অপরাধীরা শাস্তি না পেলে অন্যরাও তা অনুসরণ করে ধ্বংসের পথে যাবে

রিফাত হত্যা মামলা

| শনিবার , ৩ অক্টোবর, ২০২০ at ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয় আসামির ফাঁসির রায় এসেছে। বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামান গত বুধবার দুপুরে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ছয় আসামির সবাইকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত বছর ২৬ জুন বরগুনা জেলা শহরের কলেজ রোডে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাতকে। ওই ঘটনার একটি রোমহর্ষক ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা। ওই ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে মামলায় ১ নম্বর সাক্ষী করা হয়। এর মধ্যেই ২ জুলাই মামলার প্রধান সন্দেহভাজন সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এদিকে মিন্নির শ্বশুরই পরে হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তুললে আলোচনা নতুন মোড় নেয়।

রায়ে আদালত বলেছেন, মিন্নিও যে তার স্বামীকে হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন, প্রসিকিউশন তা প্রমাণ করতে পেরেছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘রিফাত হত্যা মামলার আসামিদের নির্মম বর্বরতা ও নির্মমতা মধ্যযুগীয় কায়দাকেও হার মানিয়েছে। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে তাদের অনুসরণ করে অন্য যুবকরাও ধ্বংসের পথে যাবে। এসব আসামি সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।’

চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির মৃত্যুদণ্ড হলেও শুরুতে তিনি ছিলেন ওই মামলার এক নম্বর সাক্ষী। কিন্তু পুলিশের তদন্তের পর মামলার চার্জশিটে মিন্নির নাম যুক্ত করা হয় অভিযুক্তের তালিকায়। তদন্তের এক পর্যায়ে গত বছরের ১৭ই জুলাই আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি প্রায় দেড় মাস জেলে ছিলেন। পরে তিনি হাইকোর্টের আদেশে শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্ত ছিলেন। বুধবার সকালেই মিন্নি বরগুনা জেলা দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়েছিলেন তার বাবার সাথে, মোটরসাইকেলে করে। তবে মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ার পর তাকে আদালত থেকে কড়া পুলিশী পাহারায় কারাগারে নেয়া হয়। রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবা যে মামলা করেছিলেন, সেখানে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি ছিলেন এক নম্বর সাক্ষী। তবে পুলিশের তদন্তের পর, স্বামীর হত্যা মামলার সাক্ষী থেকে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে চার্জশিটে ৭ নম্বর অভিযুক্ত করা হয়। এখন তার মৃত্যুদণ্ড হলো। বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

মামলার বাদী রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, মিন্নিসহ ছয় আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে। আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ভূবন চন্দ্র হাওলাদার বলেন, সাক্ষ্য প্রমাণে আমরা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি বলেই আদালত ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন।

অন্যদিকে দণ্ডিত মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাতের বাবা দেলোয়ার হোসেন দাবি করেন, তার ছেলে জটলার মধ্যে ঘটনা দেখতে গিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডে ‘ছিল না’। তিনি এই রায়ে বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবেন।

রিফাত হত্যা মামলায় আদালত মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় নানা প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই রায়ে খুশি অনেকে। একজন লিখেছেন, ‘জাতি ন্যায় বিচার পেয়েছে’। আরেকজন লিখেছেন, ‘মানুষ কিভাবে এমন চিন্তা করে যে, কেউ দিনেদুপুরে হাজারো মানুষের সামনে কুপিয়ে একজনকে মেরে ফেলবে আর তাদের কিছুই হবে না।’ অন্য একজন মনে করেন, ‘একটা মেয়েকে ঘিরে প্রায় ২৫ জনেরও বেশি মানুষ ও তাদের পরিবার আজ ধ্বংস হয়ে গেল, এর থেকে মানুষের শিক্ষা নেয়া উচিত।’ তবে এই রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তাঁরা এই রায় সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল এক নাম্বার আসামি থেকে শুরু করে সবাই কিন্তু উচ্চ আদালতে জামিন নিয়ে একেবারে খালাস হয়ে বের হয়ে এসেছিল। এখন রিফাত হত্যা মামলার রায়টা কি কার্যকর হবে? নাকি উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তরা জামিন পেয়ে যাবে?

মামলার রায়কে আমরা স্বাগত ও অভিনন্দন জানাতে চাই। কেননা, অনেকের মতো আমরাও মনে করি, এতে জাতি ন্যায় বিচার পেয়েছে, এই রায় যেন উচ্চ আদালতে বহাল রাখা হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকর্ণফুলীতে অলিম্পিক ফুটবল টুর্নামেন্ট সম্পন্ন
পরবর্তী নিবন্ধজার্মান ঐক্য দিবস ও বিশ্বপ্রাণী দিবস