১৯৭৬ সালে বৃহত্তর পটিয়া থেকে চন্দনাইশ উপজেলা পৃথক হওয়ার পর এ আসনে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে বিএনপির ব্যারিস্টার মাহবুবুল কবির চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রদূত হলে ১৯৮১ সালে উপ–নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পর্যায়ক্রমে রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে উঠেন এবং ৬ বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এমন একটা সময় ছিল কর্নেল অলি মনোনীত প্রার্থীদের চন্দনাইশবাসী চোখ বন্ধ করে সমর্থন দিতেন এবং নির্বাচিত করতেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে কর্নেল অলি বিএনপি সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, যোগাযোগ মন্ত্রী এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সর্বশেষ সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুকের পরাজয়ের মধ্যদিয়ে সব হারালেন কর্নেল অলি। অলির কারণে ছেলে ওমর ফারুককেও এবারের নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি জামায়াত জোটে যোগ দেয়ায় আসনটি নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন আহমদকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। নির্বাচনে জিতে তিনি তাক লাগিয়ে দেন। প্রেস্টিজ ইস্যুর আসনে পরিণত হওয়া এ আসনটিতে ছেলে ওমর ফারুকের জয় নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রচার–প্রচারণা চালিয়েও জয় নিশ্চিত করতে পারেননি কর্নেল অলি।
জানা যায়, ১৯৮১ সাল থেকে প্রায় ৩ যুগ পর বিগত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে সংসদ সদস্য পদ হারান কর্নেল অলি। সেই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলহাজ নজরুল ইসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরই মধ্যে ২০১৪ সালের ১৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। সে নির্বাচনে কর্ণেল অলির মনোনীত ১৯ দলীয় জোটের সমর্থনে দ্বিতীয় বারের মতো উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এলডিপি নেতা আলহাজ্ব আবদুল জব্বার চৌধুরী। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে আবদুল জব্বার চৌধুরীর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয় কর্নেল অলির। সে সময় অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে এলডিপি সমর্থিত প্রার্থী কর্নেল অলির আপন ভাতিজা মোহাম্মদ আইয়ুবেরও ভরাডুবি হয়। পৌর নির্বাচনে আইয়ুবের পক্ষে উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার চৌধুরী কোনো ভূমিকা না রাখার অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। নিজে সংসদ সদস্য পথ হারানোর পাশাপাশি একে একে হাতছাড়া হয় তার অনুসারী উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ, পৌরসভার মেয়রের পদ এবং সকল ইউপি চেয়ারম্যানের পদগুলোও। সেই থেকে চন্দনাইশে ধীরে ধীরে কর্ণেল অলির প্রভাব কমতে শুরু করে এবং এলাকায় প্রভাব রাখার সবই তিনি হারিয়ে ফেলেন। অথচ ২০১৪ পূর্ববর্তী চন্দনাইশের জনপ্রতিনিধিত্বের সব পদই ছিল তার দখলে।
পরিসংখ্যান মতে, ১৯৭৬ সালে চন্দনাইশ থানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৮১ সালের উপ–নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মাঝে ১৯৮৬ সালে ৭ মে তৃতীয় সংসদ, ১৯৮৮ সালে ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদ। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদ, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ, একই বছর ১২ জুন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক) আসন ছাড়াও চট্টগ্রাম– ১৫ সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসন থেকেও বিজয়ী হন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক) আসনটি ছেড়ে দিলে উপ–নির্বাচনে তাঁর সহধর্মিণী মমতাজ অলি আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলহাজ নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করে জয়লাভ করেন। ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম– ১৪ আসনে পুনরায় কর্ণেল অলি নির্বাচিত হন এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ২০০৬ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ছেলে তারেক রহমানসহ দলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিএনপি ছেড়ে বেরিয়ে যান অলি আহমদ। তখন সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদোজা চৌধুরীর দল বিকল্পধারার সাথে যুক্ত হন তিনি। পরবর্তীতে ওই জোট থেকেও তিনি বেরিয়ে যান এবং ২০০৬ সালের ১৩ এপ্রিল নতুন রাজনৈতিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) গঠন করেন। ১/১১ পরবর্তী ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি এলডিপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে তিনি পুনরায় যুক্ত হন। কিন্তু নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ৫ জানুয়ারির সেই নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় তিনিও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। সেই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলহাজ নজরুল ইসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ পরবর্তী পরপর দুই বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরী। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা করায় শ্রম ও কর্মস্থান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চন্দনাইশে আবারও প্রভাব বিস্তার শুরু হয় কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম ও তার অনুসারী নেতাকর্মীদের। পাশাপাশি শক্তিশালী হয়ে উঠে উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের কার্যক্রম। এদিকে ৫ আগস্ট পরবর্তী বেপরোয়া হয়ে উঠে এলডিপির কতিপয় নেতাকর্মী। তাদের ব্যাপক মামলা বাণিজ্য, বালু মহাল, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার ফলে চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক এলাকায় অলির ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। এছাড়াও শেষ পর্যায়ে এসে জামায়াতের সাথে জোট গড়া, বিভিন্ন সময় বিতর্কিত বক্তব্য প্রদান করায় ধীরে ধীরে অলির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সাধারণ মানুষ। সর্বশেষ তার প্রতিফলন দেখা যায় ১২ ফেব্রুয়ারির সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এই নির্বাচনে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র অধ্যাপক ওমর ফারুক ১ হাজার ২৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন বিএনপি প্রার্থী আলহাজ্ব জসিম উদ্দীন আহমদের কাছে। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে কর্ণেল অলি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় ঐক্যজোটে গিয়েও তার ছেলেকে এমপি বানাতে ব্যর্থ হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরাজয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কর্ণেল অলির হাতে গড়া রাজনৈতিক দল এলডিপির ভবিষ্যৎ। এখন প্রশ্ন হলো তার ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুক আগামীতে রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকে দলের হাল ধরবেন কি না। নাকি ফিরে যাবেন তার পুরনো কর্মস্থল অধ্যাপনায়। এই প্রশ্নইটিই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চন্দনাইশের আপামর জনসাধারণের কাছে।












