আঁরে সবুজ সংকেত দিইয়্যে

সংবাদ সম্মেলনে গিয়াস কাদের

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম(রাউজান) আসনে দলের সবুজ সংকেত পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, ‘আঁরে সবুজ সংকেত দিইয়্যে।’ গতকাল শুক্রবার বিকেলে নগরের গুডস হিল বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে রাউজানের সমসাময়িক বিষয়ে কথা বলেন গিয়াস কাদের। তার দাবি, ‘রাউজান এখনো ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়নি। এসময় রাউজানে ৫ আগস্ট পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের ৯০ ভাগই ফ্যাসিস্ট দ্বারা সংঘটিত হয়েছে দাবি করে, কতিপয় বিএনপি নেতারা ফ্যাসিস্টকে প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া নাম উল্লেখ না করে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারের সন্তান ব্যারিস্টার তারেক আকবর খোন্দকারকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য থেকে ‘অপসারণের’ দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনে রাউজান উপজেলা বিএনপি নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের শিকার ১৩ জন আমার অনুসারী : গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী রাউজানে সংঘটিত ১৯ টি হত্যাকাণ্ডের শিকার ১৩ জনই আমার অনুসারী। বাকি ৬ জন পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতার কারণে হত্যার শিকার। তাদের একটাই অপরাধ তারা শহীদ জিয়া, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ও আগামীর রাষ্ট্র নায়ক তারেক রহমানের আদর্শ লালনকারী এবং আওয়ামী ফ্যাসিস্ট বিরোধী। কে তাদের হত্যা করেছে তা আপনারা সহজে বের করতে পারেন। শতকরা ৯০ জন ফ্যাসিস্টের হাতে নিহত হয়েছে।

তিনি বলেন, ছাত্রজনতার অভূতপূর্ব বিপ্লবের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশ ফ্যাসিস্ট মুক্ত হলেও রাউজান আজও ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়নি। ৫ আগস্টের পর রাউজানের মানুষসহ আমি ভেবেছিলাম আওয়ামী ফ্যাসিস্ট মুক্ত রাউজানে শান্তির সুবাতাস বইবে। কিন্তু আওয়ামী ফ্যাসিস্টের উচ্ছিষ্ট ভোগকারী বিএনপি দাবিদার, আওয়ামী লীগের বি টিম নামে রাউজানবাসীর নিকট সমধিক পরিচিত চিহ্নিত গোষ্ঠির নেতৃত্বদানকারী রাউজানে একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে।

গিয়াস কাদের অভিযোগ করে বলেন, কতিপয় ব্যক্তি ফ্যাসিস্টকে রাউজানে বসবাস করার জন্য আশ্রয় দিয়েছে। নির্বাচনী পদযাত্রা শুরু হয়েছে। পরিষ্কার হয়ে যাবে, এরা কারা? সীমান্তের ওপারে এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসে আমার দলের নেতাদের সঙ্গে কনফারেন্স লাইনে লাইন লাগিয়ে দিয়ে বলে, ‘এরা আপনার সঙ্গে থাকবে, আপনার সঙ্গে কাজ করবে, টাকাপয়সা দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে সাহায্যসহযোগিতা করে আমরা আপনার সঙ্গে আছি’।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের হাতে প্রচুর টাকা। এই টাকার অসৎ ব্যবহার রাউজানে করছে এবং কতিপয় নেতাদের মাধ্যমে এই টাকার অপব্যবহার হচ্ছে। শুধু ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসীদেরকে দায়ী করবো না, প্রশাসনের মধ্যেও ঘাপটি মারা ফ্যাসিবাদের অনুসারীরা আছে।

এ সময় রাউজানে ফ্যাসিস্টরা বিএনপির ছত্রছায়ায় আছে কীনা জানতে চাইলে গিয়াস কাদের বলেন, যদি ছত্রছায়া না থাকে তাহলে কি তারা রাউজানে বিচরণ করতে পারে? তারা অবাদে ঘুরাফেরা করতে পারে? শুধু বিএনপির ছত্রছায়া না, প্রশাসনিক ছত্রছায়াও আছে।

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে গিয়াস কাদের বলেন, বিক্ষিপ্তভাবে রাউজানে না। সমগ্র চট্টগ্রামে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চালাতে হবে। আমরা যারা ফেয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি তারা এটা স্বাগত জানাই। কিন্তু এদিক থেকে অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, আবার অন্যদিক থেকে অস্ত্র ঢুকানো হচ্ছে। সেটা আপনি রোধ করবেন কি করে বলেন তো?

এসময় অপরদিক বলতে সীমান্তের অপর প্রান্ত কীনা জানতে চাইলে গিয়াস কাদের বলেন, অবশ্যই অস্ত্র আসছে। রোধ করার মত ক্ষমতা আমরা পলিটিশিয়ানদের হাতে নেই। টেলিভিশনের পর্দায়ও দেখা গেছে, অস্ত্র কিভাবে ওপার থেকে আসছে। মানুষ খুন করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওপারে চলে যাচ্ছে না?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সন্ত্রাসী রায়হানের সঙ্গে থাকা ছবি সম্পর্কে জানতে চাইলে গিয়াস কাদের বলেন, রায়হান যদি সত্যিই আমার সহযোগী হতো, তাহলে কি তার নাম হাকিম হত্যা মামলার সঙ্গে যুক্ত হতো? রায়হানের বাড়ি রাউজানে। আপনারা আমার সঙ্গে তার ছবি দেখেছেন; একইভাবে আমি গোলাম আকবরের সঙ্গে তার অনেক ছবি বের করতে পারি আপনারা কি সাজ্জাদের সঙ্গে মীর হেলালের ছবি দেখেননি? রায়হান সাজ্জাদের অনুসারী। আমার পেছনে কে এভাবে ছবি তোলে, তা যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

সবুজ সংকেত পাওয়ার দাবি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাউজানে বিএনপি থেকে দুইজন মনোনয়নপত্র জমা দেয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে গিয়াস কাদের বলেন, আমরা দুইজনই তো বৈধ? না? যেহেতু আজকে নিজের বাসভবনে আপনাদের সকলকে দাওয়াত দিয়ে এনেছি, তাই আমারতো প্রশ্নের উত্তর সাদাসরলভাবে দিতে হয়। সাদাসরলভাবে দিতে গেলে, চাঁটগাইয়া ভাষাতেই বলে ফেলি, ‘আঁরে সবুজ সংকেত দিইয়্যে।’ (আমাকে সবুজ সংকেত দিয়েছে)। একদম হাইয়েস্ট লেভেল থেকে আমাকে বলেছে, আপনি এগিয়ে যান। এটা আনঅফিশিয়ালি আমাকে জানানো হয়েছে। অফিশিয়ালি জানানো হবে। মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগেই জানানো হবে। আপনারাও জেনে যাবেন।

গিয়াস কাদের বলেন, আমাদের মহাসচিব টেলিভিশনে বা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা বিকল্প মনোনয়ন দিয়েছি বিশেষ একটি কারণে। বিভিন্ন অভিযোগে মনোনয়ন বাতিল হতে পারে, সেই কারণে আমরা বিকল্প দিয়েছি।’ তিনি বলেন, আমি দৃঢভাবে বিশ্বাস করি, আমার হাই কমান্ড আমাকে অবজ্ঞা করবে না।

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম(রাউজান) আসনে বিএনপি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে প্রথমে মনোনয়ন দেয়। পরে মনোনয়ন দেয়া হয় চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারকে। দুইজনে মনোনয়নপত্র জমা দেন। বাছাইয়ে দুইজনের মনোনয়নপত্রই বৈধ হয়েছে।

এদিকে কোনো কারণে মনোনয়নবঞ্চিত হলে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবেন কীনা জানতে চাইলে গিয়াস কাদের বলেন, দলের থেকে মনোনয়ন না পেলে মোটামুটি মূল স্রোতধারা থেকে ছিটকে পড়া হয়। এখানে ইডিপেন্ডেন্ট করার কোনো রকমের স্কোপ নেই।

দল চূড়ান্ত মনোনয়ন না দেয়, সে ক্ষেত্রে গোলাম আকবরকে সমর্থন করবেন কি না প্রশ্নের জবাবে গিয়াস কাদের বলেন, আমি কাউকে সমর্থন করব কি না, সেটা দলীয় হাইকমান্ডই ঠিক করবে। আমি পরিষ্কার করে বলেছি, দল যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমি তার পাশেই থাকব।

তিনি বলেন, আমি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলাম এবং আমি আত্মবিশ্বাসী যে আমার হাইকমান্ড আমাকে উপেক্ষা করবে না।

তারেক আকবর খোন্দকারকে ইঙ্গিত করে যা বললেন : রাউজানের জানে আলম হত্যা প্রসঙ্গে নাম উল্লেখ না করলেও গোলাম আকবর খোন্দকারের সন্তান তারেক আকবরকে ইঙ্গিত করে গিয়াস কাদের বলেন, কতিপয় ব্যক্তি ইউটিউবে বক্তব্য রেখেছে– ‘স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন নেতার সঙ্গে মাটি কাটার দ্বন্দ্বে তাকে (জানে আলম) হত্যা করা হয়েছে’। এ বিষয়ে তার কাছে এভিডেন্স আছে কীনা সেটা তো জিজ্ঞেস করতে হয়।

উল্লেখ্য, গত ৫ জানুয়ারি দুর্বৃত্তের গুলিতে খুন হন যুবদল নেতা জানে আলম। এ ঘটনার জন্য গোলাম আকবর খোন্দকার অনুসারীদের দায়ী করেছিল গিয়াস কাদের অনুসারীরা। এ বিষয়ে তারেক আকবর খোন্দকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করে দাবি করেন, ‘নিহত জানে আলম গিয়াস কাদের চৌধুরীর অনুসারী, উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ইউসুফ তালুকদারের সঙ্গে বাগোয়ান ইউনিয়নে বালু ব্যবসায় জড়িত ছিল। বালু ব্যবসা নিয়ে তাদের মধ্যে সাত দিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল’। এছাড়া এক ভিডিও বার্তায় তারেক আকবর খোন্দকার বলেন, ‘এটা পলিটিক্যাল হত্যাকাণ্ড না। এটা বালু মহাল ও টাকা নিয়ে জড়িত।’

এদিকে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে গিয়াস কাদের বলেন, ‘রাউজানের শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রধান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী ওই গোষ্ঠির সন্তানকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য পদ থেকে দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি জানে আলম সিকদার হত্যাকাণ্ডসহ সকল হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িততের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

উল্লেখ্য, তারেক আকবর খোন্দকার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকাঠবোঝাই ট্রাকে এসি বাসের ধাক্কা, নেভি সদস্যসহ নিহত ৩
পরবর্তী নিবন্ধখালেদা জিয়া শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন