গাউছুল আজম হযরত মাওলানা শাহসূফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) প্রকাশ হযরত কেবলার ১২০তম বার্ষিক ওরশ শরীফ গতকাল শনিবার যথাযোগ্য মর্যাদায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে।
শত বৎসরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর ১০ই মাঘ অলিয়ে কামেলের ওফাত দিবসে বংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে ভক্ত–অনুরক্ত–আশেকরা মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে সমবেত হয়। গত শুক্রবার দরবারের আওলাদরা পৃথক পৃথক ভাবে ওরশের অনুষ্ঠানিকতার সূচনা করেন। ওরশ শরীফ সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশে আয়োজনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। লাখো ভক্ত–জনতার আগমন ও অবস্থান নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
ওরশ উপলক্ষ্যে গত তিন দিন ধরে দেশ–বিদেশের ভক্তরা হাদিয়া নিয়ে বিভিন্ন ভাবে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে সমবেত হয়। ওরশের একদিন আগে থেকেই মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। বাদ আসর থেকে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মঞ্জিলের পক্ষ থেকে তাদের ভক্ত–জায়রীণদের নিয়ে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।
গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিল (শাহ এমদাদীয়া) : শনিবার দিবাগত রাতে গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিল শাহী ময়দানে আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন হযরত মওলানা শাহসুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম.)। মোনাজাতে তিনি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের নির্যাতিত মুসলমানদের হেফাজত, দেশের স্থায়িত্ব, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। তিনি বিশ্বজুড়ে হানাহানি বন্ধ ও মানবতার কল্যাণ প্রার্থনা করেন। ওরশ শরীফ উপলক্ষে সাজ্জাদানশীন হযরত মওলানা শাহসুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারীর আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় এবং নায়েব সাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো আশেক–ভক্ত মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে সমবেত হন। বাংলাদেশ ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, মালয়েশিয়া ও ওমানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য ভক্ত–অনুরক্ত এই আধ্যাত্মিক মিলনমেলায় অংশ নেন। মোনাজাতের আগে সমবেত ভক্তদের উদ্দেশ্যে সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী বলেন, বর্তমান অস্থির পৃথিবীতে শান্তির জন্য মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকা এক অনন্য আলোকবর্তিকা। গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের তরে যে প্রেম ও ভালোবাসার বাণী প্রচার করেছেন, তা ধারণ করলেই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আমাদের আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে হবে এবং হিংসা–বিদ্বেষ ভুলে মানবতার কল্যাণে কাজ করতে হবে।
ওরশ শরীফের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ১০ দিনব্যাপী কর্মসূচির বিষয়ে নায়েব সাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি আগত মেহমানদের সর্বোচ্চ সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ২০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবার আমরা গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এসে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছি। ফটিকছড়িকে থ্যালাসেমিয়া মুক্ত করার উদ্যোগ এবং বেকারদের স্বাবলম্বী করতে ‘কর্জে হাসানা’র মতো কার্যক্রমগুলো মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার আধুনিক রূপ।
আখেরি মোনাজাতে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খান এগ্রো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলহাজ্ব সৈয়দুল হক খান, ফনিঙ শিপিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সৈয়দ সোহেল হাসনাত, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী আলমগীর, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপ–ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের, শাহজাদা সৈয়দ এরহাম হোসাইন ও শাহজাদা সৈয়দ মানাওয়ার হোসাইন। আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারী (শাহ এমদাদীয়া) কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের সচিব শেখ মুহাম্মদ আলমগীরের পরিচালনায় ওরশে মিলাদ পরিচালনা করেন দারুত তায়ালীম প্রধান শিক্ষক মওলানা জয়নাল আবেদীন ছিদ্দিকী। এর আগে ওরশ উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী নানামুখী কর্মসূচি পালন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল–ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, জাতীয় তাসাউফ গবেষণা কনফারেন্স, শিক্ষা উৎসব ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, এথিকস অলিম্পিয়াড, থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা সেমিনার ও রক্তদান কর্মসূচি, দক্ষতা উন্নয়নে ‘কর্জে হাসানা’র আওতায় সিএনজি ও সেলাই মেশিন বিতরণ এবং আন্তর্জাতিক ছবি প্রদর্শনী। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারী (শাহ এমদাদীয়া), মাইজভাণ্ডার ওরশ শরীফ সুপারভিশন কমিটি, দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ডিরি), মাইজভাণ্ডারী ফাউন্ডেশন, মাইজভাণ্ডারী এডুকেশন ট্রাস্ট, মাইজভাণ্ডারী শাহ এমদাদীয়া ব্লাড ডোনার্স গ্রুপ, মাইজভাণ্ডারী শাহ এমদাদীয়া স্বনির্ভরতা ট্রাস্ট, শাহ এমদাদীয়া অটো ড্রাইভিং স্কুল, মাইজভাণ্ডারী প্রকাশনী, গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী হিফজুল কোরআন ফাউন্ডেশন, গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, মাইজভাণ্ডার আহমদিয়া এমদাদীয়া মাদরাসা এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো।
গাউছিয়া হক মঞ্জিল : গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)- র পবিত্র ওরশ শরীফ উপলক্ষে গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.), হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী (ক.), হযরত সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)-র মাজার শরীফ জেয়ারত শেষে শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.)-র মাজার শরীফে গিলাফ চড়ানো, সুগন্ধি প্রদান করে আল্লাহতায়ালার দরবারে হাত তুলে সকলের পবিত্র আশা পূরণ করার জন্য ফরিয়াদ করেন গাউসিয়া হক মনজিলের সাজ্জাদানশীন সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (ম.)। গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.)র যে সাম্যের আদর্শ–শান্তির আদর্শ, দিকে দিকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সকল আশেকানে গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.), মাইজভাণ্ডারী গাউসিয়া হক কমিটির সকলকে তৌফিক দান করার জন্য, গাউসিয়া হক মনজিল কর্তৃক এই মহান দিনে যে সমস্ত এন্তেজাম হয়েছে, এই এন্তেজামকে কবুল করার জন্য, যে তবারুকাতের এন্তেজাম হয়েছে, তবাররুকাতকে সকলের জন্যে রুহানি, বিমারীর জন্যে শেফা হিসেবে কবুল করার জন্য, এই আসা এবং যাওয়াকে, এই অবস্থানকে সকলের নাজাতের উসিলা হিসেবে কবুল করার জন্য তিনি মহান রব্বুল আলামিনের দরবারে ফরিয়াদ করেন। এছাড়া ওরশ উপলক্ষে মাইজভাণ্ডার শরীফ গাউসিয়া হক মনজিলের ব্যবস্থাপনায় নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
এছাড়াও ওরশ উপলক্ষে বাদ আসর প্রথম গাউছিয়া রহমান মঞ্জিলের পক্ষে আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন শাহসূফি সৈয়দ মুজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী (মঃজিঃআঃ)। রাত ১০টায় গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের পক্ষে আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন, শাহসূফি সৈয়দ সহিদুল হক মাইজভাণ্ডারী, শাহসুফি সৈয়দ মুনিরুল হক মাইজভাণ্ডারীর পুত্র সৈয়দ আহমদ হোসাইন শাহরিয়ার মাইজভাণ্ডারী ও শাহসুফি সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন মাইজভাণ্ডারী।
রাত ১২টায় সর্বশেষ আখেরী মোনাজাত পরিচালনা করেন গাউছিয়া আহমদিয়া এমদাদিয়া মঞ্জিলের শাহসূফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (মঃজিঃআঃ) ও গাউছিয়া হক মঞ্জিলের পক্ষে আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন শাহসূফি সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মঃজিঃআঃ)।
এদিকে প্রতি বছরের ন্যায় ১০ মাঘ ওরশ উপলক্ষে ফটিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন ও ফটিকছড়ি থানা পুলিশ ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় থানা পুলিশ–র্যাব–আনসার ও নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রয়েছে।












