ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা খাতে আবারও আংশিক অনলাইন ক্লাস চালুর চিন্তা করছে সরকার। একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয়ে একগুচ্ছ কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনাও এগোচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনলাইনে ক্লাস চালুর উদ্যোগ নিয়ে সে কারণে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। শহরের স্কুল–কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতবিনিময় সভায় সপ্তাহে তিন দিন অনলাইনে ও তিন দিন সশরীর ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে বা মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে মহানগর এলাকায়।
বিশ্ববিদ্যালয় বাদে বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটা চালু করতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে করোনা মহামারিকালের তিক্ত অভিজ্ঞতায় অভিভাবকদের মধ্যে অনলাইন ক্লাস চালুর উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। করোনা মহামারির সময় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। অনলাইন ও টেলিভিশনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হলেও সেটা ফলপ্রসূ হয়নি; কেননা অনেক অভিভাবকেরই সন্তানদের জন্য স্মার্টফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ কিনে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। ইন্টারনেটও বাংলাদেশে ব্যয়বহুল।
একটা প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ওপর করোনার সময় স্কুল বন্ধের অভিঘাত পড়েছে মারাত্মক। শিক্ষার্থীদের–বিশেষ করে গ্রাম, মফস্সল ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ব্যাপক শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে। সব মিলিয়ে মহামারি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার শিশুরা হলেও আমাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে কখনোই হেলদোল দেখা যায় না। বরং যেকোনো দুর্যোগ–দুর্বিপাকে স্কুল–কলেজ বন্ধ করে দেওয়াটাই একটা সহজ সমাধান হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।
সন্তানদের শ্রেণিকক্ষে ও বইয়ের পাতায় ফেরাতে মা–বাবার দীর্ঘ প্রচেষ্টার কথা শোনা যাচ্ছিল। নতুন করে অনলাইনে ক্লাস চালু হলে আবারও সন্তানদের মধ্যে মুঠোফোনের প্রতি আসক্তি জন্ম নেবে বলে তাঁদের উদ্বেগ। তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালু করলে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও কত লিটার জ্বালানি বাঁচবে? যে সময় অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হবে, সে সময় বিদ্যুৎ থাকবে–সেই নিশ্চয়তা কি পাওয়া যাবে? গ্রীষ্ম মৌসুমে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা এমনিতেই চার–পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বেড়ে যায়। এর সবচেয়ে বড় কারণ অফিস, বাসাবাড়ি ও মার্কেটে এসির যথেচ্ছ ব্যবহার। গত কয়েক দশকে গণপরিবহনের বদলে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। মোটরসাইকেলের মতো যান এখন গণপরিবহনে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন বৈশ্বিক ও স্থানীয় সমীক্ষা অনুযায়ী, মহামারির আগে শিশুদের মধ্যে সমস্যাজনক স্মার্টফোন ব্যবহারের হার ছিল প্রায় ১০% থেকে ৩০%। ২০২১ ও ২০২২ সালের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৬৭% থেকে ৮০% শিক্ষার্থী মোবাইল বা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গ্যাজেটে আসক্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৭৮.৮% পর্যন্ত পৌঁছেছিল। করোনাকালে প্রায় ২৮ শতাংশ তরুণ–তরুণী দিনে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করেছে। এই আসক্তির ফলে ৮৫ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যায় এবং অনেকে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, মাথাব্যথা ও অনিদ্রার মতো শারীরিক জটিলতায় ভুগছে।
অতি সাম্প্রতিক (২০২৪–২৫) তথ্য অনুযায়ী, এমনকি স্কুলে যাওয়ার আগেই দেশের প্রায় ৮৬% শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যার মধ্যে ২৯% শিশুর আসক্তি অত্যন্ত গুরুতর। শিক্ষার্থীরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কিশোর–কিশোরীদের অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহার মারাত্মক আসক্তি তৈরি করতে পারে। করোনার পর থেকে হওয়া এই আসক্তিতে নতুন প্রজন্ম হুমকির মুখে। আমাদের অবাধ অনলাইন সেবায় প্রযুক্তির খারাপ দিকগুলো গ্রহণ করার এবং তরুণদের নষ্ট হওয়ার সব উপকরণ ও সুযোগ বিদ্যমান। পরিবারের পক্ষ থেকেও তাদের আর বাধা দেওয়া সম্ভব হবে না। অনলাইন ক্লাসের অজুহাত দেখিয়ে তারা নিজেদের ক্ষতিকর অনলাইন সাইটে সংযুক্ত করবে, যা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। পারস্পরিক যোগাযোগ, আলাপ–আলোচনা ও মিথস্ক্রিয়ার ওপরও প্রভাব ফেলবে দীর্ঘমেয়াদে। শিক্ষার্থীরা ঘরে থেকেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বা কথা বলার সুযোগ হারাবে।
জ্বালানি বাঁচানোর বিকল্প হিসেবে সরকার কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকারি আমলাসহ যাদের একাধিক গাড়ি আছে, এগুলোর ব্যবহার কমাতে হবে; ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহনে চলাচলের জন্য উৎসাহিত করতে হবে। কর্মসংস্থান না থাকায় রাজধানী শহর থেকে শুরু করে গ্রামে–সবখানেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সুনামির মতো বেড়েছে। ফলে সমস্যার গোড়ায় হাত না দিয়ে স্কুল–কলেজে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নগদ লাভ হিসেবে জ্বালানি কিছুটা সাশ্রয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে আমাদের শিশুরা।
লেখক : শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক














