অনলাইন ব্যবসায় আস্থার সংকট

প্রতারক চক্র সক্রিয়, নানা কৌশল হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা । নীতিমালা কার্যকরে নজরদারিতে জোর ব্যবসায়ীদের

হাসান আকবর | মঙ্গলবার , ৩১ মার্চ, ২০২৬ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ

করোনাকালে জনপ্রিয় এবং মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে ওঠা অনলাইন ব্যবসা নিয়ে প্রতারণা চলছে। প্রতারক চক্র নিত্য নতুন কৌশলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নানাভাবে প্রতারিত মানুষের কাছে অনলাইন ব্যবসা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অনলাইন ব্যবসা খাতকে যথাযথভাবে নজরদারির আওতায় আনা গেলে স্বল্প পুঁজিতে অনেক উদ্যোক্তা সৃষ্টি হতো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে দেশে অনলাইন ব্যবসা শুরু হয়। বেশ কয়েক বছর আগে থেকে অনলাইন ব্যবসার কার্যক্রম চলছে। তবে করোনাকালে দেশব্যাপী লকডাউনের সময় বিভিন্ন ইকমার্স ও ফেসবুকভিত্তিক এফকমার্স সাইটগুলো অনেক মানুষের কেনাকাটার অবলম্বন হয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষ চালডাল থেকে শুরু করে গাড়ি পর্যন্ত কিনে অনলাইনে। কোরবানির গরুর পাশাপাশি মাছমাংসও কেনা হয়েছে অনলাইনে। মহিলাদের শাড়িগয়না থেকে শুরু করে ব্যবহার্য বিভিন্ন পণ্য অনলাইন শপিং থেকে কেনাকাটা করেন।

করোনাকালে শপিং মল বন্ধ থাকা, দোকানপাট লকডাউনের আওতায় থাকা, যান চলাচল বন্ধ থাকাসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় মানুষের অবলম্বন হয়ে উঠে হোম ডেলিভারির অনলাইনে কেনাকাটা। করোনাকালে অনলাইন কেনাকাটার বিশাল বাজার গড়ে ওঠে। শত শত কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা হয় অনলাইনে।

একটি সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশে আনুমানিক ২ হাজার ৫শ ইকমার্স সাইট রয়েছে। ফেসবুকভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ রয়েছে দেড় লাখের বেশি। এসব প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন লক্ষাধিক পণ্যের অর্ডার ও ডেলিভারি হচ্ছে। বর্তমানে ইকমার্সের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭৫ শতাংশ। করোনার পর বিভিন্নমুখী সুবিধার কারণে অনলাইন ব্যবসা খাতটি টিকে রয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিও অনলাইনে কেনাবেচা এবং হোম ডেলিভারি চালু করে। সাধারণ ক্রেতারাও যাতায়াতের ভোগান্তি এবং খরচ সাশ্রয়সহ নানামুখী সুবিধার কথা বিবেচনা করে অনলাইনে কেনাকাটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। এতে করে ইতোমধ্যে দেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছে। মাত্র দুয়েক বছরের মধ্যে এই বাজার ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়।

দিনে দিনে বিস্তৃতি লাভ করা অনলাইন বাণিজ্যের সুযোগে সংঘবদ্ধ একটি প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। নানা কৌশলে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। বিভিন্ন ধরনের পণ্যের লোভনীয় অফার দিয়ে ডেলিভারি চার্জের নামে টাকা অগ্রিম নেওয়া, পণ্যের মূল্য বাবদ অগ্রিম টাকা নেওয়া, এক ধরনের পণ্যের ছবি দেখিয়ে নিম্নমানের পণ্য দেওয়াসহ নানাভাবে প্রতারণা করা হচ্ছে। প্রতারকদের লাগামহীন তৎপরতায় সম্ভাবনাময় অনলাইন ব্যবসা হুমকিতে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।

গতকাল পদ্মা অয়েল কোম্পানির সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা সিএস মাহমুদ নিজের ফেসবুক পেজে প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ফেসবুকে চাঁদপুরের ইলিশ মাছের একটি অনলাইন বিজ্ঞাপন দেখে গত ১৮ মার্চ সকাল ১০টা নাগাদ তিনি চাঁদপুরস্থ ভাই ভাই ফিশ হাউসের (মোবাইল নং ০১৭৯৫৮২০১৪২) সাথে যোগাযোগ করেন। তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে ৪টি ইলিশ মাছ (ওজন ৬ কেজি) ৪ হাজার টাকায় কিনেন। দোকানির কথামতো তিনি অগ্রিম বাবদ ৫৫০ টাকা বাসার নিকটস্থ একটি দোকান থেকে বিকাশে প্রেরণ করেন। পরদিন ১৯ মার্চ বেলা ১১টার মধ্যে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বি ব্লকের সিএস মাহমুদের বাসায় ইলিশ মাছ পৌঁছে দেওয়ার কথা। মাছ বুঝে নেওয়ার পর বাকি সাড়ে ৩ হাজার টাকা পরিশোধ করার কথা।

কিন্তু পরদিন সকাল ১০টার দিকে উক্ত নম্বর থেকে সিএস মাহমুদকে ফোন করে জানানো হয়, তাদের নিযুক্ত পরিবহন ঠিকাদার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে মাছ সরবরাহ করবে। সেইসাথে তাকে অবিলম্বে অবশিষ্ট সাড়ে ৩ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে বলা হয়। এই সময় তাকে বোঝানো হয়, তাদের অফিসের কম্পিউটার থেকে কোড মুক্ত করে অর্ডার নম্বর প্রদান করার জন্য টাকাগুলো এখনই প্রেরণ করতে হবে। তিনি টাকা পাঠাতে দেরি করলে অর্ডার নম্বর দেওয়া যাবে না। তাদের কথায় বিশ্বাস করে সিএস মাহমুদ বাকি সাড়ে তিন হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন।

পরবর্তীতে তারা আবার ফোন করে জানায়, ডেলিভারি চার্জ বাবদ ৭০ টাকা প্রদান না করায় লেনদেন সম্পূর্ণ হয়নি। তারা তাকে আবারো সাড়ে তিন হাজার টাকা এবং ডেলিভারি চার্জ ৭০ টাকা একসাথে পাঠাতে বলে। তাকে আশ্বস্ত করা হয়, মাছ ডেলিভারি দেওয়ার সময় তাকে নগদ সাড়ে তিন হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হবে।

তিনি টাকা পাঠানোর পর একটি অর্ডার নম্বর (সিরিয়াল ৩৬৯১৮২) প্রদান করে। ওই সময় ডেলিভারিম্যান পরিচয় দিয়ে একজন ০১৩০০৬১৯৭৪১ নম্বর থেকে যোগাযোগ করে জানায়, দুপুর ১২টার মধ্যে মাছ সরবরাহ করা হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা হয়নি। দুপুর ২টার দিকে জানানো হয়, গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে এবং মেরামতের পর পণ্য পৌঁছে দেওয়া হবে। এরপর তাদের সাথে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফোন নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান সিএস মাহমুদ।

সিএস মাহমুদ গতকাল আজাদীকে বলেন, চাঁদপুর থেকে অনলাইনে ইলিশ মাছ ক্রয়ের নামে অগ্রিম টাকা গ্রহণ করে প্রতারণা করা হচ্ছে। নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরিচিত উৎস থেকে অনলাইনে কোনো কিছু ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রিম টাকা প্রদান না করা, যাচাইবাছাই ছাড়া কোনো লেনদেন না করার অনুরোধ করেন তিনি।

শুধু সিএস মাহমুদ নন, নগরীর খুলশী এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী ঈদের সময় অনলাইনে পাঞ্জাবি কিনে প্রতারিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ফেসবুকে বিজ্ঞাপনে যে ছবি দেখিয়ে পাঞ্জাবি বিক্রি করা হয়েছিল পাঠানোর পর দেখা যায়, ওগুলোর মান নিম্ন।

মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম নামে অপর একজন ব্যবসায়ী বলেন, অনলাইনে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে একটি আংটি কিনেছিলেন স্ত্রীর জন্য। ডেলিভারি নেওয়ার একদিনের মধ্যে দেখা যায়, সেটির পাথর খুলে পড়ে গেছে। অনলাইন ব্যবসার নামে এভাবে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, আমরা অনলাইনে অর্ডার নিয়ে ঘরে সব ধরনের পণ্য পৌঁছে দিই। পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার পরই টাকা নেওয়া হয়। পুরো ব্যাপারটি বিশ্বাস এবং আস্থার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে চিড় ধরলে এ ব্যবসা টিকবে না।

জাকির হোসেন রোডের আজমীর মসলা হাউজের স্বত্বাধিকারী আরিফ জয় বলেন, অনলাইন অর্ডারের ভিত্তিতে আমরা পণ্য সরবরাহ দিই। অনলাইনে যেভাবে ঘোষণা দিই ঠিক সেই মানের পণ্যই ডেলিভারি দিই। অনেক প্রতারক চক্র গড়ে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই খাতটি অনেক বড় এবং সম্ভাবনাময়। এটিকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং একটি কার্যকর নীতিমালা ঘোষণার আহ্বান জানান তিনি।

অনলাইন ব্যবসার উন্নয়ন, আস্থা ধরে রাখাসহ ডিজিটাল ব্যবসা পরিচালনার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশ আগে একটি নীতিমালা ঘোষণা করে। তবে সঠিক নজরদারির অভাবে এই নীতিমালা কার্যকর হচ্ছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। কার্যকর নীতিমালা, সঠিক নজরদারি এবং সর্বোপরি ক্রেতারা সচেতন না হলে প্রতারকদের সামলানো কঠিন। ক্রেতাদের সচেতনতার উপর গুরুত্বারোপ করে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলেন, কী ধরনের পণ্যের অর্ডার করছেন, ব্যক্তিগতভাবে ওই ব্যবসায়ীকে চিনেন কিনা, ব্র্যান্ড ইমেজ সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। সঠিক নজরদারি এবং প্রতারকদের আইনের মুখোমুখি করা গেলে অনলাইন ব্যবসায় আস্থার সংকট কেটে যাবে। অনলাইন প্রতারণায় বিকাশ নম্বর ব্যবহৃত হয়। এতে করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সহজ। এদেরকে আইনের আওতায় আনার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলে সম্ভাবনাময় খাতটি রক্ষা পাবে বলে মনে করেন তারা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাথরুমে পড়ে পা ভাঙলেন এসপি
পরবর্তী নিবন্ধসাবেক সিএমপি কমিশনার জলিল মন্ডল গ্রেপ্তার