অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ৭ এপ্রিল, ২০২৬ at ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ

দেশের শিল্পখাতে এবং সারাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বর্তমানে এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হিসেবে অবির্ভূত হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন ও বিনিয়োগকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। অভ্যন্তরীণ সংকট ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে সেই চাপ মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের আস্থায় আনা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে চলমান রাখতে ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি এখন সময়ের দাবি। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেভাবে ব্যবসায়ীদেরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে হয়রানি করেছেন তাতে দেশের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ স্থবির হয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বের অস্থিতিশীল অবস্থায় ব্যবসায়ীদেরকে হয়রানি না করে তাদেরকে ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরুর পর থেকেই বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার উদ্যোগ নিয়ে এ খাতকে চালু রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে চাহিদানুযায়ী প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। তিন মাস আগে উদ্যোগ নিয়েও সরকার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির একটি চালানও আমাদানী করতে পারেনি। তবে সংকটের এ সময়ে দেশের ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ এলপিজি আমদানী করেছে দেশের জ্বালানি খাতকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক না হয় তবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ জীবন যাপন ব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কয়েক দিন পরে নতুন সংসদে প্রথম বাজেট পেশ হবে। এরই মধ্যে আসন্ন বাজেট নিয়ে আলোচনাপর্যালোচনা শুরু হয়েছে। সরকারকে এই বাজেট পরিকল্পনা এমন এক সময়ে নিতে হচ্ছে, যখন দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক সংকট ও প্রবল রূপ নিয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অদূরদর্শিতার কারণে প্রায় বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চাপ, অন্যদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রইরানের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়। এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে বাজেট পরিকল্পনায় বেশি সতর্ক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়লের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এক মাসের অধিক সময় পেরিয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত এখন কেবল আঞ্চলিকসীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি বর্তমানে বড় ধরনের বৈশ্বিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে। যুদ্ধের প্রভাব ইরানের বাইরেও সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, আজারবাইজান, পশ্চিম তীর, সাইপ্রাস সিরিয়া, কাতার ও লেবাননে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

নৌপথ অবরুদ্ধ হওয়ায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্য এখন আকাশচুম্বী। এতে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো পড়েছে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ জ্বালানির জন্য এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। তাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। বিশ্বনেতাদের উচিত ব্যক্তিগত অহংকার ও স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে আলোচনার টেবিলে বসা।

পৃথিবীর ইতিহাসে ওয়েস্টফিলিয়ার শান্তি চুক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। যুদ্ধ থেকে শান্তিতে উত্তরণের জন্য একমাত্র উপায় যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্রমাগত এবং নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ। ওয়েস্টফিলিয়ার শান্তিচুক্তির গুরুত্ব আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নিহিত রয়েছে।

ওয়েস্টফিলিয়ার শান্তিচুক্তি ইউরোপকে তার সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে। বিশ্বব্যবস্থায় এ চুক্তি আজও জাতি রাষ্ট্রকাঠামোর এক উপযোগী গঠনমূলক ধারণা হিসেবে প্রথিত হয়ে আছে। এ চুক্তির উল্লেখযোগ্য ফল ছিল পাঁচটি। প্রথমতঃ এ চুক্তি সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আধুনিক আন্তর্জাতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। দ্বিতীয়তঃ এ চুক্তি ধর্মীয় স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত উপাসনার অধিকারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয়তঃ এ চুক্তি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সমর্থন করে। এ কারণে সুইজারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের স্বাধীনতা প্রাতিষ্ঠানিক ভৌগোলিক রূপ পায়। চতুর্থতঃ এ চুক্তির পর রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা লোপ পায় এবং ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রথা চালু হয়। পঞ্চমতঃ এ চুক্তি ইউরোপে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রণয়ন করে। ফলে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব লক্ষ্যণীয়ভাবে হ্রাস পায়।

ওয়েষ্টফিলিয়ার চুক্তিটি আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে শান্তি প্রচেষ্টায় কূটনীতির এক সর্বোচ্চ মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে্‌েছ।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের চিত্রটি ভিন্ন। এ যুদ্ধে একপক্ষে রয়েছে ইরান এবং অন্যদিকে রয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পক্ষ হয়ে আরব রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা একেবারেই অনুপস্থিত। সৌদি আরব এবং যুক্ত আরব আমিরাত সব সময় পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের পক্ষ হয়েই কাজ করেছে। অথচ ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধের সূচনার কোনো কারণ নেই। নেতানিয়াহুর যে বৃহত্তর ইসরায়েলের মানচিত্রের পরিকল্পনা রয়েছে তাতে প্যালেস্টাইন, লেবানন, সিরিয়া, মিসর, জর্ডান, ইরাক এমনকি সৌদি আরবের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলের আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনায় কোথায়ও ইরানের অন্তর্ভুক্তির স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনার উল্লেখ শোনা যায়নি।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র একত্রে বিনা কারণে ইরানের ওপর বিমান আক্রমণ করে বসে। অথচ ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ইরানের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে আলাপ আলোচনার সূচনা হয়। আরও দুঃখজনক হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে বিমান আক্রমণে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে।

যে সরকার পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের ওপর আক্রমণ শুরু করেছিল, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়েছে। এ ক্ষতি সারা পৃথিবীর আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলাপআলোচনার আরম্ভ হওয়ায় কিঞ্চিৎ হলেও আশার আলো দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সবচেয়ে বড় জিনিস হলো, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে হলে কেবলমাত্র এ দুটি দেশের প্রতিনিধি দ্বারা সম্ভব নয়। ইরান এবং ইসরায়েলকে জড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক জটিলতা তাৎক্ষণিক ব্যাপার নয়। এ জটিলতা আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা একমাত্র বৃহৎ শক্তিগুলোর সম্মিলিত কূটনৈতিক বিচক্ষণতা এবং নিরপেক্ষতার মধ্যদিয়ে সম্ভব। প্রশ্ন হলো, বর্তমান পৃথিবীতে ওয়েস্টফিলিয়ার শান্তিচুক্তিতে অংশগ্রহণকারী কূটনীতিবিদদের মতো প্রজ্ঞাবান এবং দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি যে কত প্রয়োজন তা আজ শান্তিকামী মানুষ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক এক মুসলিম নেতার আহ্বান প্রণিধানযোগ্য। মুসলিম বিশ্বকে তিনি যে বিষয়গুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তা আমি এখানে তুলে ধরছি।

এখন মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ হচ্ছে, বাহ্যত এই যুদ্ধ আমেরিকার ইরানের ওপর হামলা করার মাধ্যমে শুরু করেছে; কিন্তু ইরান আগেই স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, আমাদের ওপর যদি হামলা হয়, তবে আরব দেশগুলোতে বিদ্যমান আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিতে আমরা হামলা করব যা তারা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে স্থাপন করেছে আর এখন সেই উদ্দেশ্য তারা চরিতার্থও করছে। ইরান পুনঃপুন এটি স্পষ্ট করেছে।”

আরব ও ইসলামী দেশগুলো একথা বোঝে নাবলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি এবং দাজ্জালী কৌশলে আমাদের এমন এক জালে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে যেখানে আমাদের একটি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে লড়ানো হচ্ছে। এখন রাশিয়া ও চীনও জোট গঠন করছে। আর এটি তো স্পষ্ট, যে সব জোট তৈরি হচ্ছে, ভবিষ্যতে এগুলো আরও বিস্তৃত হবে এবং এর অশুভ লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকবে এগুলো আরো দৃঢ়তা লাভ করবে। ইসলামী বিশ্ব এখন যুদ্ধক্ষেত্র, কারণ তাদের কাছে এমন সম্পদ রয়েছে যা এসব পরাশক্তি দখল করতে চায়। হায়! মুসলমানরা যদি এই বিষয়টি বুঝত এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিত!”

অতএব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা আসলে নিজেদেরই ক্ষতি করার নামান্তর। আল্লাহ্‌ তা’লা মুসলিম বিশ্বকে এক্ষেত্রেও বিবেক খাটানোর তৌফিক দিন। এখনও সময় আছেতাদের বিষয়টি বুঝতে হবে। শুধু আকীদাগত মতভেদের কারণে ইরানের বিরোধিতা করা উচিত নয়। তওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্যই ইসলাম (পৃথিবীতে) এসেছে তাই তওহীদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা উচিত। পরাশক্তিগুলোকে নিজেদের খোদা জ্ঞান করবেন না, কারণ চিরস্থায়ী ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্‌ তা’লারই।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকাযী আমিনুল ইসলাম হাশেমী (রহ.) : ইলম, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার আলোকস্তম্ভ
পরবর্তী নিবন্ধমনের রঙ আর পোশাকের রঙ মিলে একাকার হওয়ার দিন