অজানা আশঙ্কা

নাসের রহমান | শুক্রবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ

বুয়াটা কয়েক বছর থেকে এ বাসায় কাজ করে। সময়মতো এসে কাজ সেরে আবার চলে যায়। বুয়াদের কাজের অনেক ভাগ থাকে। কোন কাজ করলে কতো দিতে হবে তা আগে ঠিক করা হয়। ঘর ঝাড়ুর পর মুছে দেয়া ও বাথরুম ধুয়ে দেয়ার একরকম হিসাব। ডেক্সিপাতিল বাসনকোসন কাপড়চোপড় ধুলে আরেক হিসাব। তরিতরকারি মাছমুরগি কুটাবাছা করে দিলে অন্যরকম হিসাব। সব কাজ করলে টাকার পরিমান বেড়ে যায়। সময়ও অনেক লাগে। এক বাসায় কাজ শেষ করতে বেলা হয়ে যায়। আরেক বাসায় গিয়ে কাজ করতে দুপুর গড়িয়ে যায়। এতো কাজ কেউ একা নিতে চায় না। সবাই ভাগ করে কাজ করতে চায়। দুইতিন বাসায় করতে পারলে রোজগারটা ভালো হয়। বাসা ভাড়া দিয়ে কোনমতে মাসের খরচ হয়ে যায়।

এ বাসার সব কাজ বুয়াটা করে। এরা ভালো বেতন দেয়। সময়ে অসময়ে সাহায্য করে। বুয়ার মেয়েটি যে স্কুলে পড়ে তার খরচও দেয়। বিকেলে বুয়া আরেক বাসায় কাজ করে। সেখানে ঘন্টা খানেকের মধ্যে কাজ সেরে নিজের বাসায় চলে যায়। টিনশেডের এক রুমের বাসাটাতে মামেয়ে থাকে। রান্নাবান্নাও এ রুমে। কমন বাথরুম, পাঁচঘরের জন্য একটি। সকালে লাইন ধরে যেতে হয়। মেয়েটার ভালো লাগে না। মাকে বলে আরেকটা বাসা নিতে। মা সায় দেয় না। মা টাকার কথা বললে মেয়েও কাজ নিতে চায়। একটা কাজ নিলে বাড়তি টাকা পাওয়া যাবে। এ টাকা দিয়া এর চেয়ে ভালো বাসায় থাকা যাবে। মা রাজি হয় না। ‘তোর লেহাপড়ার ক্ষতি হইব’। ‘তোমার শরীর খারাপ হলে আমি ঐ বাসায় গিয়ে কাজ করে আসি না’। ‘হেইডাতো মাঝে মধ্যে দুই একদিন’। ‘আমার স্কুলতো দুইটায় ছুটি হয়ে যায়। বিকেলে আমি একটা কাজ নিতে পারি’। ‘আমি তোরে বাসায় কাজ কইরতে দিমু না। তুই লেহাপড়া শিখবি, কলেজেত ভর্তি হবি’।

মেয়েটির নাম রামিসা। এবার নাইনে ওঠেছে। পড়ার অনেক ইচ্ছা তার। লেখাপড়ায় ভালো। ক্লাসে খুব মনোযোগী থাকে। সহপাঠিদের সঙ্গে বেশি কথা বলে না। ঘনিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে মিশে। এরা তার সম্পর্কে জানে। তাকে কখনো অন্যভাবে দেখে না। তার সাথে মন খুলে কথা বলে। বান্ধবীর চোখে দেখে। তার ভয় হয় অন্যরা যদি তাকে সেভাবে না দেখে। তার সবকিছু জেনে সহপাঠীর আচরণ না করলে খারাপ লাগবে। তাই সে একটু দূরে দূরে থাকে। সবার সঙ্গে মিশতে চায় না। তবে সে সবার সাথে খুব ভালো আচরণ করে। কেউ বলতে পারবে না মেয়েটি আমাদের এড়িয়ে চলে। বান্ধবীরা তাকে খুব সাহস যোগায়।

রামিসা যেদিন এ বাসায় কাজ করতে আসে গৃহকর্ত্রি সব কাজ তার ওপর চাপিয়ে দেয় না। নিজেও কিছু কিছু করে ফেলে। মেয়েটার জন্য মায়া হয়। স্কুলে পড়ে আবার মার বদলে কাজ করতেও আসে। মেয়েটা দেখতে শুনতে সুন্দর। মার মতো হয়েছে। কথাও কম বলে। কাজে ফাঁকি দেয় না। যেটা করে ভালো করে করে। হাত চালু, তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারে। কোনো কিছু খেতে দিলে সংকোচ করে। সহজে খেতে চায় না। কাজ শেষ করে চলে যেতে চায়। এ বাসার ছোট ছেলে আদিব তার সাথে কথা বলে। লেখাপড়ার কথা, স্কুলের কথা। সেও ক্লাস নাইনে পড়ে। বয়েজ স্কুলে। আদিব যা জানতে চায় রামিসা ঝটফট উত্তর দেয়। ‘তোমরা মেয়েরা কি স্কুলে মারামারি কর’? সে অবাক হয়ে বলে, ‘মারামারি কেন করবো!’ ‘একজন আরেকজনকে গালি দাও নাকি।’ ‘না’! সে এবার জানতে চায়, ‘ঝগড়াঝাটি হয় না তোমাদের মাঝে’। ‘তা মাঝে মধ্যে কারো সাথে হয়। কথা কাটাকাটি হয়।

বন্ধের দিন আদিবের আব্বু বাসায় থাকে। বেলা পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে থাকে। বুয়া এ রুমে ঢুকে না। সব রুম পরিষ্কার করে বুয়া বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। আদিবের আম্মু রুমে ঢুকে বলে, ‘তুমি ওঠো বুয়া ঘর পরিষ্কার করবে’। ‘আমি থাকলে কি করা যায় না’। ‘না, তুমি বাহিরে যাও। বিছানা ঝাড় দিতে হবে। সবকিছু গুছাতে হবে’। ‘ছুটির দিনেও আমি কি ঘরে থাকতে পারবো না’। ‘তুমি তাড়াতাড়ি অন্য ঘরে যাও। ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসো’। ‘আমি কি বাইরের কেউ ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসে থাকবো’। ‘এতো কথা বলছো কেন?’ কথাতো সব তুমি বলছো বলে বিছানা থেকে ওঠে বাইরে আসে।

এবার আম্মু বুয়াকে রুমে ঢুকতে দেয়। বুয়া রুমটা ঝাড়ু দিয়ে আবার মুছে ফেলে। নিচে কিছু পড়লে ওয়ার ড্রবের ওপর তুলে রাখে। কখনো কোনো কিছু সরায় না। এটা সেটা কতো কিছু নিচে পড়ে যায়। মানিব্যাগ পেয়েও তুলে রেখেছে। হাত দেয়নি। এরপর থেকে বুয়ার ওপর বিশ্বাস অনেক বেড়ে গিয়েছে। তারপরও আব্বু থাকলে এ ঘরে ঢুকতে দেয় না। বুয়া একবার মেয়ের পড়ালেখার খরচের কথা বলেছে। আব্বু সহজে রাজি হয়ে গেছে। এরপর থেকে বুয়াকে আর একা ঢুকতে দেয় না।

সকালে সবার নাস্তার পর বুয়া আসে। বন্ধের দিন আরো পরে আসে। এ দিন ঘুম থেকে সবাই দেরি করে ওঠে। নাস্তা করতে করতে সকাল পার হয়ে যায়। বুয়া এসে কাজ শুরু করে দেয়। কিচেনে বাসন কোসন ডেক্সি পাতিল ধুতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আম্মু ভেতর থেকে এসে বলে, ‘তুমি চলে এসেছো। আমারাতো এখনো নাস্তা করেনি’। ‘বেলা অনেক হইছে আপনারা নাস্তা কইরা নেন। আমি পাকঘরে ধোয়া মোছা কইরা তারপর বাইর হব’।

এরা নাস্তা করতে টেবিলে বসে। নাস্তা শুরু করে। এ সময় কলিং বেল বেজে ওঠে। আম্মু দরজা খুলে দেখে বুয়ার মেয়ে। ‘তুমি কেন এসেছো? তোমার মাতো এসেছে’। ‘আমি মার কাছে এসেছি’। কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘আচ্ছা ভেতরে এসো’। রামিসা সবাইকে নাস্তার টেবিলে দেখে কিছুটা ইতস্তত করে। আব্বু বলে, ‘এসো এসো তুমি নাস্তা করো, তোমার লেখাপড়া কেমন চলছে।’ ‘ভালো। আমি নাস্তা করে এসেছি।’ আম্মু বলে, ‘তুমি কিচেনে চলে যাও, তোমার মা ওখানে’। আব্বু বলে, ‘আরে মেয়েটা এসেছে কিছু খেতে দাও’। ‘আমি পরে দেবো। এসব নিয়ে তোমাদের কথা বলতে হবে না’।

নাস্তা শেষ করে আব্বু ড্রইং রুমে গিয়ে বসে। টিভি অন করে দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম দেখে। আদিব বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। টবের গাছগুলো দেখে। আম্মু ওয়াশরুমে যায়। টিভিতে সংবাদ পত্রের বিশ্লেষণ শুরু হয়। বুয়া ড্রয়িং রুম পরিষ্কার করতে আসে। রামিসা এসে দেখে আদিব বেলকনিতে দাঁড়িয়ে টবের গাছের দিকে তাকিয়ে আছে। সে কিচেনে গিয়ে একটি মগে টেপ থেকে পানি ভর্তি করে নিয়ে আসে। বেলকনিতে গিয়ে টবে পানি দিতে শুরু করে।

এসময় আম্মু ওয়াশরুম থেকে এসে হতবাক হয়ে যায়। বুয়া ড্রয়িং রুমে আব্বুর সামনে বসে টিটেবিল পরিষ্কার করছে। আর বলছে, ‘মেয়েটি আপনাগো দয়ায় লেহাপড়া কইরতে পারছে’। ছেলে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে কি যেন বলছে। আর মেয়েটি তার পাশে দাঁড়িয়ে গাছে পানি দিচ্ছে। আম্মু কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। আদিব বলছে, ‘এ টবের গাছটিতে পানি দাও। এ গাছটার পাতা হলুদ হয়ে গেছে’। রামিসা তার কথা শুনে বলে, ‘পানি না পেলে গাছের পাতা সবুজ থাকে না’। এসময় আম্মু চেঁচিয়ে বলে, ‘তোমরা ওখানে কি করছো?’ আদিব বলে, ‘অনেক দিন পানি না পেয়ে টবের গাছগুলো মরে যাচ্ছে আম্মু। রামিসা গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে’। ‘আর তুমি কি করছো’? ‘আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি’। আম্মু এবার থেমে যায়। ভাবে এদের সামনে কিছু বলা ঠিক হবে না। আদিবের আব্বু এমনিতে কম কথা বলে। হঠাৎ কোনো কারণে মুখ ছুটলে আর থামে না। অনেক কিছু বলে ফেলে। আবার ঘরের অনেক কথাও কাজের বুয়ারা জানে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাউল গান: জনপ্রিয় ঐতিহ্যের ধারক
পরবর্তী নিবন্ধআজ জাতীয় বৌদ্ধ যুব উৎসব