বিজয়ী হলে দলের দর্শন, ভাবনা ও রূপরেখার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির ‘কোয়ালিশন সরকার’ গঠন করার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বিএনপির একটা দর্শন আছে। একটা দর্শনের ভিত্তিতে আমাদের দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশকে নিয়ে আমাদের আগামী দিনের পরিকল্পনা আছে। যেটা তারেক রহমান সাহেব বলেছেন, আই হ্যাভ এ প্ল্যান। ম্যানিফেস্টো দেওয়ার সময় সেটা সীমিতভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। একটা পরিকল্পনা আমরা করেছি কিন্তু। আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের কিছু চিন্তা আছে। এই রিজিয়ন নিয়ে চিন্তা আছে। সবকিছু মিলিয়ে দর্শন, ভাবনা ও রূপরেখা আমরা করেছি। এর মধ্যে যারা থাকবে, এটার সাথে সংগতিপূর্ণ থাকে এবং বিএনপি যদি প্রয়োজন মনে করে, কারো সাথে কোয়ালিশন করা দরকার সেটা সময় আসলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গতকাল সোমবার দুপুরে নগরের মেহেদীবাগে নিজ বাসভবনে সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম–১১ এর উন্নয়নের ১১ দফা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে ‘জামায়াত ও বিএনপি দুই দলই বলেছে ঐকমত্যের সরকার গঠন করবে। এখন জামায়াত যদি বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানায় তখন বিএনপি কি যাবে? আবার বিএনপি জামায়াতকে আমন্ত্রণ জানাবে কিনা?’ এমন প্রশ্নে খসরু বলেন, সরকার গঠনের প্রক্রিয়া কী? প্রথমে আপনাকে দর্শনগতভাবে কিছুটা মিল থাকতে হবে। রাইট? দ্বিতীয়ত, আপনার আগামীর কর্মসূচির সাথে একমত হতে হবে। কারণ, আমরা একটা ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি দিয়েছি ৪২ পার্টি মিলে। আমার একটা ৩১ দফা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এটার জন্য। বিএনপির কিছু রাজনৈতিক দর্শন আছে, ভাবনা আছে। তারেক রহমান সাহেবের পরিকল্পনা উনি দেশের সামনে তুলে ধরেছেন। এগুলোর সাথে যারা সংগতিপূর্ণ হবে তখন সেটা আলাপ–আলোচনায় আসতে পারে। যদি সংগতিপূর্ণ হয় তারপর দল এই ব্যাপারে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।
খসরুর ১১ অঙ্গীকার : সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম–১১ আসনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আমীর খসরু তার নির্বাচনী এলাকা ঘিরে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম–১১ আসনের মূল ক্যাম্পেইন থিম ছিল ১১–তে ১১। আমরা জনগণের কাছে ১১টা অঙ্গীকার করেছি, যদি আমরা নির্বাচিত হই এই অঙ্গীকারগুলো পূরণ করব। তিনি বলেন, ১১–তে ১১; এটা আমরা স্লোগান হিসেবে, অঙ্গীকার হিসেবে নিয়ে এসেছি। এটার উপর সাইনও হয়েছে। এটা আমাদের কমিটমেন্ট, এটা স্ট্রং যে, আমরা পুরোপুরি ওপেনলি এই অঙ্গীকারগুলো নিয়ে এসেছি। জনগণকে আমরা বোঝাতে চাচ্ছি, এই কমিটমেন্ট আমরা ফুলফিল করব।
তিনি বলেন, আমাদের ১১টি অঙ্গীকারের পাশাপাশি চট্টগ্রামের যে সার্বিক বাণিজ্যিক রাজধানীর পরিকল্পনা, সেটা তো আছেই। পুরো চট্টগ্রামকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। একটা লজিস্টিক্যাল হাবের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়ন করা হবে। এর সাথে সাথে এখানে পড়াশোনা, ট্যুরিজম, হসপিটালিটি বিজনেস সবকিছু মিলিয়ে চট্টগ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মান যাতে উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান হয় সেদিকে নজর দেওয়া হবে। চট্টগ্রামের জিডিপি বাংলাদেশের জিডিপিতে যাতে বড় একটা অবদান রাখতে পারে এটা আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে।
আমীর খসরু চট্টগ্রাম–১১ সংসদীয় আসন ঘিরে তার ১১টি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। প্রতিশ্রুতিগুলো হচ্ছে : বন্দর–পতেঙ্গা এলাকায় ১ হাজার ২০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ, বেকার তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন, পানীয় জলের ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসনে আধুনিক ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা করা, দীর্ঘমেয়াদি যানজট নিরসন পরিকল্পনা, ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা দূর করে টেকসই সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা, চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেনার জট নিরসনে আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট দফতরের মাধ্যমে বাণিজ্য ও অর্থনীতি গতিশীল করা, নাগরিক সেবায় বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতা দূর করে একীভূত ও ডিজিটাল সেবাব্যবস্থা চালু ও পরিকল্পিত, আধুনিক ও অগ্রগামী নগর হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদী নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।
খসরু তার ১১ দফায় থাকা আইনশৃঙ্খলার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আইনশৃঙ্খলার অবস্থা খুবই খারাপ। আইনশৃঙ্খলা ব্যতীত কিন্তু বিনিয়োগ হবে না, কর্মসংস্থানও হবে না। মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। এজন্য আমরা আইনশৃঙ্খলাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এই অঞ্চলের চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক এগুলোকে সিরিয়াসলি অ্যাড্রেস করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখানে জনগণের সাথে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এককভাবে সমাধান দিতে পারে না। এই কাজটা আমরা যৌথভাবে করতে চাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণকে একসাথে আইনশৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত করে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।
বন্দর নিয়ে যা বললেন : আমীর খসরু তার প্রতিশ্রুত বন্দরব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নের যে সম্ভাবনা তার মধ্যে বন্দর হচ্ছে একটা বড় অংশ। বন্দরকে আধুনিকায়ন শুধু নয়, আমরা বন্দরকে নিয়ে, এই উপকূলীয় অঞ্চলকে নিয়ে চট্টগ্রামকে একটি লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলব। লজিস্টিক হাব বলতে যা বোঝায়, এটা শুধু চট্টগ্রামের জন্য না, বাংলাদেশের জন্য না, আশেপাশের সব দেশকে নিয়ে। তারাও যাতে ব্যবহার করতে পারে এই লজিস্টিক হাব। এর মাধ্যমে আসলে চট্টগ্রামের বড় ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে। চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টকে নিয়ে আমাদের চিন্তা আছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আমীর খসরু বলেন, একটা দেশের উন্নয়নের জন্য বন্দরের এফিসিয়েন্ট অপারেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশিরা যখন বাংলাদেশে আসে তখন প্রথম প্রশ্ন করে, আপনার বন্দরে টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম, ডেলিভারি টাইম কত? অ্যাফিসিয়েন্সি কী? এটার উপর নির্ভর করে তারা এখানে বিনিয়োগ করে। সুতরাং আগামী দিনের বন্দরের এফিসিয়েন্সি, টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম, ডেলিভারি টাইম, কস্ট সবকিছু মিলিয়ে বন্দরকে ওই জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে দ্যা গ্লোবাল বেস্ট প্রাকটিসেস আছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বন্দর পরিচালনাকারীদের উদাহরণ নিলে এগিয়ে যাওয়া যাবে। গ্লোবাল বেস্ট প্র্যাকটিস যেটা আছে সেটাকে নিয়ে চট্টগ্রামকে লজিস্টিক্যাল হাব করতে হলে এফিসিয়েন্সি বাড়াতে হবে। না হলে এখানে মানুষ কেন আসবে? সার্ভিস নেবে কেন? সুতরাং আপনাকে এফিসিয়েন্ট হতে হবে, সার্ভিস দিতে হবে, কম্পিটেটিভ হতে হবে। সেটাই আমাদের লক্ষ্য হবে।
অনেকে নির্বাচন চায়নি : এক প্রশ্নের জবাবে খসরু বলেন, পত্র–পত্রিকায় ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যে বিষয়গুলো উঠে আসছে, কেউ সিল বানাচ্ছে, ব্যালট পেপার বানাচ্ছে, বোরকা বানাচ্ছে, এনআইডি কার্ড দিয়ে যাচ্ছে, বিকাশ করার জন্য টেলিফোন নাম্বার দিচ্ছে; এইগুলোকে মাথায় রেখে আমাদেরকে সাবধান হতে হবে। কারণ বিএনপির রাজনীতি হতে জনগণের আস্থা রাজনীতি। বিএনপির সৃষ্টি হয়েছে একদলীয় শাসক থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে। সংসদীয় গণতন্ত্রসহ একটি দল জন্ম থেকে আজ অবধি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে গণতন্ত্রের জন্য, সেটা হচ্ছে বিএনপি। একদিনের জন্য ও এক মুহূর্তের যেন আপোস করে নাই। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী দিনে গণতন্ত্রকে ও গণতান্ত্রিক অর্ডারকে ফিরিয়ে আনা হবে। গণতন্ত্রের বাহক হচ্ছে নির্বাচন। যদি গণতন্ত্রের বাহককে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ কেউ করতে চায় সেখানে আমাদেরকে সজাগ থাকতে। শুধু রাজনীতিবিদ না, সাংবাদিক, নাগরিক ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সজাগ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, অনেকে তো নির্বাচন চায় নাই। নির্বাচনের উপর আস্থাই নেই। অর্থাৎ জনগণের উপর আস্থা না থাকলে যা হয়। এখন আবার নির্বাচনে গিয়ে এই ধরনের কথাগুলো আমরা শুনতে পাচ্ছি। এগুলো তো ভালো লক্ষণ না। এগুলোর মাধ্যমে যে তারা কিছু করতে পারবে সেটা না। কিন্তু এই যে জনগণের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ খুবই সজাগ। আমি নিশ্চিত তারা ১২ তারিখ ভোটকেন্দ্রে যাবে ও তাদের ভোট প্রয়োগ করবে এবং কারসাজি করার যে কথাগুলো উঠে আসছে এদের জন্য কোনো জায়গা দেওয়া যাবে না। যারা এসবের মাধ্যমে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ, মুক্তিকামী মানুষ তাদেরকে কোনোদিন গ্রহণ করবে না–এটা আমি বিশ্বাস করি।
‘হ্যাঁ’ না ভোট নিয়ে বিএনপির অবস্থান প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে খসরু বলেন, তারেক রহমান সাহেব বলেছেন। বিএনপির বক্তব্য তো দিয়েই দিয়েছেন। এখানে কোনো ফাঁকফোকর রাখা হচ্ছে না। আপনি বিভিন্ন ধরনের ছুতো তোলে, কখনো এটা, কখনো সেটা বলে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বাধাগ্রস্ত করার কেনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে উৎসবমুখরভাবে নেমেছে, তারা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে চায়। তারা তাদের নির্বাচিত সংসদ দেখতে চায়, যে সরকার তাদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে ও জবাবদিহি থাকবে–এ কথা প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছি। এখানে বিভিন্ন ধরনের ছুতো তোলে, বিভিন্ন ধরনের ম্যানিপুলেশন করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ নেই।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম, দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ–কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু, নগর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল আলম, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম চট্টগ্রামের সদস্য সচিব কামরুল ইসলাম সাজ্জাদ প্রমুখ।












