৭১-এর ডিসেম্বর জে: নিয়াজী : মুক্তি বাহিনীর হাতে পরাজয়ের স্বীকারোক্তি

এ.কে.এম. আবু বকর চৌধুরী | বুধবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ

৭১-র ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস হলেও কিন্তু তা ছিল অলঙ্কারিক বা আনুষ্ঠানিক। মৌলিক বিজয় হয় ৭১ এর ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। ১৬ ডিসেম্বর ৯৩ হাজার পাক হানাদার সশস্ত্র বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করলেও নীতিগতভাবে তাদের যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণকর্তা ৭ ডিসেম্বর অবনত মস্তকে পরাজয়কে স্বীকার করে নেয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ৭১-র ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার শীতের গোধূলী লগ্নে আমরা নীতিগতভাবে যুদ্ধে জয়ী হই। অর্থাৎ ৭ ডিসেম্বর ছিল ১৬ ডিসেম্বরের প্রত্যুষে।

এই মহান প্রত্যুষের পথে যারা হাসিমুখে বিজয়ের বেদীতে প্রাণ উৎসর্গ করে গেছে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার বক্ষমান নিবন্ধটি উৎসর্গ করছি। এরা মরেও অমর, এরা এক একটি লাল গোলাপ।

৭১-র ২৬ মার্চ হতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬৬ দিনব্যাপী পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সেনাদের সাথে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ সাড়ে সাত কোটি বাঙালি প্রতিক্ষণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত ও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য সহায়ক অধ্যায় হিসাবে গ্রথিত হয়ে থাকবে।

তেমনি একটি রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত হল ৭১-র এর ৭ ডিসেম্বর তৎকালীন গভর্নর হাউজে (বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্রপতির বাসভবন ‘বঙ্গভবন’) যুদ্ধকালীন সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (৩ সেপ্টে: হতে ১৬ ডিসেম্বর ’৭১) ৭৪ বছর বয়স্ক ডা: আবদুল মোতালেব মালেক ও পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডার লে: জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর আলাপকালে নিয়াজী বাহিনী তথা পাক বাহিনীর পরাজয়ের বরণের স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়।

৭০-র ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে ৩০০ টি আসনের মধ্যে আমাদের জন্য নির্ধারিত ১৬২-র মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৬০টি বিজয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাঝ দিয়ে সমগ্র পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন হওয়ার একক দাবীদার হয়ে দাঁড়ালে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান, সিন্ধুর জুল ফিকার আলী ভুট্টো, সীমান্ত প্রদেশের খান আবদুল কাইয়ুম খান, পাঞ্জাবের মিয়া মমতাজ মুহাম্মদ খান, মাওলানা আবুল আলা মওদুদী ও নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান সহ পাঞ্জাবী সামরিক ও আমলা গংদের ঘৃণ্য চক্রান্তের ফলে তা রুদ্ধ হয়ে যায়। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নরহত্যায় রূপান্তরিত হয়। নির্বাচনী ম্যান্ডেট আর রাজনৈতিক ইতিহাস হয় কলঙ্কিত। তাই বাধ্য হয়ে ৭১’র ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভা থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

এই কলঙ্কময় অধ্যায় তথা ৭০-র ৭ ডিসেম্বর হতে ৭১-র ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৭৫ দিনের এক প্রলম্বিত রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে পাকিস্তানীদের ঘৃণিত কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায় ‘উয়িটন্যাস টু স্যারেন্ডার’ বইতে।

২৪৫ পৃষ্ঠার বইটি (প্রকাশকাল ১৯৭৭) লিখেন লে: কর্নেল সিদ্দিক সালীক। পূর্ব পাক সামরিক কমাণ্ডের গণসংযোগ প্রধান হিসাবে ১৯৭০-র জানুয়ারী হতে ১৯৭১-র ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা সেনানিবাসে ছিলেন।

কর্ণেল সিদ্দিক সালীকের ‘উয়িটন্যাস টু স্যারেন্ডার’ বইতে ‘ঢাকা : দি লাস্ট এ্যাক্ট’ অধ্যায়ে ৭১-র ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার শীত বিকেলের গোধুলী লগ্নে পাকিস্তানের টাইগারখ্যাত জেনারেল নিয়াজী আমাদের বর্তমান বঙ্গভবনে তৎকালীন গভর্নর ডা. মালেকের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাক হিংস্র বাহিনীর চরম লজ্জা ও গ্লানিকর পরাজয়ের যেই স্বীকারোক্তি দিয়েছিল তা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় লিপিবদ্ধ করে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করে তুলেছেন।

কর্নেল সিদ্দিক সালীক এই অধ্যায়ে তথা নাটকের শেষ অঙ্ক : ঢাকা বা ঢাকা: দি লাস্ট এ্যাক্টে (পৃষ্ঠা ১৯৩-১৯৪) বলেন : ভারতের সাথে আমাদের (পাকিস্তানের) যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে লাহোর ফ্রন্টে দুঃখজনক হলেও কিছু আশাব্যঞ্জক সংবাদে সাময়িক আশায় আলো জ্বললেও এতদঅঞ্চলের (পূর্ব পাক) সীমান্ত এলাকা পাক সেনাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেঙে তছনছ হয়ে যাওয়ায় একজন ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত ও পরাজিত কুস্তগীরের মত জেনারেল নিয়াজীর ভ্রান্তির ঘোর কাটতে থাকে। কারণ মুক্তিবাহিনী কর্তৃক আমাদের নবম ডিভিশন এলাকা যশোর ও ঝিনাইদহ দখল, ১৬তম ডিভিশনের মূল যোগাযোগ লাইনে জিওসিকে এ্যাম্বুশ আর কুমিল্লা ও ফেনীর ৩৯তম অতিরিক্ত ডিভিশনের মূল উপত্যকায় আক্রমণ করার ফলে পাক বাহিনীর শক্তি ও মনোবল দ্রুত থেকে দ্রুততর গতিতে হ্রাস পেতে থাকে।

অপরদিকে গভর্নর হাউজে গভর্নর ডা: মালেককে জে: নিয়াজীর চীফ অব স্টাফ বিগ্রে: বকর সিদ্দিকী সামরিক প্রথা অনুযায়ী যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ বিজয়ের রঙিন চিত্র তুলে ধরলেও বেসামরিক প্রশাসন বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকগণ পাক বাহিনীর চরম পরাজয়ের বাস্তব চিত্র তুলে জনজীবন ও সম্পদ বিনষ্টের করুণ সংবাদ দিতে থাকায় গভর্নয়ের বোধোদয় হয়।

তাই বাধ্য হয়ে ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার শীত বিকেলের গোধুলী লগ্নে সাময়িক কমাণ্ডার জেনারেল নিয়াজীকে গভর্নর হাউজে ডেকে পাঠান গভর্নর ডা: মালেক। দুজন উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাসহ জেনারেল নিয়াজী গভর্নরের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলাপে ব্যস্ত হয়। অবশ্য এতে বেশির ভাগ আলাপ করে গভর্নর স্বয়ং।

গভর্নর তার (জে: নিয়াজী) প্রতি সহানুভূতির কণ্ঠে বলেন, সব কিছু সব সময় একই অবস্থানে থাকে না, একই গতিতে চলে না। ভাল অবস্থা যেমন খারাপের জন্য পথ করে দেয় তেমনি খারাপও ভালর জন্য পথ করে। একইভাবে একজন জেনারেলের জীবনেও একটি সাফল্য যেমন গৌরব বয়ে আনে তেমনি আরেকটি পরাজয়ও গৌরবকে ম্লান করে দেয়। এই কথা শুনার সাথে রণক্লান্ত শ্রান্ত জেনারেল নিয়াজীর বিরাট দেহ কেঁপে উঠে দুচোখ দিয়ে গরম জল পড়তে থাকে, দু’হাতের করতলে মুখ ডেকে ছোট ছেলের মত কান্নায় ভেঙে পড়ে।

বয়ঃবৃদ্ধ বৃটিশ ভারতে প্রধান শ্রমিক নেতা, অবিভক্ত বাংলা ও পাকিস্তানের প্রথম হতে তৃতীয় প্রধানমন্ত্রীর শ্রমমন্ত্রী গভর্নর ডা: মালেক মমতার সাথে জেনারেল নিয়াজীর কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলেন, জেনারেল সাহেব, আমি জানি একজন জেনারেলের, একজন সমরনায়কের জীবনে কঠোর সময়ও আসে, কিন্তু তাতে ভেঙে পড়ার কিছু নাই। আল্লাহই সর্বশক্তিমান ও মহান।

এইভাবেই ৭১-র ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার শীতের গোধূলী লগ্নে তৎকালীন গভর্নর হাউজ তথা আমাদের গৌরবের প্রতীক বঙ্গভবনে আমাদের হাতে চরম লজ্জা ও গ্লানিকর পরাজয়ের কথা অবনত মস্তকে স্বীকার করে নেয় লে: জেনারেল আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। জে: নিয়াজীর মুখে পরাজয় বরণের এই স্বীকারোক্তি শুনার পর গভর্নর ডা: মালেক পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের জন্য রাওয়ালপিন্ডির কাছে বার্তা প্রেরণের প্রস্তাব করলে কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের পর জে: নিয়াজী অবনত মস্তকে তাঁর (গভর্নর) প্রস্তাব মেনে নিয়ে গভর্নরের সিদ্ধান্ত পালনে বাধ্য বলেও জানান। (পৃষ্ঠা-১৯৪)

মুক্তি বাহিনীর হাতে চরমভাবে পরাজয় বরণের ব্যাপারে জেনারেল নিয়াজীর সুস্পষ্ট স্বীকারোক্তি পাওয়ার সাথে সাথে গভর্নর ডা: আবদুল মোতালেব মালেক যদি ৭ ডিসেম্বরই বেতার ও টেলিভিশন মারফত সমগ্র জাতির ও বিশ্ববাসীকে আমাদের বিজয়বার্তা জানিয়ে দিতেন তবে বিজয়ের ইতিহাস অন্যরকম হত। ১৯৭৪ সালে ডা: আবদুল মোতালেব মালেকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।

লেখক : জীবন সদস্য-বাংলা একাডেমি; সভাপতি (১৯৭২-৯০)-শেখ মুজিব গণ পাঠাগার (গহিরা, রাউজান, চট্টগ্রাম) ও কলামিস্ট।