এক সময়ের ঝোঁপঝাড়ে ভরা পরিত্যক্ত পাহাড়ের ভাঁজে এখন শুধুই সবুজের সমারোহ। বাতাসের সাথে ভেসে আসে লেবুর সতেজ সুবাস। রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি জনপদে এখন লেবু মানেই কেবল একটি ফল নয় বরং হাজারো মানুষের দারিদ্র্য জয়ের হাতিয়ার। এখানকার পাহাড়–টিলায় বাণিজ্যিকভাবে বারোমাসি লেবু চাষ করে ভাগ্য বদলেছেন অর্ধশতাধিক তরুণ ও অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাঙ্গুনিয়ার এই রসালো লেবু এখন প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে পাড়ি জমাচ্ছে ঢাকা–চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় বাজারে। লেবু চাষের এই নীরব বিপ্লবে রাঙ্গুনিয়ার জনপদে বইছে সচ্ছলতার হাওয়া।
জানা যায়, রমজানকে সামনে রেখে পাহাড়ি জনপদ সরফভাটা মীরেরখীল থেকে শুরু করে বোয়ালখালী, শিলক, পদুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় থাকা শত শত একর লেবু বাগানে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চাষিরা। বৃষ্টির দিনে লেবুর ভরা মৌসুম হলেও রমজান মাসকে সামনে রেখে বেশ কদর বেড়েছে লেবুর। প্রতি শত লেবু এখন মাঠেই বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা দামে। এসব এলাকার উৎপাদিত লেবু চলে যাচ্ছে সারাদেশে। প্রতিদিন ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহন নিয়ে চাষিদের দুয়ারে ধর্ণা দিচ্ছেন পাইকারি চাষিরা। তবে গর মৌসুম হওয়ায় চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম। তবুও প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে লেবু রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি জনপদ থেকে যাচ্ছে সারাদেশে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সরফভাটা পাহাড়ি এলাকা ছাড়াও পারুয়া, রাজানগর, ইসলামপুর, দক্ষিণ রাজানগর, পদুয়া, কোদালা, লালানগরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় লেবু আবাদ হয়। লেবু আবাদ বাড়াতে সরকারিভাবে প্রণোদনা এবং প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলার মীরেরখীল গ্রামের লেবু চাষি আজিম উদ্দিনের গল্পটা রূপকথার মতো। ২০১৬ সালে মাত্র ৫০টি চারা দিয়ে শুরু করা সেই ছোট্ট বাগান আজ ১০ একর পাহাড়জুড়ে বিস্তৃত। বাগানে এখন ৮ হাজারের বেশি ফলবতী গাছ। আজিম জানান, প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকার লেবু বিক্রি করেন তিনি। শুধু ফল নয়, চারা কলম বিক্রি করেও বছরে ঘরে তোলেন লাখ টাকা। তার হাত ধরে মীরেরখীলসহ পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকায় লেবু চাষে রীতিমতো জোয়ার এসেছে।
সরেজমিনে সরফভাটা–বোয়ালখালী সড়ক ধরে এগোলেই দেখা যায় লেবু চাষিদের কর্মব্যস্ততার চিত্র। কেউ বাগান পরিচর্যায় মগ্ন, কেউ কাঁধে করে লেবুর বস্তা নিয়ে নামছেন পাহাড় থেকে। স্থানীয় বড়খোলাপাড়া বাজারে প্রতিদিন বসে লেবুর বিশাল হাট। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রথমে বাগান থেকেই লেবু সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন হাটে। সেখানে স্তূপ করে রাখা লেবুগুলো শত হিসেবে বস্তাবন্দি করা হয়। সেখান থেকেই সারাদেশের পাইকাররা ট্রাকে করে নিয়ে যায় সারাদেশের বাজারে। উদ্যোক্তা মো. আজিম ও মো. বাবলু মিয়া জানান, এখানকার লেবুর আকার ও স্বাদ ভালো হওয়ায় ঢাকা–চট্টগ্রামের পাইকারদের প্রধান টার্গেট এই বাজার। প্রতি বস্তায় ৬০০–৭০০টি লেবু থাকে, যা মানভেদে ১০–১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
এদিকে লেবু চাষিদের অপ্রতিরোধ্য এই অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা ও সেচ ব্যবস্থা। বৃষ্টির দিন বাদে বাকি সময় সেচের জন্য হাহাকার করতে হয় চাষিদের। সরকারিভাবে সেচ পাম্প সহায়তার দাবি তাদের। এর চেয়েও বড় শঙ্কা নিরাপত্তা নিয়ে। গতবছর সাড়ে ৫ লাখ টাকার লেবুভর্তি ট্রাক ছিনতাই এবং প্রতিবাদ করায় ব্যবসায়ী নাছেরের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বড় বিনিয়োগকারীরা পিছু হটতে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস বলেন, রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি মাটি লেবু চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। বিশেষ করে বারোমাসি ফলন নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রদর্শনী দেওয়া হচ্ছে। সেচ ও অন্যান্য সমস্যা সমাধানেও আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করছি।












