অপেক্ষা আর ফুরোয় না

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ২৩ জানুয়ারি, ২০২২ at ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ

 

 

দেশে গ্যাসের প্রি পেইড মিটারিং সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ নেয়া হলেও গত ৫ বছরে তা বড় কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। দেশের নগন্য সংখ্যক গ্রাহককে বহুল প্রত্যাশার প্রি পেইড মিটারিং সিস্টেমের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে অন্যদের অপেক্ষা আর ফুরোয় না।

দেশে গ্যাসের সরবরাহ এবং বিপননকারী সংস্থার সংখ্যা ছয়টি। এর মধ্যে রয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিও। জানা গেছে, পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন ছয়টি কোম্পানির সর্বমোট আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা ৪০ লাখ ৪৩ হাজার ৮০৯। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক রয়েছে ঢাকা এবং সন্নিহিত অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসের। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা ২৮ লাখ ৫৬ হাজার ২৪৭। চট্টগ্রাম এবং সন্নিহিত অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহকারী কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) আবাসিক গ্রাহক ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৫। কুমিল্লা চাঁদপুরসহ সন্নিহিত অঞ্চলের বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ২ লাখ ৩৮ হাজার ৫৯১, সিলেট অঞ্চলের জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডর (জেজিটিডিসিএল) গ্রাহক ২ লাখ ১৯ হাজার ৭৭০, পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) গ্রাহক ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৪৪ এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) আবাসিক খাতের গ্রাহক ২ হাজার ৩৭২। এই বিপুল সংখ্যক আবাসিক গ্রাহকের ব্যবহৃত চুলায় কোটি কোটি টাকার গ্যাস অহেতুক জ্বালিয়ে ফেলার একটি অভিযোগ ছিল বহুদিন থেকে। বিশ্বের গ্যাস খাতের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি প্রি পেইড মিটারিং সিস্টেম চালু করার মাঝে এই গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে শৃংখলা আনার পাশাপাশি গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য ২০১৬ সালে একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। গ্যাসের অপচয় রোধ করার জন্যই কার্যত প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৫ বছরেরও বেশি সময় গত হলেও প্রকল্পটিতে খুব বেশি সাফল্য আসেনি। মাত্র ৪ লাখের মতো গ্রাহককে প্রি পেইড সিস্টেমের আওতায় আনা গেলেও বিপুল সংখ্যক গ্রাহকই রয়ে গেছেন সিস্টেমের বাইরে। ৩৫ লাখেরও বেশি গ্রাহক গ্যাসের প্রি পেইড মিটারের জন্য অপেক্ষা করছেন কয়েক বছর ধরে।

সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে প্রায় ছয় লাখ আবাসিক গ্রাহকের মধ্যে মাত্র ৬০ হাজার গ্রাহককে প্রিপেইডের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৫ লাখ ৪০ হাজার গ্রাহককেই সরকারের নির্ধারিত বাড়তি গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। চট্টগ্রামে নতুন করে এক লাখ প্রি পেইড মিটার স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। ২৪১ কোটি ৬১ লাখ টাকার প্রকল্প কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু প্রকল্পটির কনসালটেন্ট নিয়োগই সম্পন্ন হয়নি। ইতোমধ্যে একবার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা ভেস্তে গেছে। নতুন করে কনসালটেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।

ঢাকা অঞ্চলে সাড়ে তিন লাখের মতো গ্রাহককে প্রি পেইড মিটারের আওতায় আনা হয়েছে। তিতাসে আরো বেশ কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করা হলে তার কোনটিই বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যান্য কোম্পানিগুলোর অবস্থাও একই। সিলেটের জালালাবাদ, কুমিল্লার বাখরাবাদ, পশ্চিমাঞ্চলসহ সবগুলো কোম্পানি প্রি পেইড মিটার স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করলেও কোনটিই পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

এতে করে চট্টগ্রামের প্রায় সাড়ে ৫ লাখসহ দেশের ৩৫ লাখেরও বেশি আবাসিক গ্রাহক প্রি পেইড মিটারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা সরকার নির্ধারিত বাড়তি দরে প্রতি ডাবল চুলা বাবদ ৯৭৫ টাকা এবং সিঙ্গেল চুলা বাবদ ৯২৫ টাকা করে বিল পরিশোধ করছেন।

অথচ ৫/৭ জনের একটি পরিবারে আবাসিক চুলায় পুরো মাসে কোনভাবেই ৬০০ টাকার বেশি গ্যাস ব্যবহৃত হয় না। প্রি পেইড মিটারের সুবিধা যারা পেয়েছেন তাদের কোনো কোনো পরিবার ৪শ’ টাকার গ্যাস দিয়ে পুরো মাসের রান্নাবান্না সারছেন। এক্ষেত্রে প্রতিটি চুলায় বাড়তি ব্যয় হয় গড়ে ৩শ’ টাকা। এ হিসাবে সারাদেশে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা বাড়তি বিল দিতে হয়। ছয়টি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিই এই বাড়তি টাকা আদায় করে আসছে।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রচলিত নিয়মে একটি চুলা থেকে যে পরিমাণ গ্যাস বের হয় তার পুরোটাই হিসেব করে মাসিক বিল নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি সিঙ্গেল চুলা দৈনিক ১০ ঘন্টা এবং ডাবল চুলা দৈনিক ৮ ঘন্টা জ্বলে এমন হিসেব করা হয়। গ্যাসের মূল্যের সাথে আনুষঙ্গিক খরচ, এমনকি ভ্যাট পর্যন্ত যুক্ত করে নির্ধারণ করা হয় মাসিক বিল। বর্তমানে আবাসিক খাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১২ টাকা ৬০ পয়সা। একজন ডাবল চুলার গ্রাহককে ৭৭ দশমিক ৩৮ ঘনমিটার গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু প্রি পেইড মিটারিং সিস্টেমে একজন গ্রাহক যা গ্যাস ব্যবহার করেন তার বিল দিতে হয়। এখন কোনো গ্রাহক যদি ৫০ ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে পুরো মাস চালাতে সক্ষম হন তাহলে তার কাছ থেকে বাড়তি বিল নেয়ার সুযোগ নেই।

অপরদিকে একজন প্রি পেইড গ্রাহক বিল সাশ্রয়ের জন্য যেভাবে চুলা ব্যবহার করেন প্রি পেইডের বাইরের গ্রাহক সেভাবে করেন না। এতে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান গ্যাস অহেতুক পুড়িয়ে ফেলা হয়। এমনকি কাপড় শুকানোর জন্যও গ্যাস পোড়ানো হয়। যা প্রি পেইড মিটারে করা হয় না। এতে করে প্রি পেইড মিটার শুধু গ্রাহকেরই লাভ নয়, জাতিরও লাভ রয়েছে।

এই ব্যাপারে পেট্রোবাংলার শীর্ষ একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রি পেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন ধরনের আনুষ্ঠানিকতায় কিছু কাজ ঝুলে আছে। তবে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের আবাসিক গ্রাহকদের একটি বড় অংশকে প্রি পেইড মিটারের আওতায় আনার কাজ চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, পেট্রোবাংলা চাইলেই প্রি পেইড মিটার স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে না। এরসাথে মন্ত্রণালয়সহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নানা বিষয় জড়িত। সবগুলো ধাপ পার হতে এক একটি প্রকল্পের কয়েক বছর পার হয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকোভিড জয়ের পথ দেখাবে কৃত্রিম মেধা!
পরবর্তী নিবন্ধউপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ গ্রেপ্তার ১০