চট্টগ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য টয়লেটসহ ওয়াশ ব্লক নির্মাণে ১৩২ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম এবং অনেক স্থানে কাজ শেষ না করে বিলের বেশির ভাগ অংশ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। ৭৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতি এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারেরও অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশের বিরুদ্ধে। নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরেই ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঠিকাদার সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করেছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশ বলেন, প্রায় সাড়ে সাতশ সাইটে কাজ চলছে। সবগুলো দেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। কাজ না করে বিল দেয়ার কথা নয়। তবুও ব্যাপারটি খতিয়ে দেখব। তিনি বলেন, এতগুলো কাজ, দুয়েকটিতে ভুলভ্রান্তি হতে পারে।
এ বিষয়ে তদন্তের জন্য একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা বলছেন, ওয়াশ ব্লক নির্মাণে অনিয়মের কারণে শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বেড়েছে। বিশেষ করে কন্যা শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেশি। তাদেরকে আশেপাশের মানুষের বাসাবাড়িতে যেতে হচ্ছে।
সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাবেক পিইডিপি–৩–প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানির উৎস স্থাপন ও অত্যাধুনিক ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত ওয়াশ ব্লক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাইজিন প্রসার ও সুস্বাস্থ্য রক্ষায় একটি পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ ও পরিবেশ দূষণের মাত্রা হ্রাস করার লক্ষ্যে বর্তমানে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি ৪) প্রকল্পে এলজিইডি কর্তৃক নির্মিতব্য অথবা পূর্বে নির্মিত বিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত ওয়াশ ব্লক স্থাপন করা হচ্ছে।
বর্তমান প্রকল্পের আওতায় ছাত্র ও পুরুষ শিক্ষকদের জন্য এবং ছাত্রী ও মহিলা শিক্ষিকাদের জন্য পৃথক ওয়াশ ব্লকের ব্যবস্থা রয়েছে। একটি ওয়াশ ব্লকে তিনটি টয়লেট থাকার কথা। এর একটি প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট। পুরুষদের ওয়াশ ব্লকে ৩টি টয়লেট ছাড়াও ২টি ইউরিনালের ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিটি ওয়াশ ব্লকে একটি করে হ্যান্ডওয়াশ ও ফুটওয়াশ বেসিন স্থাপনের কথা রয়েছে। ওয়াশ ব্লকগুলোতে পাইপবাহিত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্লকে স্থাপিত পানির উৎসের মধ্যে রয়েছে অগভীর নলকূপ, গভীর নলকূপ, তারা নলকূপ (ডেভহেডসহ), ইলেকট্রিক পাম্প (সেন্ট্রিফিউগাল, সাবমারসিবল), রিংওয়েল, এআইআরপি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রভৃতি ব্যবস্থা থাকার কথা।
এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার ৭৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কাজ চলছে। এতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩২ কোটি টাকা। দোতলা ওয়াশ ব্লকের সব ফিটিংস প্রকল্প ব্যয় থেকে মেটানোর কথা। কিন্তু চট্টগ্রামে এই ওয়াশ ব্লক নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাজ না করে বিল হাতিয়ে নেয়া, নির্বাহী প্রকৌশলীর পছন্দের ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে কাজ দেয়া, কোনো কোনো স্থানে মাত্র কয়েক শতাংশ কাজ করে বেশির ভাগ বিল তুলে নেয়া, মাসের পর মাস সময়ক্ষেপণসহ নানা ধরনের অভিযোগ আছে। সীতাকুণ্ড, মীরসরাই, হাটহাজারী ও বাঁশখালীসহ প্রায় প্রতিটি উপজেলার চিত্র একইরকম।
সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে ১৩২ কোটি টাকার প্রকল্পটির ভয়াল চিত্র পাওয়া গেছে। কোথাও ছয়টি পিলার তুলে বিলের আশি শতাংশের বেশি তুলে নেয়া হয়েছে। কোথাও শুধুমাত্র আরসিসি পিলার এবং ছাদের দোতলা একটি অবকাঠামো দাঁড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু বিল তুলে নেয়া হয়েছে ৯০ শতাংশ। কোথাও দেয়ালে প্লাস্টার নেই। বেসিন ও কমোড স্থাপিত হয়নি। তালিকা ধরে সীতাকুণ্ড এবং মীরসরাইতে অন্তত বিশটি স্কুল পরিদর্শন করে প্রকল্পটির এ চিত্র দেখা গেছে।
প্রতিটি স্কুলে শিক্ষক–শিক্ষিকা এবং শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগের কথা বলেছেন। স্কুলে টয়লেট না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনে নিজের বাড়িতে দৌঁড়াতে হয়। কেউ কেউ আশেপাশের বাড়িতে যায়। এক শিক্ষিকা বলেন, বিষয়টি বলা যায় না। খুবই অসুবিধা হয়। আমাদের মেয়েদেরকে পাশের বাড়িতে পাঠাতে হয়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাঠামো অনুযায়ী, প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরে হয়। মাঠ পর্যায়ের রিপোর্ট দেখে চেকে স্বাক্ষর করে বিল পরিশোধ করার কথা। কিন্তু এই প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ থেকে বিল পরিশোধ পর্যন্ত সর্বত্র অনিয়ম ও দুর্নীতি। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেয়া এবং কাজ না করিয়ে বিল পরিশোধ করার অভিযোগ করা হয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশের বিরুদ্ধে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে চাকরি করার সুবাদে একটি ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কাজে দীর্ঘসূত্রতা এবং কাজ না করিয়ে বিল পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, বিষয়টি দুঃখজনক। কীভাবে কী হচ্ছে আমরা বুঝতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে যোগাযোগ এবং অনুরোধ করেও কাজে গতি ফেরানো যায়নি বলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
সীতাকুণ্ড ও মীরসরাইয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রধান শিক্ষক বলেন, আমরা দফায় দফায় চিঠি দিয়ে আমাদের কষ্টের কথা জানিয়েছি, কিন্তু কারো সাড়া পাইনি। ঠিকাদার কিছু কাজ করে চলে গেছেন। কবে আসবেন কিংবা আসবেন কিনা জানি না।
অনিয়ম এবং পছন্দের ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে কাজ দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাশ আজাদীকে বলেন, আগামী জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। এর মধ্যে সবগুলো কাজ শেষ হবে। আগামী মাসের মধ্যে কয়েকটি ওয়াশ ব্লকের কাজ শেষ হবে। কাজ না করে বিল নেয়ার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বলতে পারবেন জানিয়ে তিনি বলেন, একইসাথে প্রায় সাড়ে সাতশ সাইটে কাজ হচ্ছে। সবগুলো ঠিকভাবে দেখা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তবুও পুরো ব্যাপারটি দেখব।












