অপসারণের পর কুলপাগলীর ছড়ায় আবারও বাঁধ

চুনতি অভয়ারণ্যে জিম্মি কৃষক, চলছে পানির ব্যবসা

মোহাম্মদ মারুফ, লোহাগাড়া | সোমবার , ২ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

লোহাগাড়ায় কুলপাগলীর ছড়ায় পুনরায় অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ছড়ার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শত শত কৃষক। পর্যাপ্ত পানির অভাবে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাবে। উপজেলার চুনতি ও আধুনগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সন্নিহিত গোলাইম্যা ঘোনা এলাকায় এই বাঁধ নির্মাণ করেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল।

জানা যায়, গত ১১ জানুয়ারি দৈনিক আজাদীতে ‘চুনতি অভয়ারণ্যে টিলা কেটে পাগলীর ছড়ায় বাঁধ/ ঝুঁকিতে বন, বন্যাপ্রাণী ও কৃষি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর গত ১৪ জানুয়ারি উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগ যৌথ অভিযান চালিয়ে ছড়ায় দেয়া বাঁধ অপসারণ করে। কিন্তু এর কিছুদিন পর আরেকটি প্রভাবশালী মহল একইস্থানে টিলা কেটে পুনরায় অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করে কৃষকদের জিম্মি করে পানি বিক্রি করে আসছে। এতে শুধু বন ও কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বন্যপ্রাণীর প্রজনন, খাদ্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

স্থানীয়রা জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গভীর বনাঞ্চল থেকেই পাগলী ছড়ার উৎপত্তি। সারা বছরই এই ছড়ায় কমবেশি পানি প্রবাহিত হয়। যা ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে শত শত কৃষক নির্বিঘ্নে চাষাবাদ করে আসছিলেন। কিন্তু চলতি বছর রাতের আঁধারে টিলা কেটে গোলাইম্যা ঘোনা এলাকায় ছড়ায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ফলে বাঁধের উজানে পানি জমে থাকলেও ভাটির দিকে ছড়াটি প্রায় শুকিয়ে গেছে। এতে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পানি না পেয়ে কৃষকরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন। বিশেষ করে ভাটির দিকে থাকা জমিগুলোতে উচ্চ ফলনশীল ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গতকাল রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, আগে টিলা কেটে যেই স্থানে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, অপসারণের কিছুদিন পর একই স্থানে আরেকটি মহল পুনরায় টিলা কেটে বাঁধ নির্মাণ করেছে। যার ফলে বাঁধের উজানে পানি জমে পাহাড়ে ধস দেখা দিচ্ছে। আর ভাটিতে ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ছড়ায় পানি প্রবাহে কোনো ধরনের বাঁধা সৃষ্টি করার নিয়ম না থাকলেও, একটি মহল ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রকাশ্যে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে একদিকে যেমন শত শত কৃষক পানির সংকটে পড়বেন, অন্যদিকে বন, ছড়া ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আশংকা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক জানান, ছড়ায় কৃত্রিমভাবে পানি আটকে রেখে একদিকে পানির বাণিজ্য করা হচ্ছে, অন্যদিকে শত শত কৃষকের ন্যায্য পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাঁধ দিয়ে উজানের প্রায় দেড় শতাধিক কৃষকদের জিম্মি করে প্রতি কানিতে দেড় হাজারের অধিক টাকায় পানি বিক্রি করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক ছড়ার পানি মূলত একটি প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় কৃষকরা।

বাঁধের ভাটির দিকে ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক কৃষক জানান, পাগলীর ছড়ায় উজানে কৃত্রিমভাবে পানি আটকে রাখায় ভাটির শত শত কৃষক তাদের ন্যায্য পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ছাড়ার পানি কখনোই কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না। অথচ একটি প্রভাবশালী মহল বন বিভাগকে ম্যানেজ করে বেআইনিভাবে এই বাঁধ নির্মাণ করেছে। যার ফলে তারা আগে সরব থাকলেও এখন নীরব ভূমিকা পালন করছে। দ্রুত বাঁধ অপসারণ করা না হলে চাষাবাদ বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না বলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিটের বিট কর্মকর্তা চঞ্চল কুমার তরফদার জানান, বনের সাথে লাগোয়া হলেও বাঁধ দেয়া ও টিলা কাটার স্থান খাস খতিয়ানভুক্ত। এ ব্যাপারে তাদের করার কিছুই নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাঁধের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম জানান, প্রাকৃতিক ছড়ায় বাঁধ দেয়ার কোনো নিয়ম নেই। বাঁধের ভাটির দিকে বহু কৃষক উচ্চ ফলনশীল ফসলের চাষ করেছেন। প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে পানির অভাবে এসব ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হবে।

লোহাগাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন জানান, কুলপাগলীর ছড়ায় অবৈধভাবে নির্মিত বাঁধ অপসারণের পর পুনরায় বাঁধ দেয়ার ব্যাপারে তাকে কেউ অবগত করেনি। পুনরায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে দেয়া বাঁধ অপসারণ করা হবে বলে জানান তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধকক্সবাজারে পাম্প বিস্ফোরণে দগ্ধ একজনের মৃত্যু