আমরা এমন এক জগতে বাস করছি, যখন ডিগ্রি আর সনদকে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখার প্রবণতা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। একসময় ভাবা হতো ভালো ফলাফল মানেই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ, কিন্তু বাস্তবতা এখন অনেক বেশি জটিল। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কর্মক্ষেত্রের রূপান্তর এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপর নির্ভর করে চলা কঠিন। জীবন কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র নয়, যেখানে সব প্রশ্ন আগে থেকে লেখা থাকে এবং নির্দিষ্ট উত্তরের মাধ্যমে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায়। বরং জীবন এমন এক খোলা ক্ষেত্র, যেখানে প্রশ্নের রূপ বদলে যায়, উত্তরও তৈরি করতে হয় নিজস্ব চিন্তা আর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের ভিত্তি গড়ে দেয়, শৃঙ্খলা শেখায়, জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়। এই শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা মনে করি সার্টিফিকেটই শেষ কথা। ডিগ্রি আমাদের একটি পরিচয় দেয়, কিন্তু দক্ষতা তা দেয় না সবসময়। কর্মক্ষেত্রে গিয়ে দেখা যায়, বইয়ের জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সবসময় মেলে না। সেখানে প্রয়োজন হয় বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস এবং নতুনভাবে ভাবার সামর্থ্য। এই গুণগুলো কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি থেকে আসে না, আসে কৌতূহল এবং নিজে থেকে শেখার অভ্যাস থেকে।
শেখার দুটি ভিন্ন ধারা আছে। একটি হলো নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা, যেখানে নির্দিষ্ট সিলেবাস, নির্দিষ্ট সময় এবং নির্দিষ্ট মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকে। অন্যটি হলো স্বশিক্ষা, যেখানে শেখার গতি, বিষয় এবং পদ্ধতি নির্ধারণ করে নিজেই। স্বশিক্ষিত মানুষ সাধারণত সমস্যার মুখোমুখি হয়ে শিখতে অভ্যস্ত। তারা ভুলকে ভয় পায় না, বরং ভুল থেকে শিক্ষা নেয়। তারা জানে ব্যর্থতা কোনো সমাপ্তি নয়, বরং পরবর্তী সাফল্যের প্রস্তুতি। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই তাদের পরিণত করে আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ মানুষে।
আজকের বিশ্বে পরিবর্তনই একমাত্র স্থায়ী বিষয়। যে প্রযুক্তি আজ জনপ্রিয়, কয়েক বছরের মধ্যে তা অচল হয়ে যেতে পারে। যে দক্ষতা আজ চাহিদাসম্পন্ন, কাল হয়তো তার প্রয়োজন কমে যাবে। তাই কেবল একবার পড়াশোনা শেষ করে থেমে গেলে চলবে না। শেখা হতে হবে অব্যাহত প্রক্রিয়া। যারা নিয়মিত নিজেদের দক্ষতা ঝালিয়ে নেন, নতুন কিছু জানার চেষ্টা করেন, তারাই এগিয়ে থাকেন। শেখা তখন আর বাধ্যবাধকতা থাকে না, হয়ে ওঠে প্রয়োজন।
স্বশিক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অভিযোজন ক্ষমতা। যারা নিজেরা শেখেন, তারা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলাতে পারেন। তারা মুখস্থ জ্ঞানের উপর নির্ভর না করে বোঝার চেষ্টা করেন। বোঝার মাধ্যমে শেখা জ্ঞান দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং প্রয়োজনে নতুনভাবে ব্যবহার করা যায়। এই ধরনের মানুষরা শুধু তথ্য সংগ্রহ করেন না, তথ্য বিশ্লেষণ করেন, প্রয়োগ করেন এবং প্রয়োজনে নতুন ধারণা তৈরি করেন। ফলে তারা কেবল অনুসারী নন, অনেক সময় পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন। বাস্তব জীবনে প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে কোনো প্রস্তুত উত্তর নেই। তখন দরকার হয় সৃজনশীলতা এবং সমাধানমুখী চিন্তা। যে ব্যক্তি নিজে থেকে শিখতে শিখেছে, সে অনিশ্চয়তাকে ভয় পায় না। সে জানে সবকিছু জানা সম্ভব নয়, কিন্তু শেখা সম্ভব। এই মনোভাব তাকে ধৈর্যশীল করে তোলে। সে প্রশ্ন করতে শেখে, কেন এমন হলো, অন্যভাবে করা যায় কি না, কোথায় ভুল হয়েছে। এই প্রশ্নগুলো তাকে গভীরভাবে ভাবতে সাহায্য করে।
অনেক সময় দেখা যায়, উচ্চ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে, আবার মাঝারি ফলাফল করা কেউ দক্ষতার জোরে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ দ্বিতীয় ব্যক্তি হয়তো শেখাকে কেবল পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। সে কাজের মাধ্যমে শিখেছে, অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে, মানুষের সঙ্গে মিশে শিখেছে। তার শেখা ছিল বাস্তবমুখী। সে জানে কীভাবে একটি সমস্যা চিহ্নিত করতে হয়, কিভাবে সমাধানের পথ খুঁজতে হয়।
বর্তমান সময়ে শেখার সুযোগ সীমাহীন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের জ্ঞান হাতের নাগালে। অনলাইন কোর্স, উন্মুক্ত পাঠ, ভিডিও লেকচার, আলোচনামূলক প্ল্যাটফর্ম, সবকিছুই সহজলভ্য। কিন্তু সুযোগ থাকলেই হয় না, দরকার আগ্রহ এবং নিয়মিত চর্চা। অনেকেই শুরু করেন, কিন্তু ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন না। অথচ সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। প্রতিদিন অল্প অল্প শেখা দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনে।
পরিবার এবং সমাজেরও একটি দায়িত্ব আছে। আমরা প্রায়ই সন্তানদের বলি ভালো নম্বর পেতে হবে, ভালো কলেজে ভর্তি হতে হবে। কিন্তু আমরা কি তাদের শেখার আনন্দ সম্পর্কে বলি। আমরা কি তাদের উৎসাহ দিই প্রশ্ন করতে, ভিন্নভাবে ভাবতে। যদি শেখা কেবল প্রতিযোগিতার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা মানসিক চাপ বাড়ায়। কিন্তু যদি শেখা হয় আত্মোন্নয়নের পথ, তবে তা আনন্দ দেয় এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
নিজের চেষ্টায় শেখা মানুষরা সাধারণত আত্মসমালোচনায় অভ্যস্ত। তারা নিজেদের দুর্বলতা খুঁজে বের করেন এবং তা উন্নত করার চেষ্টা করেন। তারা জানেন, অন্যকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। উন্নতির দায়িত্ব নিজের। এই মনোভাব তাদের নেতৃত্বের গুণও তৈরি করে। কারণ যে নিজেকে পরিচালনা করতে পারে, সে অন্যকেও পথ দেখাতে পারে। কর্মক্ষেত্রে এখন এমন মানুষ চাওয়া হয়, যারা কেবল নির্দেশ পালন করবে না, বরং নতুন ধারণা দেবে। যারা সমস্যা দেখলে এড়িয়ে যাবে না, বরং সমাধানের চেষ্টা করবে। এই গুণ তৈরি হয় নিয়মিত শেখা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। একটি প্রতিষ্ঠান তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার কর্মীরা শেখার মানসিকতা ধারণ করে। একইভাবে একটি দেশও এগিয়ে যায় তখনই, যখন তার নাগরিকেরা আজীবন শিক্ষার চর্চা করে।
আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা দরকার, আমরা কি শুধু সার্টিফিকেটের জন্য পড়ছি, নাকি জীবনের জন্য শিখছি? আমরা কি প্রতি বছর নতুন দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছি? আমরা কি প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছি? যদি উত্তর না হয়, তবে এখনই সময় বদলানোর। কারণ সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। শেখার কোনো বয়স নেই। একজন ছাত্র যেমন শিখতে পারে, তেমনি একজন চাকরিজীবী কিংবা অবসরপ্রাপ্ত মানুষও নতুন কিছু শিখতে পারেন। শেখা হতে পারে ভাষা, প্রযুক্তি, শিল্প, কৃষি, ব্যবসা বা যেকোনো ক্ষেত্রের। গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিক প্রস্তুতি। যখন আমরা মেনে নিই যে শেখা একটি চলমান প্রক্রিয়া, তখন জীবনও গতিময় হয়ে ওঠে।
সার্টিফিকেট আমাদের যাত্রার একটি ধাপ মাত্র, এটি গন্তব্য নয়। এটি সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজার ভেতরে নিজের জায়গা তৈরি করতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং নিরবচ্ছিন্ন শেখার মানসিকতা। ভবিষ্যৎ কোনো একদিন হঠাৎ করে তৈরি হয় না, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, নিয়মিত চর্চা এবং নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই তা গড়ে ওঠে। যে মানুষ ব্যর্থতাকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, সে কখনো স্থবির হয়ে থাকে না। সে জানে আজ যা জানে তা যথেষ্ট নয়, আগামীকাল আরও জানতে হবে। এই উপলব্ধিই তাকে এগিয়ে রাখে। সার্টিফিকেট হয়তো একটি সময়ের সাফল্যের প্রমাণ, কিন্তু শেখার ইচ্ছা পুরোই জীবনের সম্ভাবনার প্রমাণ।
আজকের বিশ্বে টিকে থাকতে হলে কেবল অতীতের অর্জন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করতে হবে, আমি কি নতুন কিছু শিখছি, আমি কি নিজের দক্ষতা বাড়াচ্ছি, আমি কি পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছি। যদি আমরা শেখাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে পারি, তবে কোনো অনিশ্চয়তাই আমাদের থামাতে পারবে না। সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শেখা থেমে গেলে উন্নতি থেমে যায়, আর শেখা চলতে থাকলে সম্ভাবনার দিগন্তও প্রসারিত হয়। তাই বলা হয়, সার্টিফিকেটের বাইরে শেখার ইচ্ছাই তৈরি করে সুন্দর ভবিষ্যৎ, আর সেই ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষমতা আমাদের প্রত্যেকের নিজের হাতেই নিহিত।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।












