মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ–রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক কঠিন অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সংকটের বাইরে নয়। প্রবাসী আয় এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল হওয়ার কারণে আমাদের অর্থনীতি আজ এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। এই প্রতিকূল সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারকে অত্যন্ত দূরদর্শী, কৌশলী এবং বাস্তবমুখী বা ‘ট্যাক্টফুল’ ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে সংকট মোকাবিলায় সাশ্রয়ী হওয়ার নামে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনলাইন বা ব্লেন্ডেড ক্লাসের চিন্তা সামনে আসে, তখন তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থে আমাদের এখন স্পষ্ট বলা প্রয়োজন অনলাইন ক্লাস কোনো সমাধান নয়, যেকোনো মূল্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি সচল রাখাই হবে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত।
বিগত করোনা মহামারীর তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে, অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের বর্তমান আর্থ–সামাজিক প্রেক্ষাপটে কতটা বৈষম্যমূলক ও অকার্যকর। যদিও সে সময় পরিস্থিতির চাপে আমরা ডিজিটাল পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগতভাবে এখনো যথেষ্ট সুসজ্জিত বা ইকুইপড নয়। ঢাকা বা বড় শহরগুলোর হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে প্রান্তিক পর্যায়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর কাছে ল্যাপটপ, উচ্চগতির নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ আজও একটি বড় বিলাসিতা। এমন এক ভঙ্গুর ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে পুনরায় অনলাইন ক্লাসের কথা ভাবা মানে হলো একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। এই ডিজিটাল বিভাজন আমাদের সমাজকাঠামোতে যে সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করবে, তার ভার বইবার সক্ষমতা আমাদের নেই। তাই সাশ্রয়ের নামে অনলাইন ক্লাসের পথে হাঁটা হবে একটি পশ্চাৎপদ এবং অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা আজ অপরিহার্য। কিন্তু তার বলির পাঁঠা কেন শিক্ষা খাত হবে? রাষ্ট্র চাইলে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষুণ্ন না করেই বিকল্প অনেকগুলো পথে বড় অংকের সাশ্রয় নিশ্চিত করতে পারে। প্রথমত, ‘ডে লাইট সেভিং’ বা দিবালোক সাশ্রয় ব্যবস্থার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবা প্রয়োজন। অফিস–আদালত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি অনেকটা এগিয়ে এনে সূর্যের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে। এতে করে সন্ধ্যায় বিদ্যুতের জাতীয় চাহিদা অনেকখানি কমে আসবে। দ্বিতীয়ত, বিলাসিতা পরিহার করা এখন জাতীয় কর্তব্যে পরিণত হওয়া উচিত। সরকারি–বেসরকারি অফিস, শপিংমল এবং বাসাবাড়িতে এয়ার কন্ডিশন বা এসির ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। বিলাসবহুল জীবনযাপনের চেয়ে একটি জাতির জ্ঞানচর্চা সচল রাখা অনেক বেশি জরুরি। এছাড়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানগুলোর ক্ষেত্রে ‘সূর্যাস্ত আইন’ কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। সন্ধ্যা হওয়ার পরপরই যদি শপিংমলগুলো বন্ধ করে দেওয়া যায়। এর ফলে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনায়াসে চালানো সম্ভব। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা, জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান এবং মধ্যরাতের বিনোদন কেন্দ্রগুলোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ করলে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরবে। পাশাপাশি পর্যটন ও বিলাসিতা নিয়ন্ত্রণেও সরকারকে কঠোর হতে হবে। এই খাতগুলো যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গ্রাস করে, তা যদি আমরা উৎপাদনশীল খাত এবং শিক্ষায় ডাইভার্ট করতে পারি, তবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা অনেক সহজ হবে। পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করাও জ্বালানি সাশ্রয়ের একটি বড় উৎস হতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সচল রাখা কেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি একটি সামাজিক ও মানসিক স্থিতিশীলতার প্রতীক। শিক্ষার্থীরা যখন নিয়মিত ক্লাসে যায়, সমাজে এক ধরনের ইতিবাচক গতিশীলতা বজায় থাকে। করোনা পরবর্তী সময়ে শিখন ঘাটতি বা ‘লার্নিং লস’ আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। নতুন করে অনলাইন ক্লাসের পরীক্ষা–নিরীক্ষা সেই ঘাটতিকে আরও দীর্ঘতর করবে। একটি স্মার্ট সরকার তখনই সফল হয়, যখন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। বর্তমান সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে লক্ষ্য, তার প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত একটি প্রাণবন্ত ও সশরীরে উপস্থিত শিক্ষা ব্যবস্থা। শেষে বলা যায়, বৈশ্বিক এই সংকট আমাদের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। তবে এই পরীক্ষা জয়ের উপায় শিক্ষা খাতকে সংকুচিত করা নয়, বরং বিলাসিতা ও অপচয় রোধ করা। সরকারকে অত্যন্ত ট্যাক্টফুল হয়ে অগ্রাধিকারের তালিকা তৈরি করতে হবে। যেখানে বিলাসিতা হবে বর্জনীয় আর শিক্ষা হবে অগ্রাধিকারের শীর্ষে। যেকোনো মূল্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হবে সরকারের সক্ষমতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনন্য প্রমাণ। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই না যেখানে ডিজিটাল স্ক্রিনের আড়ালে ঝিমিয়ে পড়বে আগামীর প্রতিভা। বরং আমরা চাই এমন এক পরিবেশ, যেখানে বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা চললেও আমাদের পাঠশালাগুলো থাকবে আলোকিত ও মুখরিত। সরকারের স্মার্টনেস আজ ল্যাপটপের পর্দায় নয়, বরং প্রতিটি ক্লাসরুমে চকের গুঁড়ো আর শিক্ষার্থীদের পদচারণায় প্রমাণিত হোক।
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক













