
আকাশ আহমেদের কিশোরভুবন যেন এক দুরন্ত স্বপ্ন–জগৎ। যেখানে মেঘ, বষ্টি, ঘুড়ি, কাশফুল, জল, প্রজাপতি, নদী ও শিশুকালের প্রত্যাবর্তন মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বর্ণময় কাব্যবিশ্ব। তাঁর কিশোর কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘ বলেছে বৃষ্টি হবে’ কেবল একটি প্রাকৃতিক অবস্থার বর্ণনা নয়, বরং এক পরম আবেগময় অনুভূতির আহ্বান। প্রকৃতি ও শিশুমনের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধনের রূপক।
প্রকৃতি এখানে কখনো দূরের নয়– মেঘ ছুঁয়েছে সকাল দুপুর…/ মেঘ ছুঁয়েছে মন ও হৃদয়/… (পৃষ্ঠা–৪), কবি জানিয়ে দেন প্রকৃতির প্রতিটি আন্দোলন আসলে অন্তরে প্রতিফলিত হয়। বৃষ্টি বাস্তবেও ভেজায়, আবার স্মৃতিকেও ভিজিয়ে দেয়। কবিতার দেহজুড়ে আছে জলের অভূতপূর্ব অনুষঙ্গ ‘জল বিলাসী কদম ফুল, জল জোছনার স্বপ্ন, জলকেলিতে ব্যস্ত সবাই, জলের হাসি’– মানেই জীবন জেগে ওঠা, ধ্বংস নয়, বরং পুনর্জন্ম।
এই গ্রন্থকে একমাত্র গ্রামীণ প্রকৃতির স্তূতি বললে ভুল হবে– এখানে তীব্র মানবিকতা আছে। ‘মেঘ দেশে ঘুড়ি’– (পৃষ্ঠা–৬)-তে নিষ্পাপ খোকা যখন দেখে কারও সুতোর টানে তার মুক্ত ছুটে চলা ঘুড়িকে, তখন আমাদের শিশুমনের গভীর এক শূন্যতা ও প্রতিবাদ জেগে ওঠে– ‘মন হয় ভারি আর ভাবে সেই কথা / তার মতো ঘুড়িটির নেই স্বাধীনতা।’
আকাশ আহমেদ এখানে শিশু–স্বাধীনতার কথা বলেন, ‘ঘরে ফেরা’ নয়, ‘মেঘের দেশে যাওয়ার’ আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে।
প্রতিটি কবিতায় শিশুমন তার মৌলিক অধিকার খুঁজে বেড়ায়– ‘মেঘ হয়ে পাখি হয়ে করে ছুটোছুটি / পাঠশালা থেকে মন পেল আজ ছুটি’। এখানে পড়াশোনা–ভীতি নয়, বরং অন্তরকে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রবল করে তোলে।
‘মুখরিত জীবন’– (পৃষ্ঠা–৭) এ আমরা দেখি এক উল্লাসোচ্ছল জীবনচিত্র– ‘কৃষকের হাসি, রাখালের বাঁশি, শাপলা–ডাঁটার ঝোল, প্রজাপতি, সিমফুল’। এই মুখরতা কেবল বাইরে নয়; পাঠকের ভেতরেও আলোড়ন তুলতে সক্ষম।
এর বিপরীতে ‘দীর্ঘশ্বাস’ (পৃষ্ঠা–৮) ও ‘মন ছিল না ভালো’ (পৃষ্ঠা–২০) পাঠককে সাবধান করে দেয় – শিশুমনও বিষণ্ন হয়, ভেঙে পড়ে, আশ্রয় খোঁজে– কবির ভাষায় -‘কী এক পাথর চেপেছিল বুকে …./ কিন্তু সেদিন আঁধার রাতের শেষে/ ফুলের গাঁয়ে প্রজাপতি এসে/ মন ভরালো অজানা এক সুখে / – এখানে বার্তা একটাই, সব অবসাদ ভেঙে আশা ফিরে আসার। ‘রাজকুমারের স্বপ্ন’ (পৃষ্ঠা–১৫) ও ‘স্বপ্ন ও স্বাধীনতা’ (পৃষ্ঠা–৯) কবিতাগুলো কেবল স্বপ্ন নয়, বরং মুক্তির ধারণা নির্মাণ করে – ‘লক্ষ কিশোর বজ্রকণ্ঠে বিজয়ী গান গেয়ে / আনতে গেলাম লাল সূর্যটা বাংলাদেশের বুকে’ / – এই নীরব শিশুসাহিত্যের ভেতর হঠাৎ গর্জনশীল এক রক্তাক্ত ইতিহাস প্রবেশ করে। শিশুমন তখন কেবল স্বপ্ন দেখে না, সে দেশমাতৃকার মুক্তিও চিনে। অন্যদিকে ‘পরবাসে’ (পৃষ্ঠা–২৩) ও ‘কখন পাবো ছুটি’ (পৃষ্ঠা–১৪) স্প’ প্রবাসী বেদনার কণ্ঠস্বর– ‘কাশফুল, কর্ণফুলি, কচি ঘাস’ সবই এখানে স্বদেশের মাটির সুরভি হয়ে ফিরে আসে মেঘের পথ ধরে।
এককথায় বলা যায় ‘মেঘ বলেছে বৃষ্টি হবে’ গ্রন্থের কবিতাগুলো– প্রকৃতির মধ্য দিয়ে মানুষকে ছোঁয়ার কবিতা, শিশু–কিশোর মনের স্বাধীনতার অস্তিত্বময় দর্শন, আনন্দ ও বেদনার পাশাপাশি বহমান এক অন্তর্দীপ্ত জীবনযাত্রা, শিকড়–প্রেমে আচ্ছন্ন। এ কারণেই এই গ্রন্থটি কেবল পাঠ নয়, পাঠান্তে পাঠক নিজেই হয়ে উঠেন– মেঘ, বৃষ্টি, ঘুড়ি ও এক মুক্ত পাখি।
আকাশ আহমেদের কিশোরোপযোগী কবিতাগুলিতে চিত্রকল্প, স্মৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে শৈশবের দৌড়ঝাঁপ– এসব দারুণভাবে চোখে পড়ে। তবে ছন্দ, মাত্রা ও গঠনগত দিক থেকে সমালোচনার মতো কিছু জায়গা অবশ্যই আছে। মাঝে মাঝে ছন্দের ওঠানামা দুর্বলতা মনে হয়েছে। যেমন– ‘মেঘ ছুঁয়েছে রাখাল বাঁশি/ বৃষ্টি ভেজায় ঘাস/ জলের সাথে বন্ধু পাতি/ আষাঢ়–শাওন মাস।’/- এখানে সুন্দর লয় আছে। ‘কানফুল নদীতীরে কাশফুল দোলে ….’ এমন লাইনগুলো ছবি হয়ে মনকে যেমন নাড়া দেয়, তেমনি কিছু কিছু স্তবকে– ‘সুপারির বনে কাকাতুয়া আর খেলে না সুখের দোল/ শুনি না দোয়েলের বিষণ্ন দুপুরে সুমধুর বোল’ (কবুতরী মন, পৃষ্ঠা –২১)- এখানে ছন্দ, উচ্চারণে হোঁচট খেতে হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় চিত্রকল্প অতিরিক্ত দীর্ঘ ও পুনরাবৃত্তিমূলক– বিশেষত ‘মেঘ’, ‘নদী’, ‘কিশোর’, ‘স্বপ্ন’, ‘কাশফুল’ শব্দের ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি পাঠককে একঘেয়ে করে তুলতে পারে। অনেক জায়গায় কমা/ দাঁড়ির অনুপস্থিতি পাঠকে থামতে দেয় না। একটু সচেতন হলে ‘চোখ–সুখ/ ঢেউ–বউ/ ঝোঁপ–রুপ/ ঝোল–চুল/ সুরে–ভোরে/-এর মতো অন্তমিলগুলো এড়ানো যেত।
গ্রন্থিত কবিতাগুলো অনুভূতিতে গীতিময়, দৃশ্যত সিনেমাটিক, শিশু–কিশোর মনের সঙ্গে অতি নিকটসম্পৃক্ত, এটিই কবির সবচেয়ে বড় শক্তি। দীর্ঘদিন যাবৎ কবি আকাশ আহমেদ লেখালেখির সাথে যুক্ত। এটি তাঁর সপ্তম গ্রন্থ হলেও কিশোর কবিতায় প্রথম। তাঁর হাতে আরো চমৎকার কিশোর কবিতা রচিত হবে এই আশাবাদ রাখতেই পারি।
বইটির চমৎকার প্রচ্ছদ ও পাতায় পাতায় আরো চমৎকার অলংকরণ করেছেন খ্যাতিমান রেখাকবি উত্তম সেন। লেখক গ্রন্থটি তাঁকেই উৎসর্গ করেছেন। একুশের বইমেলা’২৫ এ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম থেকে শৈলী প্রকাশন। সৌকর্যময় বোর্ড বাঁধাই, ঝকমকে ছাপা আর দৃষ্টিনন্দন গ্রন্থটির মূল্য মাত্র ২২০ টাকা। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করছি।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, আইনজীবী












