অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ : চিকিৎসার নৈতিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

এ এইচ এম মাইনুল হক | শনিবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ

১৯৯৩ সাল থেকে একজন রোগীর অভিজ্ঞতায় দেখা এক চিকিৎসক যাঁর পেশাগত সততা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে আস্থার একটি মানদণ্ড তৈরি করেছেন।

একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেবল হাসপাতাল, যন্ত্রপাতি বা আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এর প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে স্বাস্থ্য সেবা দানকারী পেশাজীবীদের মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের মধ্যে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে অধ্যাপক ফয়েজ তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব যিনি জীবন ও কর্ম দিয়ে চিকিৎসা পেশার জন্য একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

সেই ১৯৯৩ সাল থেকে রোগী হিসেবে আমরা তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এই দীর্ঘ পরিচয় আমাদেরকে কেবল একজন দক্ষ চিকিৎসকের সেবা পাওয়ার সুযোগই দেননি; বরং একজন আদর্শ নৈতিক চিকিৎসক কাকে বলা যায়, তা বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছেন। সেই কারণেই এই লেখা। নিছক প্রশংসা নয়, একজন রোগী, রোগীর আত্মীয় ও নাগরিকের দায়িত্বশীল গভীর পর্যবেক্ষণ।

শিক্ষা জীবন: জ্ঞান ও দায়বদ্ধতার ভিত্তি: তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়ে ছিল গ্রামে কিন্তু মেধা, শৃঙ্খলা ও মননের সমন্বয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে দেশি ও আন্তর্জাতিক পরিসরে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন একজন পরিপূর্ণ চিকিৎসা বিজ্ঞানী হিসেবে। তবে তাঁর শিক্ষা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল চিকিৎসাকে কেবল পেশা হিসেবে নয়, সমাজের প্রতি একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা।

চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি গবেষণা ভিত্তিক চিন্তা ও বাস্তবমুখী প্রয়োগের প্রতি আগ্রহ তাঁকে একজন আদর্শ শিক্ষক ও গঠনমূলক চিন্তার আধার হিসাবে পরিণত করে। তিনি বিশ্বাস করেন, চিকিৎসা বিজ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের বাস্তব কল্যাণে আসে।

পেশাগত জীবন: চিকিৎসা, শিক্ষা, নেতৃত্ব: সুদীর্ঘ পেশাগত জীবনে অধ্যাপক ফয়েজ বহুমাত্রিক ভূমিকা পালন করেছেন। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে তিনি অসংখ্য রোগীর আস্থা অর্জন করেছেন তাঁর দক্ষতা ও সততার মাধ্যমে। শিক্ষক হিসেবে তিনি গড়ে তুলেছেন বহু চিকিৎসক, যাঁরা আজ দেশবিদেশে দায়িত্বশীল পদে গুরুত্বপুর্ণ কাজ করছেন। শিক্ষাগুরু হিসেবে তাঁর শিক্ষার্থীদের কাছে শুনেছি শিক্ষাদান কালে ক্লিনিক্যাল দক্ষতার পাশাপাশি মানবিকতা বিশেষ করে মেডিকেল এথিক্স, পেশাগত সততা ও রোগীর প্রতি আন্তরিক দায়িত্ববোধ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

স্বাস্থ্যখাতে প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রমাণ করেছেন চাপ ও সংকটের মধ্যেও নৈতিক অবস্থান অটুট রাখা সম্ভব। তথ্যভিত্তিক বক্তব্য, স্পষ্ট অবস্থান এবং আপোসহীন সততার কারণে তিনি জনআস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

রোগীর অভিজ্ঞতায় মানবিক চিকিৎসা: বর্তমান সময়ে দেশে চিকিৎসা পেশা নিয়ে রোগীদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক ফয়েজ এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিনের রোগী হিসেবে আমি দেখেছি তিনি রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, সহজ ভাষায় প্রয়োজনে স্থানীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করেন এবং কখনো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা (টেস্ট) বা চিকিৎসার পথে যান না।

রোগীর শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি, মানসিক, আর্থিক, সামাজিক প্রেক্ষাপটও তাঁর বিবেচনায় থাকত। অনেক সময় তাঁর আশ্বস্ত কণ্ঠ, সংযত আচরণ ও সহমর্মিতা রোগীর জন্য বড় মানসিক শক্তির উৎস হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা পেশার অতিগুরুত্বপুর্ণ বিষয় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে রোগীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

জাতীয় প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব: বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্যখাত জটিল এবং নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত। বাস্তবতার আলোকে অধ্যাপক ফয়েজ দেখিয়েছেন মানবিকতা ও নৈতিকতা কোনো বিলাসিতা নয় বরং একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। তাঁর কর্মজীবন প্রমাণ করে একজন পেশাজীবীর কাছে সততাই একটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাকে আস্থার জায়গায় নিয়ে যেতে পারে।

নতুন প্রজন্মের চিকিৎসা পেশাজীবীদের জন্য তাঁর জীবন একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে চিকিৎসায় সাফল্যের মাপকাঠি কেবল পদপদবি বা আর্থিক অর্জন নয়; বরং রোগী হিসেবে আস্থা ও সমাজের বিশ্বাস। অধ্যাপক ফয়েজ এমন এক সময়ে আমাদের সামনে আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছেন, যখন চিকিৎসা পেশায় এই আদর্শের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তাঁর আদর্শ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় চিকিৎসা প্রথমে একটি নৈতিক মানবিক দায়িত্ব, তারপর একটি পেশা। তাই অনেকেই চিকিৎসা পেশাকে ‘প্রফেশান’ বলে থাকেন। একজন সুনাগরিক, একজন রোগীরোগীর অভিভাবক এবং এ দেশের একজন কৃতজ্ঞ মানুষ হিসেবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের সমষ্টিক দায়িত্ব। তাঁর জীবন ও কর্ম যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসকদের মানবিক ও নৈতিক পথে অনুপ্রাণিত করে। আজও তাঁর অবদান ও আদর্শ বহু মানুষের মনে স্থায়ী প্রভাব রেখে চলেছে।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসুন্দরবন: বিধাতার অপার দান!
পরবর্তী নিবন্ধপ্রেম, পরিবার, সমাজ ও রাজনীতি