প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়ে দেশের রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেছেন, ‘রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন।’ তবে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এ উদ্যোগের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবেন, মালিকানা বা অংশীদারত্বের ধরন কেমন হবে, সে বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রুগ্ণ ও বন্ধ পাটকল ও চিনিকলগুলো খুলে দিয়ে সেখানে পুরনো শ্রমিকদের বহাল রেখে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের জুনে সংসদে দেয়া তথ্যে বলা হয়েছিল, ওই সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৯৭। এর মধ্যে বিসিকের নিয়ন্ত্রণাধীন রুগ্ণ/বন্ধ শিল্প ৩৮২টি, বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন পাঁচটি, বিএসএফআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন ছয়টি চিনিকল ও বিএসইসির চারটি কারখানা রয়েছে। এরপর গত দুই বছরে এ সংখ্যা আরো বেড়েছে। তবে হালনাগাদ কোনো পরিসংখ্যান সরকারের তরফে প্রকাশ করা হয়নি।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন কর্মসংস্থান তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্প–কারখানাগুলো খুলে দেয়ার উদ্যোগ নিতে বলেছেন। এ ব্যাপারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে।’
কোনো শিল্প উদ্যোগ যেন রুগ্ণ হয়ে না পড়ে সেজন্য অনেক আগে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণ নিশ্চিতকরণের আহ্বান জানিয়েছিল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন রিহ্যাবিলিটেশন অব সিক ইন্ডাস্ট্রিজের দ্বিতীয় সভায় এ আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠন সভাপতি। তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যাংক ঋণ নিয়ে একটি কারখানা স্থাপন করতে গেলে দেখা যায়, কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঋণের মেয়াদ শেষ। এতে করে একজন উদ্যোক্তা তার কারখানায় উৎপাদন শুরুর আগেই ঋণখেলাপিতে পরিণত হন। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থা না থাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠানটি রুগ্ণ হয়ে পড়েছে।’ একবার কোনো উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে, প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে তার ঋণ হিসাব সহজে অবসায়ন করা সম্ভব হয় না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। এমন অবস্থায় রুগ্ণ শিল্পের পুনর্বাসন এবং নিষ্পত্তিকরণ প্রক্রিয়া সহজীকরণে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তাঁরা এবং বলেছিলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রুগ্ণ শিল্পকে টেনে তুলতেই হবে। এক্ষেত্রে দেশের ব্যাংকগুলোই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’ রুগ্ণ শিল্পের নিষ্পত্তিকরণ প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করতে দ্রুত একটি ‘রুগ্ণ শিল্প নীতিমালা’ প্রণয়ন জরুরি বলেন জানান তাঁরা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে অত্যন্ত জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, রুগ্ণ বেসরকারি খাত, দুর্বল রাজস্ব আয় এবং প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের চাপ তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমিত সম্পদ ও বিপুল জনপ্রত্যাশার মধ্যে সরকার কঠিন পথচলা শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মসূচি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে। এই সময়ের পদক্ষেপগুলো যদি বাস্তবভিত্তিক, অগ্রাধিকার নির্ধারিত এবং সাহসী হয়, তবে সেটিই হতে পারে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ।
তাঁরা বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অগ্রাধিকার পেতে পারে গণতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং জনকল্যাণ। অর্থনৈতিকভাবে বন্ধ শিল্প পুনরুদ্ধার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা প্রত্যাহার সহজীকরণ এবং আইসিটি খাতে ১০ লাখ চাকরি সৃষ্টি অগ্রাধিকার হতে পারে। গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইউনূস সরকারের সময়ে ঋণ বেড়েছে এবং উন্নয়ন ব্যয় সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বর্তমানে সরকারি আয়ের এক–পঞ্চমাংশ শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে কম অর্থ থাকছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে, কিন্তু অর্থনীতির বর্তমান দুরবস্থা, ব্যবসা–বাণিজ্যে মন্দাভাব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া ও কর্মসংস্থান সংকোচনের কারণে রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। সার্বিকভাবে নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কাজটি কঠিন। তবু প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়ে এর যাত্রা শুরু করা যেতে পারে।









