বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনেক বিদেশি বন্ধুর অবদান রয়েছে। কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিকের প্রতিবেদন ঐ সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ সাড়া ফেলেছিল। কারো প্রতিবেদন ছিল বারুদের মতো। মার্ক টালি, সিডনি শনবার্গ ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। মানবতার পক্ষে ছিল তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান।
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু সাংবাদিক মার্ক টালি। গত ২৫ জানুয়ারি নয়াদিল্লির একটি হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। বাংলাদেশ হারালো একজন নিখাদ বন্ধুকে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন মার্ক টালি। তার মধ্যে রয়েছে–অমৃতসর : মিসেস গান্ধীস লাস্ট ব্যাটল, রাজ টু রাজিব : ফর্টি ইয়ার্স অব ইন্ডিয়ান ইনডিপেনডেন্স, নো ফুল স্টপ ইন ইন্ডিয়া, আনএন্ডিং জার্নি, ইন্ডিয়া : দ্য রোড অ্যাহেড, হার্ট অব ইন্ডিয়া।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্ক টালি বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন। বিবিসি রেডিওতে তার পরিবেশিত খবর ছিল মানুষের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ জানার প্রধান উৎস। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে বিবিসি রেডিওতে যার কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকত দেশের মানুষ, এ ভূখণ্ডে হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ আর বাঙালির দুর্দশার প্রকৃত চিত্র যিনি পৌঁছে দিতেন বিশ্বের কাছে।
সীমান্তবর্তী শরণার্থীশিবির ও বিভিন্ন জেলা ঘুরে তিনি বাঙালিদের প্রকৃত দুর্দশার চিত্র আর যুদ্ধের খবর পাঠান। মার্ক টালির পাঠানো খবর বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’য় ভূষিত করে। ভারত সরকারও মার্ক টালিকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মাননায় ভূষিত করে। স্বদেশ থেকে তিনি পান নাইটহুড খেতাব।
যুক্তরাজ্যের নাগরিক মার্ক টালির জন্ম ভারতের কলকাতার টালিগঞ্জে ১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর। তাঁর ব্যবসায়ী বাবা তখন ভারতে ছিলেন। শৈশব কলকাতায় কাটলেও ৯ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে ফিরে যান তিনি। স্কুল–কলেজে পড়াশোনা করেন সেখানেই। পাদ্রী হওয়ার কথা থাকলেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন মার্ক টালি। কিন্তু ভালো না লাগায় তা ছেড়ে দিয়ে ভর্তি হন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইতিহাস ও ধর্ম বিষয়ে। তবে সেই পড়াশোনাও শেষ করেননি।
১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন মার্ক টালি। পরের বছর দিল্লিতে দায়িত্ব নিয়ে আসেন। ১৯৯৪ সালে বিবিসি থেকে অবসর নেওয়ার আগে ২০ বছর তিনি দিল্লিতে ব্যুরো প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। মার্ক টালির স্ত্রী–সন্তানরা লন্ডনে থাকলেও তিনি নিজে ভারতে থাকতেন। বিবিসি থেকে অবসরে যাওয়ার পর ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন তিনি।
এক সময়ে মার্ক টালির নাম এ দেশের জনগণের মুখে মুখে ফিরত। গ্রামের কৃষক, বাজারের দোকানদার, স্কুলের শিক্ষক, নৌকার মাঝি, শহরের চাকরিজীবী, আর মুক্তিযোদ্ধারা তো বটেই–সবার কানের কাছে বাজত বিবিসি বাংলার অনুষ্ঠান। সেখানে প্রচার হতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মার্ক টালির রিপোর্ট। কখনো রণাঙ্গনের, কখনো নির্বাসিত সরকারের, কখনো পাক–বাহিনীর নৃশংসতার, কখনো মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের, আবার কখনো বড় দেশগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে খবর থাকত।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার মানুষ প্রতিদিন গ্রামে–শহরে হানাদার বাহিনীর নির্দয় গণহত্যা দেখেছে। এগুলোর অনেক খবর প্রচারিত হতো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। তবু মার্ক টালির কণ্ঠে ওই খবর আবার শুনতে বাংলাদেশের মানুষ উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করত বিবিসির সকাল কিংবা সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের জন্য–সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠান।
সারা বিশ্ব যেভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর শুনছে, বাংলার মানুষও অধীর আগ্রহে তা শুনত। ওই ভারী বাংলা কণ্ঠস্বরকে সবাই ধরে নিয়েছিল এটাই মার্ক টালির নিজস্ব কণ্ঠ। তাকে এ দেশের মানুষ এতটা আপন করে নিয়েছিল যে, অনেকেই ভুলে গিয়েছিল তিনি বাংলা বলতে জানেন না।
বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গিয়ে খবর সংগ্রহ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে একাত্তরের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। সেই প্রথম এবং শেষ বারের মতো পাকিস্তানি সরকার দুই সাংবাদিককে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিয়েছিল। মার্ক টালি ১৯৭১ সালের সেই সফরে ঢাকা থেকে সড়ক পথে রাজশাহী গিয়েছিলেন। এ বিষয়ে মার্ক টালি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত পৌঁছালো এবং তারা মনে করলো যে পরিস্থিতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে, তখনই তারা আমাদের আসার অনুমতি দিয়েছিল। আমার সঙ্গে তখন ছিলেন ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকার যুদ্ধবিষয়ক সংবাদদাতা ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যেহেতু স্বাধীনভাবে ঘুরে বেরিয়ে পরিস্থিতি দেখার সুযোগ পেয়েছি, সেজন্য আমাদের সংবাদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ হয়েছে। আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে সড়কের দু’পাশে দেখেছিলাম যে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম তাকে বিবিসির অন্যতম খ্যাতনামা বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কাশ্মির মনিটর এক প্রতিবেদনে লিখেছে, দক্ষিণ এশিয়ার সমপ্রচার সাংবাদিকতায় মার্ক টালি নিজেই এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ পুরো উপমহাদেশে একটি প্রজন্মের কাছে তার কণ্ঠস্বর ছিল বিবিসিরই প্রতিচ্ছবি।
মার্ক টালি চলে গেছেন জীবনের নিয়মে। কিন্তু বন্ধুত্ব রেখেছেন অটুট। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে যেসব বিদেশি বন্ধু ভূমিকা রেখেছেন, তিনি ছিলেন সবার অগ্রভাগে। তিনি শুধু বিবিসির সংবাদদাতা ছিলেন না, তিনি আমাদের অন্যতম বন্ধু।









