অভ্যন্তরীণ সংকট ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেই চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনে ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি সহায়তা গ্রহণের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অব পেমেন্ট রক্ষায় এই সহায়তার কথা ভাবা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বৈশ্বিক বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থার কাছ থেকে এই সহায়তা চাওয়া হবে। এমন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তবে তিনি এ–ও বলেছেন, বিষয়টি এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটময় পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অনলাইন গণমাধ্যমের বাণিজ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় গভর্নর এই পরিকল্পনার কথা জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সম্মেলনকক্ষে রোববার এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গভর্নর বলেন, ‘লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় ২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে কথা বলেছি। এ ছাড়া অন্যান্য উৎস থেকে এই সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডিও চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে এই মুহূর্তে আমরা সতর্কতার সঙ্গে চলার কৌশল বা নীতি অবলম্বন করছি।’
গভর্নর তাঁর সভাপতির বক্তব্যে বলেন, দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমেই অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, তিনটি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ করছেন তিনি। তার মধ্যে প্রথম অগ্রাধিকার কৃষি খাত। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত বা এসএমই। আর তৃতীয় অগ্রাধিকার বন্ধ কারখানা সচল করা। গভর্নর বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে এই মুহূর্তে ঋণের সুদহার কমানো ঠিক হবে না। নতুন বিনিয়োগও সময়সাপেক্ষ। তাই এই মুহূর্তে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে আমাদের সামনে অন্যতম বিকল্প বন্ধ কারখানা যত দ্রুত সম্ভব সচল করা।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, টানা দেড় বছর অর্থনীতি, ব্যবসা–বাণিজ্যকে বাস্তবিক অর্থে যেন রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ করে তোলা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকাণ্ড বেসরকারি খাতকে রীতিমতো টুঁটি টিপে ধরে। ফলে দেশে এখন নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। কর্মসংস্থান বাড়ছে না। ঋণের অতি উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গ্যাস–বিদ্যুতের অভাবে শিল্পের উৎপাদন ক্রমেই কমছে। কোনো কোনো শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমেছে। এতে উদ্যোক্তাদের লোকসান বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা যখন চোখে–মুখে অন্ধকার দেখছেন, তখন আশার কথা শোনালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি জানান, বন্ধ কারখানা চালু করতে এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁদের পাশে থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে চলমান রাখতে ব্যবসায়ীদের জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বেশির ভাগ ব্যবসায়ী দেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগের জন্য কাজ করতে চান। আমাদের সংস্কৃতিতে যখন রাজনৈতিক পালাবদল হয়, তখন আগের সময়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। ফলে সবার প্রতি সুবিচার করা হয় না। ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের ওপর কালিমা দেওয়া ঠিক না। তিনি বলেন, যেসব ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি খাত অর্থনীতিতে অবদান রাখতে চান, নির্বাচিত সরকারকে তাদের কাজের সুযোগ করে দেওয়ার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে যাচাই–বাছাই করে ব্যবসায়ীদের বন্ধ হওয়া ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া উচিত। তবে যারা অন্যায় করেছে তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যবসায়ীদের আস্থায় আনা জরুরি। তাই তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা উচিত। তাঁরা বলেন, দেশে ব্যবসার পরিবেশ ঠিক রাখতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আইনশৃঙ্খলা। এ ছাড়া পরিবেশ ঠিক রাখতে আরও দুটি বিষয় যুক্ত করা প্রয়োজন। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতি কমাতে হবে। এ তিনটি ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। তাই ব্যবসা সমপ্রসারণ ও পরিচালনায় আস্থা ফেরাতে এক থেকে তিন মাসের মধ্যে নতুন সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।









