(হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ)

ড. গৌরী ভট্টাচার্য্য

মঙ্গলবার , ৬ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ
29

বাংলাদেশের স্বাদেশিকতা এবং রাজনৈতিক চেতনার গোড়া থেকেই রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। পরাধীনতার দুঃখ-কষ্টে মানুষের জীবন যখন অবর্ণনীয় দুর্ভোগের যন্ত্রণায় হতাশাগ্রস্ত তখন রবীন্দ্রনাথের গান মানুষের মনে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছে,প্রাণে আশার আলো জাগিয়েছে। ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথের গানে যে স্বাদেশিকতার জোয়ার এসেছিল সেই জোয়ার ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭২ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালিকে দ্বিগুণ উৎসাহিত করেছে। রবীন্দ্রনাথের গান তাই আমাদের জাতীয় সম্পদ। রবীন্দ্রনাথের গান বিশ্লেষণ করলে প্রার্থনা সংগীত, রাগ সংগীত, লৌকিক ও প্রাদেশিক সুরের গান, স্বদেশ প্রেমের গান, পাশ্চাত্য সুরের গান সবই আমরা লক্ষ করি। স্বদেশ প্রেম বা স্বদেশ চেতনার ঐতিহ্য নানাভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আশা পোষণ করি আধ্যাত্মিক প্রেম, স্বদেশ প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, মানবিক প্রেম, এবং সত্যানুরাগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে বিশাল গানের ভাণ্ডার আছে তা আমাদের দেশকে, দেশবাসীকে পুনর্বার জাগিয়ে সুস্থ সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। বিশ্বমানবতার আশা অনুরাগের বাণী এই গানে। কেউ জেগে উঠতে পারে আধ্যাত্মিক চেতনার গানে,কেউ বা উদ্দীপ্ত হতে পারে স্বদেশ চেতনার গানে আবার কেউ প্রকৃতি প্রেমের গানে উদ্বেলিত হতে পারে আবার কেউ মানবীয় প্রেমের বিচ্ছেদ মিলনের দ্যোতনায় মধুস্বাদী হয়ে উঠতে পারে এই গানের চর্চার মাধ্যমে। আমাদের সংস্কৃতি চর্চা ক্রমশ কখনো গতানুগতিকতায় আর স্থির জড়ত্বে একঘেঁয়ে হয়ে যায়, কখনো অস্থিরতার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসায়ে স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে আমাদের ঐতিহ্য ও স্বদেশ চেতনা কতকটা ক্ষীয়মান। এই জন্য প্রয়োজন আমাদের সঠিক সংস্কৃতি চর্চা ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালিকে সুখে -দুঃখে, হাসি -কান্নায় গাইতেই হবে।
রবীন্দ্রনাথের গানের ভাবদর্শন, সুর বৈচিত্র্য এবং পরিমিতিবোধে তাঁর গান অবিনাশী গানে পরিণত হয়েছে। “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”। এটি একটি দেশমাতৃকার বন্দনা সংগীত, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। স্বাধীনতা যুদ্ধে এই গানটি প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ে নব চেতনার জন্ম দিয়েছিলো,দেশমাতাকে শত্রু মুক্ত করার লক্ষ্যে জীবন পণ সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। বাঙালি জীবনের সেই মহা বিপর্যয়ের দিনে এই গান ছিলো নব জাগরণের সাথী। কারো ধ্বনিত হয়েছে কন্ঠে কারো ধ্বনিত হয়েছে হৃদয়ে। চরম দুঃখেও বাঙালি সান্ত্বনা পেয়েছে-এই গানের বাণী উচ্চারণ করে। এক মুহূর্তের জন্যও বাঙালি ভুলতে পারেনি এই গানের কথা। এমন শান্ত স্নেহ মাখা সুরের ভিতর যে কতো তেজোদ্দীপ্ত অভয়বাণী স্থান করে নিয়েছে তা সেই সময়কার সকল বাঙালি উপলব্ধি করেছে। তাই রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের সংস্কৃতির উন্নতি সাধিত করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি কাব্য গ্রন্থের মাধ্যমে যেমন আমরা বিশ্বে নিজেদের পরিচিতি অর্জন করেছি, ঠিক তেমনি রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ে ধারণ করে চর্চার মাধ্যমেও নিজেদের উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করতে পারবো। অতএব আমাদেরকে দ্বিধাহীন চিত্তে সংস্কৃতির অগ্রগতি সাধনের জন্যে রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে চলতে হবে।

x