অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে আগামী সরকারকে

| শুক্রবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:০২ পূর্বাহ্ণ

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গত ১০ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী সরকারের সামনে থাকা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে বলেন, ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্পের প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা সমপ্রসারিত না হলে কর্মসংস্থান হবে না। আর কর্মসংস্থান ছাড়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল থেকে যাবে। এটি অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ।’ বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করার পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এ কথা বলেন। অর্থ উপদেষ্টা বলেন, পরবর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যবসা ও শিল্পকারখানার কর্মকাণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করা। কারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি মূলত প্রাণবন্ত বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের শিল্প ভিত্তি এখনও তুলনামূলকভাবে ছোট এবং দেশটি রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব শিল্প শক্তি বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনও একটি উদ্বেগের বিষয় এবং এটি কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। আমরা এটি সমাধানের চেষ্টা করেছি, তবে এর জন্য আরও ব্যাপক পদক্ষেপ প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, এই খাতকে পুনর্গঠন করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তবে সামনে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অর্থ উপদেষ্টা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সামপ্রতিক উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করলেও স্বীকার করেন যে এগুলো পর্যাপ্ত ছিল না। তিনি বলেন, ‘ঋণপ্রবাহ এখনও সীমিত এবং পুরোপুরি আস্থা ফিরে আসেনি, যদিও সমপ্রতি আমানত বাড়তে শুরু করেছে।’ ব্যবসায় অর্থায়নের জন্য ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে তিনি পুঁজিবাজার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘যদি আমরা পুঁজিবাজারের উন্নয়ন করতে না পারি, তবে শুধু ব্যাংকের ওপর নিভর্র করে ব্যবসাবাণিজ্য বাড়বে না। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে ইকুইটি অংশগ্রহণ এবং একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের জন্য অপরিহার্য।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নিয়ন্ত্রক সংস্কারের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা এবং আদালত সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা বিমা খাতকে আরেকটি সংবেদনশীল খাত হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই খাতের উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। প্রচেষ্টা চালানো হলেও অগ্রগতি এখনও সীমিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জ্বালানি খাতকে একটি বড় দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বিশেষজ্ঞরা বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিসহ আগামী নতুন সরকারের সামনে ১২টি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্বাচিত সরকারকে প্রথম বছরেই গ্রহণযোগ্য শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। ওই সরকারের প্রধান কাজ হবে সংকট মোকাবিলা করা।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক মূল প্রবন্ধে আগামী সরকারের সামনে প্রধান ১২টি চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। যার মধ্যে রয়েছে, এলডিসি উত্তরণের জন্য সময় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক ব্যবস্থার পুনর্গঠন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। এ ছাড়া আছে বিনিময় হার ধরে রাখতে রিজার্ভ বাড়ানো, রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো। অন্যান্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে ঋণের চাপ সামাল দেওয়া, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো। এ ছাড়া তথ্যউপাত্তের স্বচ্ছতা আনা ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন। এতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর বেতন সমন্বয়ের যৌক্তিকতা থাকলেও এর আর্থিক প্রভাব অনেক বড়। যথেষ্ট আর্থিক প্রস্তুতি ছাড়া এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হতে পারে এবং বাজেটঘাটতি আরও বাড়তে পারে।

তাঁরা বলেন, রাজস্ব সংহতির জন্য নতুন সরকারকে নেতৃত্ব পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যয় দক্ষতা বাড়াতে জবাবদিহি জোরদার করা জরুরি। সরকারি তহবিল ব্যবহারে সংসদীয় নজরদারি শক্তিশালী করতে হবে এবং বাজেট বাস্তবায়নের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা ও অপব্যবহার রোধ করা কিছুটা সহজ হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে