বাংলাদেশ রেলওয়ের অকেজো ডেমু ট্রেনগুলোকে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু দিকনির্দেশনার পর রেলপথ মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রেলওয়ের অকেজো ও অব্যবহৃত ডেমু ট্রেনকে ব্যবহারের উপযোগী কমিউটার ট্রেনে রূপান্তর করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে আগ্রহী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে একটি করে ডেমু ট্রেন ব্যবহারের উপযোগী করার দায়িত্ব দেওয়া হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো কাজ করা প্রতিষ্ঠানকে বাকি ডেমু ট্রেনগুলো ব্যবহারের উপযোগী করার কাজ দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেন, অকেজো ডেমু ট্রেনগুলোকে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেনে রূপান্তরের উদ্যোগের কথা আমিও শুনেছি। এগুলো চালুর ব্যাপারে রেলভবন প্রক্রিয়া করছে। রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ে যাত্রীসেবার মান বাড়াতে ২০১৩ সালে ২০ সেট ডেমু (ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট) ট্রেন কিনেছিল চীন থেকে। এসব ডেমু ট্রেনের আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। তবে ১০ বছর না যেতেই ২০টি ডেমু ট্রেনের ১৯টিই অচল হয়ে যায়। এখন চট্টগ্রাম–নাজিরহাট রুটে কেবল একটি ডেমু ট্রেন চলাচল করছে। রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, রেলওয়েতে ২০২২ সালে ৬টি ডেমু ট্রেন সচল ছিল। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩টি ও লালমনিরহাট বিভাগে চলত ১টি। ২০২৩ সালে একে একে বিকল হয়ে যায় আরো ৫ সেট ডেমু ট্রেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম–নাজিরহাট রুটে ১টি বাদে দেশের আর কোথাও কোনো ডেমু ট্রেন চলছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ডেমু ট্রেনের দুদিক দিয়ে দুটি ইঞ্জিন এবং মাঝখানে একটি বগি থাকে। বগির পাশাপাশি ইঞ্জিন অংশেও যাত্রী বহন করা যায়। প্রতিটি ডেমুতে ১৪৯ জন বসে এবং ১৫১ জন দাঁড়িয়ে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু যখন ডেমুগুলো উদ্বোধন করা হয়, তখন প্রতিটি ডেমুতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী যাতায়াত শুরু করে। ডেমু ট্রেনগুলো দেখতে সুন্দর। স্বল্প দূরত্বের জন্য চমৎকার বাহন ছিল। শুরুতে যাত্রীদের সীমাহীন আগ্রহ ছিল। স্বল্প দূরত্বের এসব ট্রেন এক থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরত্বে যাত্রী বহন করতে থাকে। মূলত এ কারণেই ট্রেনগুলো অল্পদিনে বিকল হয়ে পড়ে। অন্যথায় এ ধরনের ট্রেনের ইঞ্জিনে পাঁচ বছরের আগে হাত দিতে হয় না। মেরামত করে ২০ থেকে ২৫ বছর চালানো যায়।
রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগ জানায়, শুরুতে কমলাপুর–নারায়ণগঞ্জ রুটে দুই সেট ট্রেন চালু করা হয়। পরে ডেমু ট্রেনগুলো ঢাকা–টঙ্গী, ঢাকা–জয়দেবপুর, জয়দেবপুর–ময়মনসিংহ, সিলেট–আখাউড়া, কমলাপুর–আখাউড়া, চট্টগ্রাম–কুমিল্লা, নোয়াখালী–লাকসাম, লাকসাম–চাঁদপুর, চট্টগ্রাম–নাজিরহাট, পার্বতীপুর–লালমনিরহাট, পার্বতীপুর–পঞ্চগর রুটে চলাচল করত। মেকানিক্যাল বিভাগের এক প্রকৌশলী জানান, এসব ট্রেন মূলত ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জের স্বল্প দূরত্বে (২০ কিলোমিটার) যাতায়াতের জন্য কেনা হয়েছিল। অথচ অন্য প্রতিটি রুট গড়ে ৯০ কিলোমিটারের বেশি ছিল। ফলে উদ্বোধনের কিছুদিনের মধ্যে একের পর এক ট্রেন বিকল হতে শুরু করে। অথচ চীন থেকে কেনা এসব ডেমু ট্রেন সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির। প্রতিটি ট্রেনের মেয়াদকাল ছিল ৩০ বছর করে। কিন্তু উদ্বোধনের কিছুদিন পর এক এক করে ট্রেনগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে। এখন দেশে এই ধরনের ট্রেন সচলে ওয়ার্কশপ ও যন্ত্রপাতি নেই। ফলে ট্রেন নষ্ট হলেও সারানোর ব্যবস্থা নেই। তবে দেশে এখন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ডেমু ট্রেনগুলো মেরামতে আগ্রহী হয়ে কাজ করতে চায়। এসব প্রতিষ্ঠান রেল কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রস্তাবনা দিয়েছিল। তবে মেরামত ব্যয় বেশি হওয়ায় রেল কর্তৃপক্ষ তাতে আগ্রহী হয়নি। এখন নতুন করে ডেমু ট্রেনগুলো মেরামত করে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেনে রূপান্তর করে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।













