আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় হবে নতুন সরকারের শপথ। সকালে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। বিকেলে প্রধানমন্ত্রী ও নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেবেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে। শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এতে অংশ নেয়ার জন্য ভারত–পাকিস্তানসহ ১৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় সংসদ ভবনে সরকার আর বিরোধীদল মুখোমুখি হত যুক্তি–তর্কে, নীতির লড়াইয়ে, জনস্বার্থের প্রশ্নে। তর্ক থাকত, মতভেদ থাকত, কিন্তু সেই বিতর্কই গণতন্ত্রের প্রাণসঞ্চার করত। বহু বছর ধরে একপেশে কার্যক্রমের অভিযোগে যে সংসদ সমালোচনার মুখে ছিল, সেখানে আজ শোনা যাচ্ছে নতুন সূচনার প্রত্যাশা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নিতে যাচ্ছে আজ। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেশি–বিদেশি অতিথিদের আমন্ত্রণ জানানোসহ অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন করতে তৎপর বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বলা যেতে পারে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফের গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে গণতন্ত্র ও অধিকার–বঞ্চনা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৪–এর জুলাই অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি সব শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে সারা দেশে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জোটের ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বড় জয়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটির ওপর জনপ্রত্যাশার ব্যাপ্তিও বাড়ছে। তাঁরা বলেন, নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে যেকোনো নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ দাঁড়ায়– একটি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফেরানো। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দুই খাত শুধু প্রশাসনিক নয়, জন–আস্থা পুনর্গঠনেরও মূল ভিত্তি। একটি সরকার কতটা সফল হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে সে কত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে এই দুই সংকট সামাল দিতে পারে। বিশেষ করে, গত দেড় বছরে অরাজনৈতিক সরকারের আমলে দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও অর্থনীতিতে একটা মন্দাভাব লক্ষ করা গেছে। যে দায় এখন নতুন সরকারের কাঁধে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগের ঘটতিসহ নানা কারণে অর্থনীতি যে সংকটে পড়েছে, তা থেকে দেশকে দ্রুত বের করে আনার ওপরও নতুন সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাই এ দুটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা সাজানো উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস বলে, শুধু নির্বাচনের দিনটা নয়; পরের কয়েকটি দিনও আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার দিক থেকে নাজুক সময়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে থাকছে। নির্বাচন–পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দেশের কোথাও কোথাও কোনো কোনো গোষ্ঠী নিজ এলাকায় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন–পরবর্তী সংঘাতের ঘটনাগুলো নিয়ে নানা অপতথ্য ও ভিডিও ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের অপতথ্য যেকোনো সময় সহিংসতা উসকে দিতে পারে। এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক দল–সবাইকেই সতর্ক ও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
শুরুতেই কঠোর না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে। নতুন সরকারকে সহযোগিতা করা সকলের উচিত। কেননা সংঘাত কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না। অগ্রগতি ও শুভবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য সহাবস্থান জরুরি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আবার অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই দুই খাতে সমন্বিত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ। আমরা চাই, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথে দেশের সবক্ষেত্রে জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে।







