অস্তিত্বের প্রতীক বইমেলা

আয়েশা পারভীন চৌধুরী | বৃহস্পতিবার , ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৩৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ হচ্ছে আমাদের বইমেলার আয়োজন। ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সারা মাসব্যাপী বইমেলা চলে। আবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে স্বাধীনতার বইমেলার আয়োজন করা হয়। বইমেলা মানেই এক শ্রেণির মানুষের প্রাণের উৎসব। কারণ বই পড়ার মতো মনমানসিকতা সবার থাকে না। বই প্রেমীরা সারা বছর অপেক্ষা করে; কখন বইমেলা শুরু হবে? নতুন নতুন বই আসবে। আর যারা লেখালেখি করেন তারাও সারা বছর অপেক্ষা করেন। তাদের বইগুলো বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করবে। এখানে লক্ষণীয় লেখক লেখিকা ও প্রকাশনা সংস্থাগুলো বইমেলাকে নিয়ে জীবন ও জীবিকা চালিয়ে যায়। তাছাড়া বইমেলায় বিভিন্ন স্টোরগুলো সাজানোর সাথে জড়িত যারা আছেন তারাদেরও জীবন জীবিকা এই কয়েকটা মাসের উপর নির্ভর করে। কিছু কিছু স্টলে বিভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি বইমেলায় একটা সংস্কৃতিক মঞ্চ থাকে যেখানে বিভিন্ন ধরনের গান কবিতা ছড়া আলাপ আলোচনা চলতে থাকে। সর্বস্তরের মানুষের সমাগম ঘটে। বইমেলায় আগত সবাই যেন এক সূত্রে গাঁথা যেখানে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করা যায়। প্রাণের সঞ্চার ঘটে।

জীবন বিকাশের অন্যতম একটি মাধ্যম হচ্ছে বই। বই পড়ে মানুষ তাদের মেধা ও মননের পরিচয় দিয়ে থাকে। সবার শৈশবে বাল্যশিক্ষা ধারাপাত নামে একটা বই ছিল। আর এই বই পড়ে বাচ্চারা তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করতো। বিভিন্ন ধরনের ছবি সম্বলিত বইগুলো বাচ্চাদেরকে আনন্দ দিয়ে থাকে। আমাদের দেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাচ্চাদের উপযোগী অনেক ধরনের বই প্রকাশিত করে। শিশুরা অনেকেই পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের গল্প কবিতা ছড়ার বই পড়তে পছন্দ করে। বইয়ের প্রতি আগ্রহটা তাদেরকে জীবনধর্মী জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করে। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের কার্টুনের ও বিজ্ঞানভিত্তিক বইগুলো ছোটদেরকে বেশি আকর্ষণ করে। এক সময় যে কোনও অনুষ্ঠান আয়োজনে সকলেই উপহারস্বরূপ বইকে প্রাধান্য দিতো। বাচ্চাদের জন্মদিন পালন উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনরা সুন্দর সুন্দর ছড়া ও ছোট গল্পের বই উপহার হিসেবে দিতো। বিশেষ করে বন্ধু বান্ধবীকে নিয়ে যখন জন্মদিন পালন করতো তখনো বই প্রাধান্য পেতো। এক এক সময় এক একজন কবি সাহিত্যিক গল্পকার অনেক বেশি পরিচিত লাভ করে। আর সময়ের সাথে সাথে সেই বইগুলো যেন সবার মনমানসিকতার প্রকাশ ঘটায়। তাছাড়া আমার জানামতে প্রায় ৯০ দশক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার কেমন যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল। সোনালী অতীতে কে কার বই পড়েছে, কার কাছে কত বেশি বই সংগ্রহ আছে, কে কত গল্পকারের নাম জানে, কোন গল্প ও কোন উপন্যাস বেশি সমাদৃত .. এগুলো নিয়ে চর্চা হতো। এগুলো নিয়েই আলাপ আলোচনা করতো। আড্ডার বিষয়বস্তু ছিল। এক একজন কবি সাহিত্যিকের বিখ্যাত বইগুলোকে তারা উপহার হিসেবে দিতেন। এখনো কোন বয়স্ক মানুষের জন্মদিন ও বিবাহ বার্ষিকী পালন উপলক্ষে বই উপহার হিসেবে প্রাধান্য পায়। অসুস্থ মানুষকে দেখতে যাওয়ার সময় অনেকেই বই নিয়ে যায়। ফলে মনের প্রশান্তি ও সুন্দরভাবে সময় কাটানোর জন্য বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। বইয়ের ভ্রাম্যমাণ গাড়ি ও বইয়ের ভ্রাম্যমাণ নৌকা বইয়ের প্রচার ও প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে।

দূর পাল্লার যাত্রাপথে সমপ্রতি কিছু ঘটনা খুবই লক্ষণীয়। বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রীদের যাত্রা বিড়ম্বনা দূর করার জন্য স্টেশনে অথবা বাস কাউন্টারে একটা বইয়ের আলমারি থাকে। যাত্রীরা তাদের পছন্দ মত বই নিয়ে পড়তে বসে যায়। সেই যাত্রী হয়তো বয়স্ক হতে পারে, যুবক যুবতী হতে পারে অথবা ছোট ছোট কোমলমতী ক্ষুদে শিক্ষার্থী হতে পারে। স্টেশনে বসে বই নিয়ে কিছুটা সময় অতিক্রম করে। অতঃপর নির্দিষ্ট গাড়ি করে গন্তব্যের দিকে ছুটে যান। যাত্রাকালীন সময়ে দেখা যায় অনেকেই একাগ্রচিত্তে বই পড়তে পড়তে তাদের আর সময় জ্ঞান থাকে না। কখন যে সময় চলে যায়। অতঃপর নির্দিষ্ট স্টেশনে পৌঁছান।

আরো লক্ষ্যণীয় বিভিন্ন অফিস আদালতের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে বইয়ের একটা স্টল থাকে। সেখানে অনেক ধরনের বই সাজানো থাকে। পর্যটকরা নিজেদের পছন্দ মত বই পড়ে আবার জমা দেয়। যেকোনো লাইব্রেরীতে নতুন ও পুরাতন বইয়ের সমাহার থাকে। এক ধরনের অনুভূতি নিয়ে বইপ্রেমীরা প্রবেশ করে। কারণ সকলের সব সময় সব ধরনের বই কেনা সম্ভব হয় না। আবার সব বই সংগ্রহ করাও সম্ভব না। বিশেষ বিশেষ লেখকদের বইগুলো পেয়ে খুবই আনন্দিত হয়। স্কুল কলেজগুলোর বিভিন্ন বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বইকে উপহার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর বইগুলো ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মেধার বিকাশ ঘটায়। একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থার জন্য বই মেলার বিকল্প নাই।

লেখক: প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক, ডা. ফজলুলহাজেরা ডিগ্রী কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমানবিক সত্তার জাগরণে পাঠাভ্যাস
পরবর্তী নিবন্ধহজরত মতিয়র রহমান শাহ্‌ (ক.) ফরহাদাবাদিকে যেমন দেখেছি