞান প্রদীপ’ অজ্ঞাত কবির রচিত ‘যোগ কলন্দর’ শেখ চাঁদ রচিত ‘হরগৌরী সম্বাদ’ ‘তালিব নামা’ হাজী মুহম্মদের ‘সুরতনামা’ সহ প্রায় চারশোরও বেশী প্রবন্ধ রচনা করেছেন যার বিষয়বস্তু আমাদের বাংলা ভাষায় ও সাহিত্যের গবেষকদের অনেক রসদ ও উপাদানের সন্ধান দিচ্ছে।
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ সেকালের উর্দু, ফারসী সাহিত্যের গল্প গাছায় বা তার নানাবিধ মহিমায় মোহিত হননি। তিনি প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের কবি ও হৃত সম্পদ অনুসন্ধানে তাঁর সারাজীবন উৎসর্গ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি সোজা কথায় ইহাই বুঝি, আমার দেশের জাত ভাইরা দেশের জন্য কি করিয়াছিলেন, তাহাই যদি জানিতে না পারিলাম তবে পরের দেশের ও বিদেশী ভাইদের কথা জানিয়া কি হইবে।
সাহিত্য রচনা, গবেষণা এবং প্রাচীন পুঁথি উদ্ধারে প্রচেষ্টায় তাঁর নিরন্তর ভূমিকা ছিল একজন আদর্শনিষ্ঠ সাধকের মতো। যৌবনের ঊষাকাল থেকে শুরু করে জীবনের অন্তিম সময় পর্যন্ত বাঙালির ঐতিহ্য, ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্যকে তিনি চর্চা, পরিচর্যা ও নিরন্তর পরিশ্রুত করেছেন একজন সাত্ত্বিক সেবক ও সাধক হিসেবে। একজন সম্পূর্ণ মানুষের, সাহিত্যের পবিত্র রূপ আমরা তাঁর চরিত্র ও কাজের মধ্যেই প্রত্যক্ষ করতে পারি। আবদুল করিম দীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে প্রাচীন পুঁথির নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রহ ও উদ্ধার কাজে ব্যাপৃত ছিলেন।
যদিও মধ্যযুগে সংস্কৃতি ও ফারসী সাহিত্যের চর্চার তুলনায় আমাদের বাঙালি পুঁথি রচয়িতারা তেমন উৎকৃষ্ট কোন রচনা রেখে যেতে পারেননি তবুও এই কথাটি বলতে পারি আমাদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও চর্চা ও ঐতিহ্যরক্ষার নিরিখে এই অমূল্য উপাদানগুলি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
যেমন আমরা এখনও বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ে বাংলাভাষার গবেষক, পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্ন’র ‘বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের লোকসাহিত্যের মূল্যায়নে, ইতিহাস রচনার পথিকৃত, প্রফেসর দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থ দুটিকে স্মরণ করি । ঠিক তেমনি স্মরণে রাখতে হয় বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য, ইতিহাস পঠন পাঠন অনুসন্ধানে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের সংগৃহীত এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত। ‘প্রাচীন বাঙ্গালা পুঁথির বিবরণ’ ১ম ও ২য় সংখ্যা ১৯১৩ খৃস্টাব্দ, আহমদ শরীফ সম্পাদিত ‘পুঁথি’ পরিচিতি, কলকাতা থেকে প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স এনামুল হকসহ যৌথভাবে ১৯৩৫ খৃস্টাব্দে প্রকাশিত ‘আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য’ প্রভৃতি অমূল্যগ্রন্থ সমূহ।
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের চর্চার গৌরবময় অধ্যায়ের আবিষ্কারের পরেও আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ প্রাচীন চট্টগ্রামকে এক ঋদ্ধ সঙ্গীত চর্চার ও সঙ্গীত সাধনার শ্রেষ্ঠ স্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারই উদ্ধারকৃত পুঁথি ‘রাগমালা’ গ্রন্থগুলিতে এর প্রমাণ মেলে।
চট্টগ্রামে অনেক শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত এবং বহু সঙ্গীতশাস্ত্র বিষয়ক পুঁথি প্রকাশিত হয়েছিল। এই সঙ্গীত চর্চা ও শাস্ত্র রচনা বিষয়ে আবদুল করিম এটিও বলেছেন “আশ্চর্যের বিষয়, মুসলমান সমাজই এ বিষয়ে সর্ব্বাগ্রণী ছিলেন। অনেক মুসলমান পন্ডিতের আবাসে সঙ্গীতশাস্ত্র শিক্ষা দিবার জন্য অবৈতনিক বিদ্যালয় থাকিত।’
সঙ্গীতগ্রন্থের বিষয়সূচিতে সঙ্গীতের উৎপত্তি রহস্য এবং রাগতালের বিবরণ, প্রত্যেক রাগ ও তালের ধ্যানগুলি সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছে এবং বাংলা পদ্যে তার অনুবাদ আছে। সঙ্গীতের গ্রন্থগুলিতে রাগ তালের ধ্যান ও পয়ার (অনুবাদ) একই রকম দেখা গেছে। প্রত্যেক রাগের ধ্যান পয়ারের নীচে সেই রাগে গেয় এক বা বহুসংখ্যক গানের পদ এবং প্রত্যেক তালের ধ্যান পয়ারের নীচে সেই তালের গৎ উল্লেখ আছে। এই পদগুলি প্রায়ই বিভিন্ন কবির রচিত বৈষ্ণব পদাবলী। এবং এই পদগুলি প্রায়ই মুসলিম কবিদের রচিত পদ।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বিভিন্ন সঙ্গীতকারের অনেকগুলি ‘রাগমালা’ সংগ্রহ করেছিলেন। আলোচিত ‘রাগমালা’ গ্রন্থটির রচয়িতা ফাজিল নাছির মোহাম্মদ। তাঁর ‘রাগমালা’ গ্রন্থে তিনি রচনায় উৎস ও স্বপরিচয় এইভাবে ব্যক্ত করছেন। ‘শ্রীযুত ওয়াহিদ মোহাম্মদ রসধীর/ তান সু আরতি গাহে ফাজিল নাছির’ ॥ ফাজিল নাছির মোহাম্মদ এই গ্রন্থের রচনাকাল বলেছেন ‘ মঘি সন পরিমাণ হাজার ন আশী জান/ মকাব্দা সোলস চল্লিসে।
পৌষমাস বহি গেল সংক্রান্তি দিবস ভেল
বিংস দণ্ড শনিবার দিবসে ॥”
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতে ১০৮৯ সমীসনে বা ১৬৪০ শকাব্দায় পৌষ সংক্রান্তি শনিবার দিবসে তাঁর রচনার সমাপ্তি হয়।
আনুমানিক চারশো বছর পূর্বের (আবদুল করিম যুবক বয়সে এটি প্রাপ্ত হয়েছেন এবং তখনই এই গ্রন্থের প্রকাশ কাল বলছেন ১৯১ বছর পূর্বের) এই গ্রন্থটিতে ৪২টি রাগ ও রাগিনীর বর্ণনা রয়েছে। যেমন মালব, মল্লার, হিল্লোল, কর্ণাট, শ্রীবসন্ত, আসাবরী, রামক্রিয়া, সারঙ্গ, কোড়া কল্যাণ, দীপিকা, পাহিড়া, মায়ুর, ধানশি প্রভৃতি।
আজ থেকে আনুমানিক চারশো বছর আগে চট্টগ্রামে এতো বড়ো আকারে সঙ্গীত সাধনা এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন মুসলিম কবির বহু রাগমালা গ্রন্থের প্রকাশ অনেকটা উড়ন্ত আলোর গোলক এসে পড়ার মতো যাদুকরী ঘটনা কারণ এই ভাটির দেশ এবং প্রান্তিক চট্টগ্রামে পশ্চিমী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বহুল চর্চা আমাদেরকে বিস্মিত করে দেয়। তৎকালীন সময়ে আমরা কি এও ধারণা করতে পারি পর্তুগীজ কিংবা আরবীয় বণিকদের বা সুফী দরবেশদের বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন বা আমোদ প্রমোদে এই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বা সঙ্গীত রচনার উৎস? কিংবা বৈষ্ণব পদকর্তাদের বা সাধকদের এই পশ্চিমী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আমদানী হয়েছে। তবে যাই হোক প্রাচীন চট্টগ্রামে বৈষ্ণব পদাবলীর ঢঙে মুসলমান কবিরদের রচনা এবং তৎকালীন সমাজে তাঁদের সুর ও সঙ্গতে অবদান অবশ্যই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে তাঁরা হিন্দু সমাজের কাছে মুসলিম বৈষ্ণব কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যদিও তাঁরা বৈষ্ণব ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন কিনা? সে নিয়ে কোন সমর্থন মেলেনি।
পরিশেষে বলি যে, চট্টগ্রামের প্রাচীন পর্বে সঙ্গীতচর্চা, সাধনা, শিক্ষা, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সহযোগে সঙ্গীত পরিবেশন এই পদ্ধতিগত পরিক্রমার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসও শ্রদ্ধেয় মনস্বী গবেষক, অদ্বিতীয় পুঁথি সংগ্রাহক, বাঙালি ঐতিহ্যের আত্মিক ও ঋত্ত্বিক আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ আমাদের জন্যে রেখে গেছেন।
তাঁর এই অকাতর শ্রমের পরিপূর্ণ অবদান, পথ ও পাথেয় সহস্র বছর ধরে আমাদের কাছে সাহিত্যের অনুপ্রেরণা এবং বাঙালি ঐতিহ্যের সুরক্ষায় সহযোগী হোক- এই কামনা করি।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধকেবল সনদপত্র নয়, বেকারত্ব নিরসনে গড়ে তুলতে হবে দক্ষ জনশক্তি
পরবর্তী নিবন্ধমনোয়ারা বেগম