হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ১৪ মে, ২০২২ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

ইউক্রেন পরিস্থিতি কি ‘কিউবা মিসাইল সংকটের’ দিকে এগুচ্ছে?

লিওনিদ কারাভচুক। ইউক্রেনের প্রথম প্রেসিডেন্ট। ইউক্রেন যদিও বা তার কাছে অনেক ঋণী, তারপরও ইউক্রেনের বর্তমান দুর্বল সামরিক শক্তির জন্যে অনেকে তাকে দায়ী করেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পৃথক হয়ে ইউক্রেন যখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে তখন ইউক্রেনে ছিল বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রাগার, যা বিশ্বের তৃতীয় স্থানে। লিওনিদ কারাভচুকের এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে ১৯৯০ এর গোড়ার দিকে তার দেশ (ইউক্রেন) সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সেই বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রাগার পরিত্যাগ করেন, যা তার সব চাইতে বড় ভুল হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। তার কাছে ইউক্রেন ও ইউক্রেনের জনগণ ঋণী এই কারণে তিনি তার দেশকে মস্কো থেকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাকে পারমাণবিক অস্ত্রাগার পরিত্যাগের সিদ্ধান্তের কারণে সমভাবে দোষারূপ করেন। তারা মনে করেন, আজ যদি ইউক্রেনের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার থাকতো তাহলে রাশিয়া ও পুতিন কিছুতেই সাহস পেতেন না ইউক্রেন আক্রমণ করতে। পুতিন সাহস পেতেন না অন্যায়ভাবে ক্রিমিয়া নিজ দখলে নিতে। প্রশ্ন লিওনিদ কারাভচুক কেন এই কর্মটি, যা তার দেশকে সামরিক শক্তিতে দুর্বল করে দেবে জেনেও করেছিলেন। তার পেছনে কয়েকটি যুক্তি ছিল। এক, সদ্য স্বাধীন দেশ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। দুই, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলির চাপ সহ্য করার মত অবস্থা তখন ইউক্রেনের ছিলনা। জার্মান মিডিয়া ডয়েচ ভেলীর সাথে এক সাক্ষাৎকারে কারাভচুক তার সদ্য স্বাধীন দেশকে ‘মাংকি উইথ এ গ্রেনেড’ বা ‘গ্রেনেড সহ বানর’-এর সাথে তুলনা করে বলেছিলেন, বিশাল পারমাণবিক অস্ত্র ভান্ডারের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং এর দায়িত্ব কিভের পক্ষে ছিল অনেক বেশি। সেই জন্যে পারমাণবিক বোতামটি রয়ে গেছে মস্কোতে। এ ছাড়াও আরো যে কারণে তিনি এই কাজটি করেছিলেন তা হলো, রাশিয়া যে পরবর্তীতে কোন এক সময় ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে এবং ইউক্রেনের রাজ্য দখল করে নেবে তেমন চিন্তা-ভাবনা সে সময় কারো ছিলনা। দেশের কল্যাণে কারাভচুক ভালো করেছিলেন সন্দেহ নেই, কিন্তু বড় ভুল যেটি তিনি করেছিলেন তা হলো, সে সময় তার ইউক্রেনের জন্যে আরো ভালো নিরাপত্তার গ্যারান্টি নিয়ে দেন-দরবার করা দরকার ছিল।

স্মর্তব্য, ১৯৯১ সালে প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভের বিরুদ্ধে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হবার পর সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিত হয়। লিওনিদ কারাভচুক তখন সবে বছর খানেক আগে ইউক্রেন পার্লামেন্টের চেয়ারম্যান পদে আসীন। ১৯৯১ সালের ২৪ আগস্ট তার নেতৃত্বে স্বাধীনতার পক্ষে ইউক্রেন পার্লামেন্ট ভোট দেয় এবং এর তিন মাস পর ১লা ডিসেম্বর এক গণভোটের মধ্যে দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হয়। ঐ দিনই লিওনিদ কারাভচুক ইউক্রেনের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার এক সপ্তাহ পর তিনি, রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়ালৎসিন এবং বেলারুশ সংসদীয় নেতা স্তানিস্লাভ সুসকেভিচ এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন যার মধ্যে দিয়ে বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। ক্ষমতার জন্যে লালায়িত ছিলেন ইয়ালৎসিন এবং তিনিই যে এই চুক্তির পেছনে মূল ইন্ধনদাতা তাতে কোন সন্দেহ নেই। ইউক্রেন যদি সে সময়ে জড়িত না হতো তাহলে ইতিহাস হয়তো ভিন্ন দিকে মোড় নিতো।

ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল লিওনিদ কারাভচুকের। তিনি ছিলেন মধ্যপন্থী, রাষ্ট্রনায়কোচিত এবং একজন আপোষকারী ব্যক্তি, যিনি পশ্চিম-ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদি ও পূর্বে প্রো-রাশিয়ান কমিউনিস্ট উভয়ের কাছে গ্রহণীয় ছিলেন। মোট ৫২ মিলিয়ন জনগণ নিয়ে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ইউক্রেন। এর শুরুটা খুব একটা সহজ ছিল না। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতি, একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ ছিল কষ্টকর। কিছুদিনের মধ্যেই দেশের অর্থনীতি খারাপের দিকে এগোতে থাকে। তা সত্বেও লিওনিদ কারাভচুক দেশে শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিরতা স্থাপনে সক্ষম হন। অথচ সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা অন্যান্য দেশগুলিতে গৃহযুদ্ধ লেগে ছিল। এক সময় জনমত তার বিরুদ্ধে চলে যায় এবং ১৯৯৪ সালে আগ-বাড়িয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি তার প্রধানমন্ত্রী লিওনিদ কুচমার কাছে হেরে যান। এটিও ছিল একটি নূতন ও গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা- ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর, যা অনেক প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের কাছে ইউক্রেন ছিল ঈর্ষার কারণ। নিঃসন্দেহে এটি লিওনিদ কারাভচুকের জন্যে ছিল বড় অর্জন। ইউক্রেন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে টিকে গেল।

২. আজ ইউক্রেনের পারমাণবিক শক্তি থাকলে পরিস্থিতি কেমন হতো তা ভেবে কোন লাভ নেই। দেখার প্রয়োজন বর্তমান পরিস্থিতি এবং এর থেকে পরিত্রান কী, আদৌ সম্ভব কিনা সেটি ? বলা বাহুল্য, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্‌লাদিমির পুতিন এখন প্রায় কোণঠাঁসা অবস্থায় আছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপীয় দেশ এবং জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা থেকে শুরু করে গোটা উন্নত বিশ্ব এককাট্টা হয়ে পুতিনকে ঠেলতে ঠেলতে এক কোণায় নিয়ে গেছেন। পুতিন এখন বিশ্ব নেতা থেকে ভিলেন। এখন বলা চলে পুতিনের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তিনি কেন, কেউ ভাবতে পারেনি ইউক্রেনের পক্ষে চীন সহ দু-একটি ছোটখাটো দেশ ছাড়া গোটা বিশ্ব এমন এক হয়ে কাজ করবে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে পুতিনের প্রয়োজন, মোটামুটি একটি ‘ফেইস-সেভিং এক্সিট’, যাতে মুখ রক্ষা করে বেরিয়ে আসা যায়। কিন্তু সেটিও যে সহজ হবে তেমনটি মনে হয়না। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে নুতন করে ৪০ বিলিয়ন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেবার ঘোষণা দিয়েছে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে। আরো অনেক নিরীহ ইউক্রেনবাসী মারা যাবে। ঘর-দেশ ছাড়া হবে। রাশিয়ার আশপাশ ইউরোপীয় দেশগুলি রাশিয়ার আগ্রাসনের ভয়ে রয়েছে। তাদের আশংকা যে কোন সময় রাশিয়া যে কোন ছুঁতোয় তাদের দেশ আক্রমণ করতে পারে। ইতিমধ্যে রাশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোয় যোগ দেবার জন্যে দিন কয়েকের মধ্যে আবেদন করবে বলে জানা যায়। অথচ এই দেশ দুটি এক সময় ছিল নিরপেক্ষ। রাশিয়া এর বিরোধিতা করে বলছে এর অর্থ পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করা। কিন্তু এর জন্য দায়ী পুতিন স্বয়ং। কেননা সুইডেন বিগত ২০০ বছর ধরে ছিল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে পরাজয়ের পর ফিনল্যান্ড নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে আসছিল। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণের পর পুতিন মূলতঃ উত্তর-ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে ভেঙে দিয়েছেন। ফলে এই সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলি অনিরাপত্তায় ভুগতে শুরু করে। এক বছর আগেও ন্যাটোয় যোগ দেবার পক্ষে ছিলেন মাত্র ২০-২৫% ফিনিশ নাগরিক। পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের পর এই সংখ্যা বেড়ে গিয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭৬%। অন্যদিকে সুইডেনের ৫৭% জনগণ ন্যাটোয় যোগ দেবার পক্ষে যা কিছুদিন আগেও ছিল অনেক কম। ফিনল্যান্ডের প্রাক্তন প্রধান মন্ত্রী আলেকজান্ডার স্টাবের মতে, ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণের পর ন্যাটো জোটে যোগ দেয়া জরুরি হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সুইডিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেন, এই আগ্রাসনের মধ্যে দিয়ে পুতিন নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি একজন ‘আনপ্রেডিক্টেবল’, ‘অবিশ্বস্ত’ ব্যক্তি যিনি নিষ্ঠুর, রক্তাক্ত ও নৃশংস যুদ্ধ চালানোর জন্য প্রস্তুত। মজার ব্যাপার, গেল নভেম্বরে তিনি বলেছিলেন, সুইডেন কখনো ন্যাটোয় যোগ দেবেনা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি, যে পরিস্থিতির জন্যে কেবল পুতিন দায়ী, বাধ্য করছে এতদিন ধরে নিরপেক্ষ-থাকা ইউরোপীয় দেশগুলিকে একে একে ন্যাটোয় যোগ দিতে। এতেই প্রতীয়মান হয়, পুতিনের উচ্চাভিলাষ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যের হৃত সম্মান, ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন গোটা ইউরোপকে এমন কী বিশ্বকে কী অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

৩. আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দুটি লক্ষ্য। এক, আত্মরক্ষা করার জন্যে ইউক্রেনকে সাহায্য দেয়া এবং দুই, পুতিনের সাথে সরাসরি বাড়াবাড়িতে না যাওয়া যাতে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে গড়ানোর সম্ভাবনা থাকতে পারে। পশ্চিমের এককাট্টা হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, পুতিনের যুদ্ধ বিজয়ের ক্ষীণ সম্ভাবনা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অভাব- সব মিলিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে একটি বিপদজ্জনক কোণায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছে সে কথা আগেই উল্লেখ করেছি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারো কারো মতে, এমন কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা উচিত নয় যাতে মুখ রক্ষায় পুতিনকে ভয়ানক কোন পদক্ষেপের দিকে যেতে বাধ্য করে। ভয়ানক পরিস্থিতি বলতে যে তারা পারমাণবিক যুদ্ধের কথা বলছেন তা বলা বাহুল্য। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি মোটামুটি ‘সম্মানজনক উপায়’ খুঁজে পাবার লক্ষ্যে বাইরের কাউকে পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমনটি করেছিলেন জন এফ কেনেডী আজ থেকে ৬০ বছর আগে। কিউবান মিসাইল সংকটের কথা আমাদের মনে আছে। ১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইতালি ও তুরস্কে জুপিটার ব্যালাস্টিক মিসাইল স্থাপন করলে, পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় ব্যালিস্টিক মিসাইল স্থাপন করে। যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় পারমাণবিক যুদ্ধের মুখোমুখি। গোটা বিশ্ব উত্তেজনা ও নিরাপত্তায় ভুগছে। এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে সে সময় ‘উপায়’ বের করা হয়েছিল আলোচনার মধ্যে দিয়ে, এমন একটা উপায় যাতে সবার মুখ রক্ষা পায়, অনেকটা ‘সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে’-র মত। ইউক্রেনকে ঘিরে দিনদিন পরিস্থিতি যেদিকে এগুচ্ছে, ভয় হয় না জানি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া- এই দুই বৃহৎ পারমাণবিক শক্তি আবার কিউবান মিসাইল সংকটের দিকে এগোয়। আশা করি পুতিনের বোধোদয় হবে এবং তা যত তাড়াতাড়ি হয় বিশ্ব শান্তির জন্য তত মঙ্গল।

লেখক : সাহিত্যিক, কলামিস্ট