বাঙালির জাতীয় জীবনে মার্চ মাস শোক ও শক্তির প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই মাসেই ২৩ বছরের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রাম শুরু হয়, যা দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়।
বছর ঘুরে আবার এলো বাঙালির মুক্তি–সংগ্রামের অগ্নিঝরা মার্চ। একটি নতুন পতাকা, একটি বজ্রকণ্ঠ ভাষণ, একটি ভয়াবহ কালরাত সবমিলিয়ে ১৯৭১ সালের মার্চকে ধরা হয় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্বের সূচনা হিসেবে। আমাদের স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত লড়াই শুরু হয় এ মার্চেই। এ মাসেই বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। উত্তাল একাত্তরে পুরো মার্চ মাসজুড়ে বাঙালির চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন। বাংলাদেশের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম ঘটনা হচ্ছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের এ ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির কয়েক হাজার বছরের সামাজিক–রাজনৈতিক স্বপ্নসাধ পূরণ হয়।
১মার্চ পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ইয়াহইয়া খান যখন গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে, তখন পূর্ব বাংলায় দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র–জনতা স্লোগান তোলে, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর কালজয়ী ভাষণে ঘোষণা করেন,’ ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম‘’। এই ভাষণ পুরো জাতিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনার মাস। বিশ্বকাঁপানো গৌরবগাথার এক একটি দিন বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক একটি হীরক খণ্ড ।
মার্চের এই দিনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ৩ রা মার্চের গণপরিষদের সাধারণ অধিবেশ স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলার ছাত্র সমাজ প্রথম স্লোগান তুলে, ‘বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর ’। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের দাবীর মুখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ রা ও ৩ রা মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানে সর্বাত্মক হরতাল এবং ৭ ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার ঘোষণা দেন ।
পশ্চিম পাকিস্তানি শাষক–শোষক গোষ্ঠীর নাগপাশ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে দুইযুগের নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলনের হাত ধরে এই মার্চেই ঘোষিত হয়েছিল বাঙালি মুক্তি সনদের অমর কাব্য , ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম‘’। এই মার্চ মাসেই পাক হানাদার বাহিনী বিশ্ব ইতিহাসের ঘৃণ্যতম গণহত্যা শুরু করলে মুহূর্তেই গর্জে উঠে বাঙ্গালী। ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ লাখো মানুষের পদচারণায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল স্ল্লোগানের শহর ঢাকা। রেসকোর্স ময়দানে জনসমুদ্রে অপেক্ষা করেছেন দশ লাখের বেশি স্বাধীনতাকামী মানুষ। শুধু একটা ঘোষণা বা ডাকের অপেক্ষায়, আগের দিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি উত্তেজনায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন– বঙ্গবন্ধু আজ কী বলবেন– কী নির্দেশ দেবেন জাতিকে! সাহসী বাঙালির একমাত্র ইচ্ছা চার অক্ষরের একটি প্রিয় শব্দ ‘স্বা–ধী–ন–তা‘ ! ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য যে আগুন জ্বলে উঠেছিলো– সে আগুন যেন ছড়িয়ে পড়ে বাংলার সর্বত্র। এরপর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২–এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬–এর ছয় দফা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানের সিঁড়ি বেয়ে একাত্তরের মার্চ বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে নতুন বারতা। জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন স্বাধীনতা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।









