অটিজম আক্রান্তদের বাঁকা চোখে নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুন

সালাহউদ্দিন শাহরিয়ার চৌধুরী | সোমবার , ৩০ মার্চ, ২০২৬ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

স্নেহাকে নিয়ে কোথাও যেতে তার বাবামা বিব্রত বোধ করেন। কারণ স্নেহাকে দেখার পর তার চালচলনে পাশের লোকগুলো ফিসফাস করে আলোচনা করে। তাদের ভাবখানা এমন স্নেহা পাগল, কেন তাকে বাইরে আনা হলোকিন্তু স্নেহা পাগল নয় সে অটিজম আক্রান্ত। এরকম অটিজম শিশুর হার দিন দিন বাড়ছে।

২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। অটিজম বর্তমান প্রেক্ষাপটে বহুল পরিচিত একটি শব্দ, শব্দটির পরিচিত বাড়লেও বিকাশ হয়নি অটিজম নিয়ে মানুষের তথাকথিত চিন্তাধারার। সৃষ্টিকর্তা আমাদের এক করে গড়েননি, অটিজম যাদের আছে তারা আমাদের মতোই মানুষ, তবে তাদের সাথে আমাদের মস্তিস্কে জিন গত গঠনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। মূলত, এটি কোনো রোগ নয় এটি একটি স্নায়ুগত সমস্যা। এই অবস্থার জন্য সেই শিশুটি বা তার মাবাবা কেউই দায়ী নন। কিন্তু তার জন্য তাদের মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। এ অবস্থা সাধারণত শৈশবকালে শুরু হয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। চিকিৎসা শাস্ত্রে এই অবস্থার নাম অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার বা এএসডি। এএসডি আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাধারণত মনোযোগের ঘাটতি, হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার বা অবসেসিভকম্পাল্‌িসভ ডিসঅর্ডার দেখা যায়। চিকিৎসকদের মতে বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার জন শিশুর মধ্যে দুই জন শিশুর অটিজম দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে এদের সংখ্যা বেশি। শিশু বয়স থেকেই তাদের বিকাশটি ঠিক মতো হয় না। এই শিশুদের সংবেদনশীলতা ও বিশেষ ধরণের। তারা কিছু বিশেষ সংবেদনের প্রতি আগ্রহী থাকে। মানুষ এধরনের শিশুর সাথে তার শিশুকে খেলতে দিতে চায়না। এমন কি এমন শিশু তার সন্তানের সহপাঠী হোক তাও তারা চায়না। অনেক সময় তাদেরকে বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। বিশেষ করে এ শিশুদের জন্য মাবাবাদের প্রায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। যে পরিবারে একজন অটিজম সদস্য আছে, সে পরিবারের রীতিমতো একঘরে হওয়ার মতো অবস্থা হয়। স্কুল থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে অধিকাংশরাই তাদের এড়িয়ে চলে। এমন পরিস্থিতিতে একটি জীবনকে ভয়াবহ বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দিতে যথেষ্ট। অটিজম নিয়ে জন্মগ্রহণ করা এমন অনেক শিশু আছে, যাদের পরিবার তাদের সন্তানদের অটিজম শনাক্ত করতে পারে না। যেহেতু পরিবারগুলো তাদের সন্তানের এমন আচরণে উদাসীন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আচরণের এই অস্বাভাবিকতা বাড়তে থাকে। যা ওই পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনে তৈরি করে বাড়তি বিড়ম্বনা। এমনকি অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলোকেও করা হয় হেয়প্রতিপন্ন।

অটিজম নিয়ে কুসংস্কার নয়, চাই সচেতনতা

প্রতিটি শিশুই সৃষ্টিকর্তার উপহার, কোনো শিশুই বোঝা নয়। অটিজমকে একটি রোগ হিসাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আমাদের তাদের প্রতি সহনশীলতা দেখাতে হবে। তাদেরকে আপন করে নিতে হবে। আপনার সন্তানেরও এমন অসুবিধা থাকতে পারতো। তাদের অস্বস্তিকর আচরণকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের কে কাছে টেনে নিয়ে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সকলে উচিৎ নিজের সন্তানকে এসব শিশুদের সাথে মিশতে উৎসাহিত করা। তাদের পরিবারকে এই বিষয়ে সহমর্মিতা দেখানো। এই শিশুদের সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বাগত জানান। সন্তানের লেখা পড়া নিশ্চিত করুন। আপনার শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সজাগ ও সচেষ্ট থাকুন। সে কী চায়, কী খেতে চায়, কোথায় যেতে চায়, কী ধরনের পোশাক চায় জিজ্ঞেস করুন ও তার চাওয়া কে অগ্রাধিকার দিন। তাকে সামাজিক ও পরিবারিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। আপনার শিশুটিকে শর্তহীন ভালোবাসাদিন, সময় মাঝে মাঝে খুব কঠিন লাগতে পাওে, ধৈর্য্য হারাবেন না। আমাদের সমাজের কিছু মানুষ এই অটিজম আক্রান্তদের নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে, সমাজের নীচ লোকেরা যদি আপনার সন্তান বা আপনাকে নিয়ে কটু কথা বলে তবে তা অগ্রাহ্য করুন। আপনার শিশু বিশেষ শিশু, তার জন্য আপনার অসামান্য চেষ্টায় হয়তো সৃষ্টিকর্তা আপনার উপরে খুশী থাকবেন। অটিজম আছে এমন শিশুদের যত্ন নেয়া খুবই কঠিন কাজ। অটিজম আছে এমন শিশুরা আমাদের সন্তান। আসুন আমরা ওদের নিজের করে নিই, অটিজম নিয়ে কুসংস্কার দূর করতে চাই সচেতনতা। অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিরা শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। সমাজের সর্বত্র এটি রীতিমতো একটি অক্ষমতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই বৃহত্তর পরিসরে সচেতনতা সৃষ্টি হলে সবাই এ ব্যাপারে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে। তবে অটিজমের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অবস্থার পরিবর্তনে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। বছরের প্রতিটি দিনই তাদের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে করে যাওয়া যুদ্ধে শামিল হতে হবে সবাইকে। তাদের চলার পথটা যেন সহজ হয়, সে লক্ষ্যে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অটিজম সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত করা এবং এর অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের শিশুদের পাঠক্রমে অটিজমের একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে স্কুলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সম্ভব যেখানে সাধারণ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরাও এসে অটিজম এবং এটি কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে জানাতে পারবে। সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের কথা বলতে হবে যাতে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাদের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুটির জন্য সহানুভূতি অনুভব করে। অটিস্টিক শিশুদের তাদের সংবেদনশীলতাকে বুঝতে সাহায্য করা সহমর্মিতা গড়ে তোলার প্রথম পর্যায়। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে তবুও এটি এখনও পর্যন্তু শতভাগ নিরাময়যোগ্য হয়নি। মস্তিষ্কের বিকাশজনিত এ অটিজম সমস্যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন অনেকটাই নিরাময়যোগ্য। যেহেতু এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, তাই একটি শিশুর অটিজম যদি তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যায়, সে ক্ষেত্রে তার নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়। মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি শিশুকেই তার জন্মের পর থেকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি দেখা যায়ছয় মাস বয়সের মধ্যে শিশু একা একা না হাসে, বার মাস বয়সের মধ্যে আধো আধো বোল বলতে পারছে না, পছন্দের বস্তুর দিকে ইশারা করছে না, ১৬ মাসের মধ্যে কোনো একটি শব্দ বলতে পারে না, ২৪ মাস বয়সের মধ্যে দুই বা ততোধিক শব্দ দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না, ভাষার ব্যবহার রপ্ত করতে পারার পর আবার ভুলে যাচ্ছে, বয়স উপযোগী সামাজিক আচরণ করছে নাএসব লক্ষণ দেখা গেলে তখন তাকে অবশ্যই অটিজমের বৈশিষ্ট্য আছে কি না, বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণত অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১৮ মাস থেকে ৩৮ মাস বয়সের মধ্যেই অটিজমের বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ পায়। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের মধ্যে খিঁচুনি (মৃগী), অতিচঞ্চলতা (হাইপার অ্যাক্টিভিটি), বুদ্ধির ঘাটতি, হাতের কাজ করতে জটিলতা, হজমের সমস্যা, দাঁতের সমস্যা, খাবার চিবিয়ে না খাওয়া ইত্যাদি সমস্যা থাকতে পারে। চিকিৎসকদের মতে শিশুর মধ্যে লক্ষণগুলো দেখা মাত্রই মাবাবার উচিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে তার অটিজমে আক্রান্ত সন্তানকে লোকচক্ষুর অন্তরালেই রাখতে চান, যা সন্তানের সমস্যার বিস্তার ঘটাতে থাকে। দ্রুত অটিজম শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলে তাদের জীবনেও অনেকটা স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অভিভাবক হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে সেই শিশুটির বিশেষায়িত স্কুলে লেখাপড়া নিশ্চিত করা। এই শিশুটির বেড়ে উঠার জন্য অভিভাবককে হতে হবে অনেক ধৈর্য্যশীল, ঐ শিশুর আচরণের প্রতি হতে হবে সহনশীল এবং ইচ্ছাশক্তিকে দিতে হবে প্রাধান্য। সুতরাং এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে সহমর্মিতার মাধ্যমে অটিজম শিশুদের মাঝেও বুঝসম্পন্ন মানসিকতা সৃষ্টি করা।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনারীর ভাষা: স্বরূপ ও সমীক্ষা
পরবর্তী নিবন্ধদূরের দুরবিনে