আইন-শৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

| রবিবার , ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় বক্তব্য প্রদানকালে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের এ নির্দেশনা দেন পুলিশপ্রধান।

এ সময় সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি সভায় যুক্ত ছিলেন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স প্রান্তে ছিলেন অতিরিক্ত আইজি (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) একেএম আওলাদ হোসেন, অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, ডিআইজি (অপারেশনস) মো. রেজাউল করিম, ডিআইজি (কনফিডেন্সিয়াল) মো. কামরুল আহসান প্রমুখ। সভায় গত নভেম্বরের সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি, সাজাপ্রাপ্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলা তদন্ত ও বিচারের ফলাফল, সাজার হার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে নানা ধরনের অপরাধ। মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সন্ত্রাস, গণপিটুনির ঘটনা, অপহরণ, মাদক ব্যবসা ও নানা ধরনের অপরাধ নিয়মিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রত্যাশা ছিল নতুন সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে, যার প্রভাব দৃশ্যমান হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দিন দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এসব পরিস্থিতি আইনের শাসনের অভাবকেই নির্দেশ করছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা এ অবস্থা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো চরম অবনতি ঘটতে পারে, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গেল বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে খুন হয়েছেন ১ হাজার ৯৩০ জন। মাসভিত্তিক খুনের সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। জানুয়ারিতে ২৯৪ থেকে জুনে এসে তা পৌঁছেছে ৩৪৩এ। গড়ে প্রতিদিন খুন হচ্ছে ১১ জন। একই সময়ে সংঘটিত হয়েছে ৩৬৬টি ডাকাতি, অপহরণ ৫১৫ এবং ১১ হাজার ৮ নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এসব তথ্য স্পষ্টভাবে একটি বিষয়ই নির্দেশ করছেদেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, খুনের বহু ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, চাঁদাবাজি এবং দলীয় কোন্দল। একটি গুরুতর বাস্তবতা হলো অনেক অপরাধ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সংঘটিত হচ্ছে। দলীয় কোন্দল, ক্ষমতা দখল, চাঁদাবাজি বা আধিপত্য বিস্তারের মতো ঘটনায় মানুষের প্রাণ ঝরছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি অপরাধীদের আশ্রয় দেয়, তাহলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধ যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ঢেকে রাখা হয়, তখন আইনের সঠিক প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দেশে আগে সংঘটিত খুনসহ বহু অপরাধের বিচার বিলম্বিত হয়েছে, এমনকি অনেক অপরাধী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবে পার পেয়ে যায়। এ বিচারহীনতার সংস্কৃতি এক ভয়াবহ বার্তা দেয়অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। এটি নতুন অপরাধীদের উৎসাহিত করে ও সমাজে আইনের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের সময়োপযোগী উদ্যোগ প্রয়োজন, তা এখনো পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তবে বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। যখনই কোনো ঘটনা ঘটে তখনই পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে যাচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতমূলক অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেলে পুলিশের কর্মকাণ্ডও স্থবির হয়ে পড়ে। সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ঢিলেমির চিত্র জনমানুষের চোখে পরিষ্কার।

আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কেবল বাহিনীর তৎপরতা নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে