অনন্য কাব্য ‘চলো স্বপ্ন বুনি’

হৃদয় হাসান বাবু | বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২৬ at ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ

কবি, আবৃত্তিশিল্পী প্রতিমা দাশের কাব্যগ্রন্থ ‘চলো স্বপ্ন বুনি’। এক অনন্য সৃষ্টি। ৪০ পৃষ্ঠার এ বইয়ে মোট ৩৪টি কবিতা স্থান পেয়েছে। বইয়ের পাতা উল্টোতে গিয়ে প্রথমেই আপনার চোখ যাবে উৎসর্গ পাতায়। প্রতিটি মানুষই তার মাবাবাকে ভালোবাসেন। কবি এখানে তার মাবাবাকে চমৎকার বিশেষণে আখ্যায়িত করে উৎসর্গের কথামালাকে সাজিয়েছেন। এখানেও একজন পাঠক কবির কাব্যিক মানসিকার সাথে পরিচিত হওয়ার প্রাথমিক ধারণা উৎসর্গ পাতা থেকেই পাবেন।

ব্যর্থ মরীচিকা’ শিরোনামের প্রথম কবিতায় কবি ভবিষ্যতকে কণ্টকাকীর্ণ করার প্রত্যাশায় পুরনো অতীতকে নির্বাসনে পাঠাতে চান। প্রকৃতির সংবিধানকে নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করে ছন্দহীনভাবে পথচলায় নিজেকে ভাসিয়ে নিতে ইচ্ছে প্রকাশ করছেন। কবির ভাষায়, ‘হয়তো, পরিযায়ী পাখির মতো ওম প্রত্যাশী হয়ে হারিয়ে যাবোকোনো অর্বাচিন এক ভোরে। যেখানে মৃত্তিকার গন্ধ নিয়ে আসে ব্যর্থ মরীচিকা।’ এভাবেই কবির মন তার সাবলিল লেখনির মাধ্যমে কথা বলে যায় হাজারো পাঠকের হয়ে।

কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতার শিরোনাম ‘বনসাই’। কবিতার শুরুতেই কবি লিখছেন, ‘পাঁজর ভাঙতে ভাঙতে তুমি কবে বিকলাঙ্গ হয়ে গিয়েছো/তা তুমি নিজেও জানো না! শিকড়ের পর শিকড় কাটতে কাটতে/কবে যে বনসাই হয়ে গিয়েছো/তা তুমি নিজেও জানো না। স্বপ্ন খেকো, উন্মাদ মাথাচাড়া বনস্পতির ভেতর বেড়ে চলেছে ঘুণপোকা।’ কবিতার শব্দমালায় এভাবেই সমাজের ক্ষয়ে যাওয়া দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কবি প্রতিমা দাশ।

অজানা পথে কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘অজানা পথে কেউ ছড়িয়ে রেখেছে পরিপাটি ভালোবাসা! অপরাজিতা বসে আছে আধভেজা চুল খুলে/হঠাৎ পুরো শরীরে স্পর্শ করে যায় পৌরাণিক কোনো চরিত্র! তাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি জোনাকি ভর্তি সন্ধ্যেবেলা ঘিরে রেখেছে আমাকে।’ এই কবিতায় কবি নানা শব্দের ব্যঞ্জনায় একদিকে পৌরাণিক কল্পকাহিনী আঁকার চেষ্টা করেছেন পরক্ষণেই জোনাকির আলোতে বাস্তবতার ছোঁয়ায় ভালোবাসার মুগ্ধতায় পাঠকের মনকে নাড়িয়ে দিয়েছেন।

হায়েনার বুটের শব্দ/বুলেটে ঝাঁঝরা বুক/মায়ের অশ্রুভরা হাহাকার/রক্তাক্ত শ্মশানপুরী। বীরাঙ্গনার তীব্র চিৎকার/কামার্ত সেনার পাশবিক উল্লাস/ধর্ষিতার বীভৎস লাশ/নিষ্পাপ কিশোরীর আর্তনাদ। আকাশে নতুন সূর্য/জয় বাংলার ধ্বনি/ঘাসের উপর রক্তজবা/সদ্য ভূমিষ্ঠ অস্তিত্ব/বিজয়ের দিনপঞ্জি।’ মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলোতে দুই লক্ষ নারীর উপর পাকিস্তানী হায়েনাদের বীভৎসতার কথা কবিতার পঙক্তিমালায় সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। কবিতার কথা আসবে আর দেশের কথা আসবে না, দেশের জন্মকালিন কষ্টের কথা উঠে আসবে না তা হতে পারে না। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার জীবনযৌবনশরীরস্থাপনা উৎসর্গ করা সেই নরকের দিনগুলো নতুন প্রজন্মকে কবিতার শব্দের বিয়োগান্ত বুননের পারদর্শিতায় চোখে আঙ্‌গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কবি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও স্বাধীনতা বিরোধী এদেশীয় দোসরদের পাশবিকতার চরম বিষাদে মাখা দিনগুলো শব্দের বুননে নিপুণভাবে প্রজন্মের মনে গেঁথে দিয়েছেন। এ কবিতাটি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির ভাবনায় শক্তি সঞ্চয়ে প্রেরণা যোগাবে।

প্রেমের শক্তি নাকি সমগ্র পৃথিবীকেও টলিয়ে দিতে পারে। ভালোবাসার জন্য পৃথিবীর সব সুখ বিলিয়ে দিতে পারে, শুধু ভালোবাসাটাই চাই। এমন হাজারো নজির আছে। লক্ষ কোটি কবিতার মতো আবারও খুব সাদামাটা শব্দের প্রয়োগে প্রমাণ করতে চাইলেন কবি প্রতিমা দাশ তার ‘ঘোর’ কবিতায়। কবি তার শব্দের বুননে বলছেন, ‘তোমাকে দেখবো বলেই পরিব্রাজক হয়ে জন্ম জন্মান্তর ঘোরে।/তোমাকে দেখবো বলে এলাম সপ্তর্ষিমণ্ডল চিরে।তুমি আছো বলেই এখনো চেয়ে আছি বিপন্ন বিস্ময়ে!/তুমি আছো বলেই বুকের ভিতর নুনমাখা কাব্য তবুও ছটফট করে।তুমি আছো বলেই উড্ডীন শরীর ভেসে থাকে শূন্যতার তক্তাপোষে।/যদি এসো জল দিও এক ফোঁটা বড় তেষ্টা সাগরের বুকে।’

আচ্ছা বৃষ্টিকে পছন্দ করে না এমন মানুষ কি আছে? চারদিকে রব উঠবে, বৃষ্টিকে ভালোবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তো কবি প্রতিমা তাঁর ‘চলো স্বপ্ন বুনি’ কাব্যগ্রন্থের শেষ দিকে পছন্দের বিষয়কে পূর্ণতা দিতেই যেন স্থান দিয়েছেন ‘বৃষ্টি বিলাস’ কবিতাটি। রোদে পুড়ে খাক হয়ে থাকা মৃত্তিকা যেমন বৃষ্টির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে, বিরহকাতর প্রেমিকপ্রেমিকা যেমন রিমঝিম বৃষ্টির শব্দে নস্টালজিক হয় তেমনিভাবে কব্যগ্রন্থে বৃষ্টির তালে তালে পাঠকের মনকে মাতাতে কবি বৃষ্টি বিলাসকবিতা নিয়ে হাজির হয়েছেন। ‘ঘুঙুর পায়ে বৃষ্টি নামে তা ধিন তা দেবে তাল/ঢেউ হুড়মুড় শান্ত নদী/দোলে বনের সবুজ ঢাল। দোদুল ঢাকি ঢোল বাজাবে/ভৈরবী শাঁখ খঞ্জনা/টুকটুকে লাল শাড়ি পরে/মঞ্চ দোলাবে অঞ্জনা।’ বৃষ্টি আর প্রেমের কোথাও যেন একটা বন্ধন আছে। রহস্যময় বন্ধন। তাইতো ভালোবাসার মানুষ পাশে থাকলে বৃষ্টির রোমাঞ্চ যেন আরো ছড়িয়ে পড়ে মনে মনে, প্রাণে প্রাণে। তেমনি কাব্যবৃষ্টির ছোঁয়ায় কবিও উদ্বেলিত হয়ে উঠেছেন।

কবি প্রতিমা দাশ, সাহিত্যের একজন সেবক। সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখাপ্রশাখায় সাবলিল ও প্রাণবন্ত তার বিচরণ। তিনি একাধারে একজন কবি, আবৃত্তিশিল্পী। ছোটবেলা থেকেই নৃত্যে তালিম নিয়েছেন। নৃত্যের তালে তালে দর্শক মোহিত করার বিশেষ গুণের অধিকারী প্রতিমা হাওয়াইয়ান গীটারেও দারুণ সুর তুলতে পারেন। এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। প্রতিভার দৌড়ে এখানেই কবি থেমে থাকেননি। নিত্য দিনের ব্যস্ততায় সময়ের ফাঁকে শাড়ি বা ক্যানভাসে নিপুণ দক্ষতায় তুলির আঁচড় বসাতে ভালোবাসেন। মুখে লেগে থাকা হাসির মতোই তিনি হাসতে হাসতে কবিতা লিখে ফেলেন। বিষয় নির্ধারণ, শিরোনাম ও কবিতার শব্দ বুননে তার সাবলীলতা পাঠককে মুগ্ধ করার অন্যতম মাধ্যম বলে মনে করি। শৈলী থেকে প্রকাশিত এই বইটির সমস্ত কবিতা সব বয়সী পাঠককে মুগ্ধ করুক এই প্রত্যাশা রইলো।

লেখক: সভাপতি, চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাখাওয়াত হোসেন মজনু স্মরণে
পরবর্তী নিবন্ধমোগলদের হাত ধরে বাংলায় বৈচিত্র্যময় ইফতার সামগ্রীর আগমন