আন্তর্জাতিক গণিত দিবস : সকল সমস্যার যুক্তিভিত্তিক সমাধানের আশা

ড. উজ্জ্বল কুমার দেব | শনিবার , ১৪ মার্চ, ২০২৬ at ১০:১২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ গণিত সমিতির কার্যকরী কমিটির এক সভা সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ মুজিবুর রহমান গণিত ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ গণিত সমিতি বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজকে আন্তর্জাতিক গণিত দিবস অথবা পাই দিবস পালন করার জন্য আহ্বান জানাবেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এবং কলেজে আজকের এই দিনটি আনন্দঘন পরিবেশে পালিত হবে। বাংলাদেশের পাশাপাশি আজ বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক গণিত দিবস উদযাপনের জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকরা একত্রিত হবেন।

মার্চের ১৪ তারিখে আন্তর্জাতিক গণিত দিবস ঘোষণা করে ইউনেস্কো ২০১৯ সাল হতে। দিনটিকে পাই দিবসহিসেবেও উল্লেখ করা হয়। কারনণ গ্রীক লেটার পাই এর মান ৩.১৪। সে হিসেবে বছরের মার্চ মাসের চৌদ্দ তারিখ পাই দিবস। ইউনেস্কো কিছু উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই দিবসটিকে উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। যেমন: প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতি দূরীকরণ; শিক্ষায় গণিতের গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণ জনগণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের অবহিতকরণ; বিজ্ঞানভিত্তিক একটি জাতি গঠনে গাণিতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখা; লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার জন্য মেয়েদেরও গাণিতিক সক্ষমতা বাড়ানো; একটি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ এবং সর্বোপরি মানুষের মঙ্গলের জন্য একটি আধুনিক সমাজ গঠনে গণিতের যে ভূমিকা আছে তা মানুষকে অবহিত করা।

আন্তর্জাতিক গণিত দিবসের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী গণিতপ্রেমীদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ব্যবধান পূরণ করা, কারণ গণিত একটি সার্বজনীন ভাষা যা দেশীয় সীমানা অতিক্রম করার মত গ্রহণযোগ্যতা সর্বক্ষেত্রে। এ দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে, দেশ এবং সম্প্রদায়গুলি গণিতের সার্বজনীন ভাষা প্রচারের জন্য একত্রিত হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত ১৪ মার্চ তারিখটি আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ, এদিন অন্যতম সেরা গণিতবিদ এবং পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন। অতএব উনাকে স্মরণ করাও একটি উদ্দেশ্য। গণিত এবং বিজ্ঞানে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের চিন্তাবিদদের অনুপ্রাণিত করে, এই দিনটিকে স্মরণ করা মানে তাঁর যুগান্তকারী কাজের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে তুলে ধরার একটি মহৎ প্রচেষ্টা। আর একটি হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত ক্ষেত্রগুলির গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং শিক্ষার্থীদের এই ক্ষেত্রগুলিতে ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহিত করে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে গণিত এবং বিজ্ঞান যে উদ্ভাবন করে যাচ্ছে তার গুরুত্ব অনুধাবন এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গণিতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, যা অনেক সময় আমরা সরাসরি উপলব্ধি করি না। বাজার করার সময় পণ্যের দাম ও পরিমাণ বের করা থেকে শুরু করে রান্নার সময় উপকরণের সঠিক মাপ রাখা, মাস শেষে নিজের ব্যয়ের হিসাব মেলানো, এমনকি বাসা থেকে বের হওয়ার সময় কত মিনিট লাগবে তা হিসাব করে সময়মতো অফিসে পৌঁছানোসবকিছুতেই আমরা অজান্তেই মৌলিক গণিত ব্যবহার করি। তবে এর প্রয়োগ শুধু এই দৃশ্যমান কাজগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আমাদের চিন্তার ভিত্তি তৈরি করে। সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যুক্তিবোধ, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাএসবের চর্চা আমরা মূলত গণিতের মাধ্যমেই পাই। পাশাপাশি, আধুনিক এই পৃথিবীতে প্রযুক্তির প্রতিটি স্তরমোবাইল ফোন থেকে শুরু করে ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে মহাকাশ অভিযানসবকিছুর পেছনেই গণিতের অবদান রয়েছে। সংগীতের ছন্দ থেকে শুরু করে স্থাপত্যের নকশা, সবখানেই গণিতের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। তাই, প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ হোক বা জীবনকে গভীরভাবে বুঝতে চাওয়া, সর্বত্রই গণিত আমাদের অবিচ্ছেদ্য ও প্রয়োজনীয় সঙ্গী।

আন্তর্জাতিক গণিত সংস্থা এবছর এ দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে গণিত এবং আশা। বিষয়টি গভীরভাবে মানবিক, সহজাতভাবেই যুক্তিসঙ্গত এবং কিছু মৌলিক সত্যকে আলোকিত করে। এই ধারণাটিকে প্রতিফলিত করে যে, গণিত, আশার মতোই, মানবজাতির অন্যতম একটি সর্বজনীন সম্পদ। গণিতিক যুক্তিবোধ এবং মানুষের প্রত্যাশা, উভয়েরই মাধ্যমে আমরা একটি উন্নত ভবিষ্যৎ কল্পনা ও নির্মাণ করি। এটি আমাদেরকে প্রতিনিয়ত বিদ্যমান অনিশ্চয়তা মোকাবেলার হাতিয়ার দিয়ে সজ্জিত করে এবং এক ধরনের আশাবাদ তৈরি করে যা যুক্তিভিত্তিক। গাণিতিক যুক্তিগুলো প্রয়োগের প্রতিটি পদক্ষেপই আমাদের এই বিশ্বাস থাকে যে, পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল সমস্যার কোন না কোন একটি সমাধান আছে, এবং আমরা এই বোধগম্যতাকে কাজে লাগিয়ে সকলের জন্য একটি আরও ন্যায়সংগত, টেকসই এবং স্থিতিস্থাপক সমাজ গড়ার যেন চেষ্টা করি।

ফরাসি ভাষায়, পরিসংখ্যানগত প্রত্যাশা” (বীঢ়বপঃধঃরড়হ) বোঝাতে বংঢ়ল্কৎধহপব শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যার সরাসরি অনুবাদ আশা। এই ভাষাগত কৌতূহল একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক উৎসের দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে সপ্তদশ শতাব্দীর সম্ভাব্যতা তত্ত্বের প্রবর্তকগণ, ক্যালভিনিস্ট চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, আশাকে একটি ব্যক্তিগত, অনিশ্চিত অনুভূতি থেকে একটি সর্বজনীন এবং সন্দেহাতীত ধারণায় রূপান্তরিত করেন যা গাণিতিক বিশ্লেষনের উপযুক্ত। এই বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করার একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করে, আশাকে একটি নিষ্ক্রিয় বাসনা থেকে সক্রিয়, গণনাযোগ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে রূপান্তরিত করে। আজ, এই গাণিতিক আশা জাতিসংঘের ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে, যা জলবায়ু পূর্বাভাস, মহামারি সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য মডেল তৈরী করে, যার ফলে সমাজগুলি কার্যকরভাবে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণভিত্তিক আশা লাভ করে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত এবং শিক্ষাগত স্তরে দীর্ঘদিন ধরে, গণিত একটি জটিল বিষয় হিসেবে অনেক শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। পরীক্ষায় গণিত বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে অনেকেই কঠিন জীবনসমুদ্র হতে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। তাদের মনে এই ক্ষতিকর ধারণাটি স্থায়ী হয়েছে যে, গাণিতিক দক্ষতা একটি কঠিন ও অপরিবর্তনীয় গুণ; যা সত্যিই এক বড় ভুল ধারণা। আমি মনে করি, এই বছরের আন্তর্জাতিক গণিত দিবসের প্রতিপাদ্য সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্যই চিন্তা করা হয়েছে। নিয়মিত চর্চা এবং অধ্যবসায় দিয়ে এই অপরিবর্তনীয় গুণের পরিবর্তন সম্ভব। আর এখানেই আমাদের প্রত্যাশার জায়গা। সাম্প্রতিক গবেষণায় এটি প্রমাণিত যে, কোনো শিক্ষার্থীর তার নিজের ক্ষমতার উপর আস্থা, তাকে পথ খুঁজে বের করা শেখায় এবং তা সরাসরি তার সাফল্যের সাথে জড়িত। এই শিক্ষাগত পরিবর্তন শ্রেণিকক্ষগুলিকে এমন জায়গায় রূপান্তরিত করে যেখানে গণিতের যুক্তি স্কুল ও জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আত্মবিশ্বাসকে লালন করে।

তাই আমাদের প্রত্যাশা, এবারের এই অনুপ্রেরণামূলক প্রতিপাদ্যটি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। আজকের এ দিবসে ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক গণিত সংস্থা সম্মিলিতভাবে একটি বৈশ্বিক ওয়েবিনারে গণিত বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করবে, যেখানে তাঁরা আলোচনা করবে কীভাবে গণিত মানবকল্যাণ এবং টেকসই উন্নয়নে অবদান রেখে আশাকে অনুপ্রাণিত করে। একইসাথে, আমাদের প্রত্যাশা বিভিন্ন দেশের স্থানীয় উদযাপনগুলি সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে অনুসন্ধানে নিযুক্ত করবে। এই অনুষ্ঠানগুলির মাধ্যমে এবারের প্রতিপাদ্যটি মূর্ত হয়ে উঠবে, যার মাধ্যমে বুঝা যাবে যে গণিত কোনও কঠিন বিষয় নয়। বরং, এটি একটি সৃজনশীল, আশাব্যঞ্জক এবং সহযোগিতামূলক মানবিক প্রচেষ্টা। অবশেষে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না আন্তর্জাতিক গণিত দিবস ২০২৬ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আশা একটি জ্যামিতিক প্রমাণের মতো, যা যুক্তি এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে নির্মিত হয়। এ আশা আমাদের একটি উন্নত বিশ্ব কল্পনা ও নির্মাণের সুযোগ করে দেয় যা হবে সংঘাতহীন ও শান্তিপূর্ণ। পৃথিবীতে বিরাজমান সকল অশান্তিময় সমস্যার হোক যুক্তিভিত্তিক সমাধান, এটাই আন্তর্জাতিক গণিত দিবসে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

পূর্ববর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে
পরবর্তী নিবন্ধবিভিন্ন স্থানে ঈদবস্ত্র বিতরণ