অভ্যন্তরীণ রুটে পণ্য পরিবহনে ডিজি শিপিংয়ের সার্কুলার বেআইনি

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের সিরিয়াল প্রথা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট রিট

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ১৭ আগস্ট, ২০২২ at ৫:১৮ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম থেকে দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন রুটে চলাচলকারী লাইটারেজ জাহাজগুলোকে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) ছাড়পত্র নেয়ার বাধ্যবাধকতাকে অবৈধ এবং বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি শিপিং) জারি করা উক্ত সার্কুলারকে উচ্চ আদালত থেকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দর এবং বহির্নোঙর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটারেজ জাহাজগুলোকে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ছাড়পত্র নেয়ার কোন বাধ্যবাধকতা থাকলো না। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মাঝে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। অবশ্য উচ্চ আদালতের রায়ের ব্যাপারে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের পক্ষ থেকে আপীলসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত কোটি কোটি টন পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানকারী মাদার ভ্যাসেল থেকে খালাস করে দেশের পঞ্চাশটির মতো গন্তব্যে প্রেরণ করা হয়। বহির্নোঙরের পাশাপাশি বন্দরের ওভারসাইড, বিভিন্ন ঘাট এবং কাফকো ও সিইউএফএলসহ বিভিন্ন জেটি থেকেও দেশের নানা অঞ্চলে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য পরিবহন করা হয়। বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসষ্য ছাড়াও সিমেন্ট ক্লিংকার, জিপসাম পাথর ও অন্যান্য খোলা পণ্য অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন রুটে পরিবহন করা হয়। চট্টগ্রাম থেকে দেড় হাজারের মতো লাইটারেজ জাহাজ এসব পণ্য পরিবহন করে। জাহাজ মালিকদের সংগঠন ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) তাদের সিরিয়ালে চলা জাহাজগুলোতে আমদানিকারক বা কারখানা মালিকদের চাহিদার ভিত্তিতে বরাদ্দ দিয়ে থাকে।
আমদানিকারকদের পক্ষে ডব্লিউটিসির তালিকাভুক্ত পণ্যের এজন্ট এই চাহিদা প্রদান করলে লাইটারেজ বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু অতীতে বিভিন্ন সময় লাইটারেজ জাহাজ সেক্টরকে নানাভাবে জিম্মি করার রেকর্ড রয়েছে। রয়েছে আমদানিকারক এবং কারখানা মালিকদের নানাভাবে হয়রানির অভিযোগও। নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং পণ্য পরিবহনের খরচ কমানোর জন্য বড় বড় কারখানার মালিক এবং ভোগ্য পণ্য আমদানিকারকেরা নিজেরাই লাইটারেজ জাহাজ কিনে নেন। এসব জাহাজ নিজেদের মতো করে নিজেদের পণ্য পরিবহন করে থাকে। এর বাইরেও কারখানা মালিক কিংবা আমদানিকারকদের লাইটারেজ জাহাজের প্রয়োজন হলে তা ডব্লিউটিসি থেকে বরাদ্দ নিয়ে থাকে। পণ্যের এজেন্টেরাও নিজেদের কিছু জাহাজ ডব্লিউটিসির সিরিয়ালভুক্ত না করে পরিচালনা করে। ডব্লিউটিসির সিরিয়ালের বাইরে গিয়ে জাহাজ পরিচালনা করায় সাধারণ জাহাজ মালিকেরা বেশ সংকটে পড়ে। এতে বহু জাহাজ পুরো মাসেও একটি ট্রিপ না পাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এই অবস্থায় লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের একটি সংগঠন বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স এসোসিয়েশন নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের শরণাপন্ন হয়। নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গতবছরের ২৩ আগস্ট স্মারক নম্বর-১৮.১৭.০০০০.৪০৯.০৯.০০৯.১৬/৪৬৬৮ মূলে জারিকৃত এক সার্কুলারে সমুদ্রপরিবহন অধিদপ্তরের নিবন্ধিত লাইটার জাহাজযোগে বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর সমূহে পণ্য পরিবহন সংক্রান্ত নীতিমালা’ ২০১৩ অনুসরণে ডব্লিউটিসির সিরিয়ালভুক্ত হয়ে পণ্য পরিবহন ও খালাস করার নির্দেশ প্রদান করে। এই আইন অমান্যকারী নৌযান মালিক, মাস্টার এবং নাবিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও উক্ত সার্কুলারে বলা হয়েছিল।
নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের উক্ত নির্দেশনার পর লাইটারেজ জাহাজসমূহ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের সিরিয়ালভুক্ত হয়ে কিছুদিন চলাচল করলেও পরবর্তীতে আবারো নিজেদের মতো করে পণ্য বোঝাই ও খালাস করতে থাকে। ইত্যবসরে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সার্কুলারটি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একের পর এক রিট হতে থাকে। বিভিন্ন আমদানিকারক এবং শিল্পগ্রুপের করা সাতটি রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান এবং বিচারপতি ফাতেমা নাজিবের দ্বৈত বেঞ্চ ডিজি শিপিং এর সার্কুলারকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়।
উচ্চ আদালতের সম্প্রতি দেয়া এই নির্দেশনার পর ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল থেকে সিরিয়াল নিয়ে লাইটারেজ জাহাজ পরিচালনার আর কোন বাধ্যবাধকতা থাকলো না বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট একজন আমদানিকারক বলেছেন, আমরা অতিষ্ঠ হয়ে কোর্টের শরণাপন্ন হয়েছি। কোট আমাদের বিষয়টি অনুধাবণ করে একটি জিম্মিদশা থেকে উদ্ধারের রায় দিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে একাধিক জাহাজ মালিক বিষয়টির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করা হবে বলে জানিয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধটেন্ডারে কোথাও সিআরবির কথাটি ছিল না
পরবর্তী নিবন্ধএকটু আমাদের ঘরে যাও, প্রতিবেশীকে এ কথা বলেই পালালেন মাঈনুদ্দীন