অ্যাডভোকেট নূরুচ্ছাফা তালুকদার সমাজের আলোকবর্তিকা

নিজামুল ইসলাম সরফী | বুধবার , ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ at ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ


মরহুম নুরুচ্ছফা তালুকদার ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার সুখবিলাস গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজী আলী আহমদ তালুকদার। লটারির মাধ্যমে পবিত্র হজ্বব্রত পালন করা এলাকার প্রথম সৌভাগ্যবান ব্যক্তি ছিলেন তাঁর পিতা। মাতার নাম রহমজান বিবি। মাত্র ৯-১০ বছর বয়সেই নুরুচ্ছাফা তালুকদার পিতৃহীন হন।
শৈশবে পিতাকে হারিয়েও তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি। চাচা মরহুম আমীর হোসেন তালুকদারের অনুপ্রেরণায় প্রথমে ‘সাড়াশিয়া প্রাইমারি স্কুলে’ তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার শুভ সূচনা। পদুয়া এলাকার একমাত্র স্কুলে প্রাইমারি শিক্ষা শেষে র্ভর্তি হন শিলক হাই স্কুলে। সেখানে শিক্ষাগুরু বাবু নীরোধ বরণ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ১৯৪৮ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে। সেখানে তিনি আরেক শিক্ষাগুরু দেশের অন্যতম শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ রেজাউল করিম চৌধুরীর সান্নিধ্যে থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৫০ সালে আই.এস.সি এবং ১৯৫২ সালে বি.এ পাস করেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। থাকতেন ইকবাল হলে (বর্তমানে সূর্যসেন হল)। আইন পাস করার পর কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতা দিয়ে। প্রথমে রাঙ্গুনিয়ায় ‘সরফভাটা হাই স্কুলে’, পরে চট্টগ্রামের ‘পোর্ট ট্রাস্ট হাই স্কুলে’। শিক্ষকতা চলাকালীন সময়ে তিনি সুনাম অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। ইংরেজিতে দক্ষতার কারণে তিনি স্কুলে ইংরেজি বিষয়টাই মূলত পড়ানোর দায়িত্বে ছিলেন।
ইতোমধ্যে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম গ্র্যাজুয়েশন করা আবদুল মালেক ছিলেন তাঁর শ্বশুর। তিনি পোর্ট ট্রাস্টের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর স্ত্রী নুরুন নাহার বেগম অত্যন্ত বিনয়ী, স্বামীভক্ত, সদালাপী, ধর্মভীরু, পরোপকারী ও সুগৃহিণী ছিলেন। ১৯৫৮ সালে পোর্ট ট্রাস্ট হাই স্কুলে শিক্ষকতাকালীন তিনি সংসার জীবন শুরু করেন। স্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছায় এবং শ্বশুরের আগ্রহে পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে আইন পেশায় নিযুক্ত হন। তিনি প্রখ্যাত আইনজীবী বদিউল আলমের অধীনেই আইন চর্চা শুরু করেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার গৌরব অর্জন করেন। মহান রাব্বুল আলামিনের অন্তিম ইচ্ছায় ১৯৬৯ সালের ৭ ডিসেম্বর পবিত্র শবে কদরের রাত্রিতে দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্ত্রী নুরুন নাহার বেগম ইন্তেকাল করেন। মরহুমা নুরুন নাহার বেগম মৃত্যুকালে ৪ পুত্রসন্তান রেখে যান। তখন তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান ড. হাছান মাহমুদ এর বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর। মরহুম নুরুচ্ছাফা তালুকদারের শ্বশুর ছিলেন একজন অত্যন্ত সাদামনের মানুষ। তিনি প্রথম মেয়ের মৃত্যুতে অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত হন। বিশেষ করে নাতিদের জন্যে তিনি ভীষণ চিন্তিত ছিলেন। তাই নাতিদের ভবিষ্যত জীবন চিন্তা করে তিনি নিজের তৃতীয় কন্যা কামরুন নাহার বেগমকে অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছাফা তালুকদারের সাথে বিবাহ দেন। তাঁর স্ত্রী কামরুন নাহার বেগম অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সন্তানদের লালন পালন করার পাশাপাশি নিজে পড়াশুনায় উচ্চতর শিক্ষা লাভ করে প্রথমে অধ্যাপনা পেশায় নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে তাঁর স্বামী মরহুম অ্যাডভোকেট নূরুচ্ছাফা তালুকদারের অনুপ্রেরণায় আইন পেশায় নিযুক্ত হয়ে স্বনামধন্য আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁর পেশাগত জীবনে তিনি স্পেশাল পি.পি. হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার কর্মী হিসেবেও সমাজে তাঁর বেশ সুনাম রয়েছে। অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছাফা তালুকদার সত্তর দশকের গোড়ার দিকে অ্যাসিস্ট্যান্ট পাবলিক প্রসিকিউটার নিযুক্ত হন। অতঃপর ১৯৮৩ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর নিযুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসাবে তাঁকে আবারো চট্টগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর নিযুক্ত করা হয়। পি.পি. হিসেবে তিন সকলের কাছে অতীব জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। ভদ্রতা, নম্রতা, মার্জিত স্বভাব এবং উদার মানসিকতার কারণে তিনি ১৯৯৯ সালে কোনো প্যানেলভুক্ত না হয়েও স্বতন্ত্রভাবে একক প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ সময় আইনজীবী সমাজের স্বার্থ ও সুনাম রক্ষায় তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন এবং নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছাফা তালুকদার একজন গর্বিত পিতা ও স্বামী ছিলেন। সমস্ত আইনজীবী সমাজে এবং তাঁর জুনিয়রদের কাছেও তিনি অত্যন্ত প্রাণপ্রিয় সিনিয়র ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি ৫ পুত্র ও ৩ কন্যা রেখে যান। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ড. হাছান মাহমুদ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যেমন সুপরিচিতি ব্যক্তিত্ব, তেমনি পরিবেশ বিজ্ঞানী হিসেবেও তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি বিদ্যমান। বর্তমানে তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পদক। তাঁর ২য় পুত্র এরশাদ মাহমুদ একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ৩য় পুত্র খালেদ মাহমুদ আন্তর্জাতিক ইসলামী ত্রাণ সংস্থার কান্ট্রি ডিরেক্টর। ৪র্থ পুত্র মোরশেদ মাহমুদ বেলজিয়ামে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই চাকুরিরত আছেন। ৫ম পুত্র ওয়াহিদ রায়হান ইফতেখার মাহমুদ বেলজিয়াম থেকে উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করে দেশে পর্যটন বিষয়ক ব্যবসায় নিয়োজিত আছেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা আইরিন সুলতানা একজন এমবিবিএস ডাক্তার। বর্তমানে এম.ফিল করছেন। মেজ মেয়ে ফারহানা সাবরিনা (জুঁই) চুয়েট থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে ঢাকার University of Liberal Arts of Bangladesh- এর শিক্ষকতায় নিযুক্ত আছেন। ছোট কন্যা শেহরীন আফছানা (চৈতী) বর্তমানে বার-এট-ল-এ হিসেবে নিয়োজিত আছেন। চট্টগ্রাম বারের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবুল হাসেম তাঁর এক স্মৃতিচারণে বলেন- ‘অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছাফা তালুকদার আইনজীবী সমাজের শ্রেষ্ঠদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন আমাদের শুদ্ধতার বিবেক। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী এবং প্রগতিশীল আইনজীবীদের অভিভাবক হিসেবে তিনি আমাদের পথ দেখিয়েছেন, অন্ধকার সমাজে আলো বিলিয়েছেন। একজন সফল শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী এবং অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি নিজেকে এই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন’।
অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছাফা তালুকদার সস্ত্রীক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেছেন। উল্লেখযোগ্য দেশের মধ্যে ভারত, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব প্রভৃতি। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অসীম সাহসিকতায় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন এবং গ্রামে লঙ্গরখানা চালু করেন। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দেয়াসহ তাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালনে নির্ভীক ছিলেন। সে সময় তিনি রাঙ্গুনিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছাফা তালুকদার ছিলেন একজন প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনার আলোকিত মানুষ। সারা জীবন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শে উজ্জীবিত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে কী পেশাগত জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে কোনোদিন কোনোরূপ অন্যায় ও অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি এবং কোনো অন্যায়ের সাথে তিনি আপস করেননি। আদালতে মামলা পরিচালনায়ও তিনি কখনো নিজ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ক্ষুণ্ন করেননি। তাই সর্বস্তরে তাঁর সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা সর্বজনবিদিত। তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭.২০ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহি….রাজেউন)। তাঁর রেখে যাওয়া অমলিন আদর্শ যুগযুগ ধরে আমাদের সকলের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। আজ ১১ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সমাজের আলোকবর্তিকা আমাদের বিবেকের বাতিঘর মরহুম অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছাফা তালুকদারের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সংগঠক, আয়কর পেশাজীবী,
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধউপাচার্য : উৎকর্ষ ও উন্নয়নের প্রতীক