হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৮:২২ পূর্বাহ্ণ
28

জেনেভা আন্তর্জাতিক সম্মেলন: নিরাপত্তা ও পরিবেশ ধ্বংসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প ২

জেনেভা সম্মেলনে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্যে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই চিত্রটাই তুলে ধরেছিলেন ঢাকা থেকে আসা বিশিষ্ট মানবাধিকার নেতা, লেখক ও চিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবির। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, স্থানীয় বাংলাদেশি মহিলারা এখন বাড়ির বাইরে যেতে রীতিমত ভয় পায়। বেশ কিছু স্থানীয় মহিলা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের হাতে ইতোমধ্যে লাঞ্ছিত ও ধর্ষিত হবার ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে শাহরিয়ার কবীর বলেন, রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ স্থানীয় অনেকের জায়গা জোরজবরদস্তি নিজেদের দখলে নিয়েছে। তাদের গৃহপালিত পশু, শাক-সবজি ছিনিয়ে নিচ্ছে, চুরি করছে। প্রতিবাদ করতে গেলে মার খাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করার সাহস রাখে না স্থানীয়রা। লেখক শাহরিয়ার কবীরের মুখে এই বর্ণনা শুনে চমকে উঠি। কী ভয়ংকর ব্যাপার! কী পরিমাণ বেপরোয়া ও ভয়ংকর হলে ভিন দেশে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় নিয়ে সেই দেশের মহিলাদের উপর অত্যাচার করতে পারে তা এই সমস্ত ঘটনা থেকে আঁচ করা যায়। শাহরিয়ার কবির আরো জানান, এই সমস্ত রোহিঙ্গারা হাতে লাঠি-সোটা নিয়ে প্রকাশ্যে চলাফেরা করে, আইনের প্রতি তাদের কোন শ্রদ্ধা বা ভয় আছে বলে মনে হয় না। কঙবাজারের যে এলাকায় এদের বসবাস সেখানে তারা এখন সংখ্যাগুরু। স্থানীয় বাসিন্দারা হয়ে পড়েছে সংখ্যালঘু। ফলে তারা যা খুশি করে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন দেশ থেকে জেনেভা সম্মেলনে আসা এই মানবাধিকার নেতা। মনে পরে বছর কয়েক আগেকার কথা। তখন মায়ানমার ছেড়ে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে আসা শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এমন কী গোটা বাংলাদেশ তাদের দু-বাহু বাড়িয়ে গ্রহণ করে। জামাই আদরে সব ধরনের সাহায্য সেবা দেয়া শুরু করে, এমন কী নিজ ঘরের পোশাক-আশাক, গৃহস্থালি সরঞ্জাম থেকে শুরু করে চাল-ডাল ইত্যাদি। তখনও দাতা সংস্থাগুলো এগিয়ে আসেনি, সবে আসতে শুরু করেছে। সে সময় রোহিঙ্গাদের মধ্যে ‘আরসার’ সদস্য এবং সন্ত্রাসী ঢুকে পড়েছে বলে পত্র-পত্রিকায় কিছু সংবাদ বেরোয়। কেউ কেউ এই বলে আশংকা প্রকাশ করে যে এই বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের জন্যে একটা সময় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। সেই সময় হল্যান্ডের এক দাতা সংস্থার সাথে আমাদের এক মিটিংয়ে এই আশংকা নিয়ে ডাচ সংস্থার কর্মকর্তা, বব ডিলেন জানতে চেয়েছিলেন, আসলে কি রোহিঙ্গাদের মাঝে সন্ত্রাসী লুকিয়ে আছে? আমার সাথে ছিলেন আমারই এক বাংলাদেশি সহকর্মী। যখন বললাম, সে সম্ভাবনা শতভাগ, তখন সেই সহকর্মী দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। মাথা নেড়ে বলেছিলেন, না। আমি আশংকা প্রকাশ করেছিলাম পূর্ব অভিজ্ঞতা ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে। কেননা বর্তমানে বাংলাদেশে যে অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ, তেমনটি ঘটিয়েছিল সিরিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইরাক থেকে যুদ্ধের কারণে ইউরোপ আসা কিছু শরণার্থী, বিশেষ করে তরুণ শরণার্থীরা। জার্মানি, হল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে এরা ইউরোপীয় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করেছে, কয়েক জায়গায় ধর্ষণ করেছে। জার্মানির কোলন শহরে নতুন বছর উদযাপন অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকটি জার্মান মেয়ে এদের হাতে লাঞ্ছিত ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ইউরোপের বিভিন্ন শহরে যে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটিয়েছে সে তো আমরা পরবর্তীতে দেখেছি। এই সমস্ত ঘটনার কারণে গোটা ইউরোপ-আমেরিকায় এন্টি-শরণার্থী সেন্টিমেন্ট যে দিন দিন বেড়ে উঠেছে সে বলা বাহুল্য।
বিপদে মানুষ মানুষকে আশ্রয় দেয়। এমন কী পশুও বিপদে পড়লে মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না। বন্যায় ভেসে যাওয়া ভেলায় আমরা দেখেছি মানুষ আর সাপের সহবাস। অবশ্য ইদানীং বাংলাদেশে অনেক মানুষরূপী পশু যে কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে তা পশুত্বকে হার মানিয়েছে এবং সময় এসেছে, অন্ততঃ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, পশুত্বের সংজ্ঞার পরিবর্তন আনার। একটা সময় ছিল এই খুনাখুনির ঘটনা অশিক্ষিতদের মাঝেই ছিল সীমিত। চর দখল ঘিরে হতো লাঠিসোটা নিয়ে মারামারি, হানাহানি। এখন আক্রমণের স্টাইল বদলেছে। এখন রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন শহর পরিণত হয়েছে চরে। এখন এই হানাহানি সংক্রামকহারে বেড়েছে তথাকথিত শিক্ষিতদের মাঝেও, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ছাত্র নামধারী খুনিরা রাজনীতির নামে যেভাবে প্রকাশ্যে ছুরি, রামদা, পিস্তল হাতে দৌড়িয়ে প্রতিপক্ষকে কুপিয়ে, পিটিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে তাতে যদি পশুরা টের পেত তাহলে তারাও লজ্জ্বা পেত। পশুরাও বোধকরি এমন নিষ্ঠুর ভাবে তার সমগোত্রীয়ের দিকে ধেয়ে যায় না। ফিরে আসি রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ পরম উদারতায় আশ্রয় দিয়েছিল দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সে জন্য গোটা বিশ্ব অভিনন্দন জানিয়েছিল। কিন্তু তার যে ফল এখন গোটা দেশকে ভোগ করতে হবে তা বোধকরি আমাদের অনেকেই অনুমান করতে পারেনি। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে পুরানো সতীর্থ, বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূতপূর্ব পরিচালক শফিকুল আলম খান তার ক্ষোভের কথা জানালেন। হোয়াটস আপে লিখে জানালেন, ”রোহিঙ্গারা পরিবেশের জন্যে মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেদারছে পাহাড়, জঙ্গল কেটে ঘর বাড়ি বানিয়ে তারা বন্যা পশু ও জীবজন্তুদের জন্যে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করেছে”। শফিকুল আলম আরো লিখেছেন, ‘তাদের কেউ কেউ সন্ত্রাসী, জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সংবাদ বেরিয়েছে। ভাষাগত সুবিধায় তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। দালালদের মাধ্যমে ছদ্মনামে বাংলাদেশি পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে এবং সেখানে তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করছে’। যে বিষয়টি অত্যন্ত আশংকাজনক বলে শফিকুল আলম খান মনে করেন তা হলো, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়বে । তার মতে, রোহিঙ্গারা কোনোদিন ফিরে যাবে না। এরা এদেশে আছে তার ভাষায়, ‘জামাই আদরে’। তাদের খাবারের অভাব নেই, নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে কোন কাজকর্ম না করে। তাদের কাজই হচ্ছে এদিক-ওদিক ঘুরাঘুরি করা, এর-ওর জিনিস কেড়ে নেয়া আর বিভিন্ন এনজিওর কাছে রিলিফের জন্য ধর্ণা দেয়া। তাদের সাহায্য করার জন্যে বিদেশী সাহায্য সংস্থাগুলো তাদের দরজা খুলে রেখেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি এনজিওর সাথে যোগ দিয়েছে দেশীয় এনজিওগুলো। তারাও চায় না রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক। কেননা এই শরণার্থীর কারণে তাদের অনেকের ‘কপাল’ আক্ষরিক অর্থে খুলে গেছে। আমার পরিচিত এক এনজিও মালিক বছর কয়েক আগে বলেছিলেন, ‘চলে আসুন, কক্সবাজারে, এখানে টাকা উড়ছে’। তার মত অনেক দেশি এনজিওর ‘কপাল’ খুলে গেছে। বন্ধু শফিকুল আলম ছবি পাঠিয়ে জানালেন, ‘চট্টগ্রামের বাজারে এখন অহরহ বিদেশি সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে, অনেকটা কম মূল্যে। সব রিলিফের মাল। এই কদিন আগে মসজিদ থেকে বের হতেই দেখি একজন বিক্রি করছে আমেরিকায় তৈরি প্যাকেট খাবার। খুবই ভালো’। তিনি নিজেও ৯০ টাকা দিয়ে ইউ এস এইডের ‘চেরিলাক’ প্যাকেট কেনেন। শফিকুল আলম খান থাকেন লালখান বাজার এলাকায় তার নিজ বাড়িতে। দৈনিক আজাদীতেও মাঝে মধ্যে লেখেন। এক সময় একসাথে ডেইলি লাইফে সাংবাদিকতা করেছি। কেবল শফিকুল আলম নয়। একই অভিযোগ আর এক ধর্মপ্রাণ, প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ, এম এম মুর্শেদের, থাকেন বেলজিয়াম। একই অভিযোগ তারও। জেনেভার মত নানা সম্মেলনে মাঝেমধ্যে দেখা হয় তার সাথে।তিনিও এসেছিলেন জেনেভায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সেক্যুলার ফোরামের সম্মেলনে যোগ দিতে। আগের সংখ্যায় লিখেছিলাম জেনেভাস্থ মানবাধিকার কর্মী খলিলুর রহমানের কথা, যিনি নিজ গাটের পয়সা খরচ করে দেশ ও সমাজের কাজ করে বেড়ান। তাদেরই দলে এই বিনয়ী তরুণ এম এম মুর্শেদ। তার সহোদর বাংলাদেশের ক্ষমতাধর মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি। অনেক তো দেখেছি। অন্য কেউ হলে ভাইয়ের নাম বিক্রি করে খেত। স্নেহভাজন মুর্শেদকে দেখলাম তার ব্যতিক্রম।
এখন কথা হলো, বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেয়া এই সমস্যার কি কোন সুরাহা নেই। সম্ভাবনা যে কম সে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের ফেরার মত পরিবেশ মায়ানমার এখনো সৃষ্টি করেনি। অন্যদিকে ভারত ও চীন থেকে তেমন কোন চাপ দেয়া হচ্ছে বলেও মায়ানমারের কার্যকলাপে ঠাহর হচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ ফিরে যেতে চায়। কিন্তু তাদের বাধা দেয়া হচ্ছে। যারা ফিরে যেতে চায় তাদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে ক্যাম্পের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। অন্যদিকে আছে দেশি-বিদেশি এনজিও ও সংস্থাগুলো। তারাও চায় না এরা ফিরে যাক। তাহলে তাদের শফিকুল আলম খানের ভাষায় ‘রাজার হালে’ থাকা-খাওয়া, চলাফেরা, উপার্জন সবই তো যাবে বন্ধ হয়ে। দিন যত যাচ্ছে ততই পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা আশংকাজনক হারে রোহিঙ্গাদের মাঝে জনসংখ্যা বাড়ছে। মূল শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এরা বাইরে। এদের কর্মসংস্থান নেই। করার কিছু নেই। আর এই সুযোগগুলো নিচ্ছে ধর্মীয় উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। অন্যদিকে আছে খোদ শরণার্থী শিবিরের মধ্যেই এক শ্রেণীর নেতৃত্ব, যারা চায় না শরণার্থীরা নিজ দেশে ফিরে যাক। আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি ও পাকিস্তান-ঘেঁষা এনজিওর সক্রিয় আনাগোনা, কার্যকলাপ। নিজ ভূমি থেকে তাড়িত রোহিঙ্গারা এখন অনেকটা মরিয়া, বাঁচার কারণে, জীবনের কারণে। আর তাদের এই ভঙ্গুর দশায় তাদেরকে ভিন্নপথে চালিত করতে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এবং পাকিস্তান তো চাইবেই তাদের নিজ লক্ষ্য হাসিলের কারণে ব্যবহার করার জন্যে। অনেকের আশংকা এদের ‘রেডিক্যালাইজড’ করা হচ্ছে। এই আশংকার কথা প্রকাশ করে লেখক, নির্মাতা শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এদের অনেকেই বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। এদের অনেকেই জড়িয়ে পড়েছে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে এবং এরা একটা সময় সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটাবে বাংলাদেশের বাইরে, ইউরোপ আমেরিকায়। আর সেই জন্যে বিশ্বকে এগিয়ে আসতে হবে এই সমস্যা সমাধানে এবং তা খুব শীঘ্র, বলেন শাহরিয়ার কবির।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক

x