হজ মহান আল্লাহর আনুগত্যের স্বীকৃতি

ড. আ. ম. কাজী মুহাম্মদ হারুন উর রশীদ | সোমবার , ২০ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ

মাহে রমজানের বিদায়ের পরপরই সমগ্র বিশ্বের সামর্থ্যবান মুসলিমগণের আরেকটি মহান ইবাদত হচ্ছে হজ। হজ মুসলিমদের মনে আল্লাহর আনুগত্যের স্বীকৃতি, হৃদয়ের পবিত্রতা, ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক জীবনের চরম উন্নতি সাধনের দ্বারা অন্তরে আখিরাতে সুখের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এখন বিশ্বের নানাপ্রান্ত থেকে সকল রং, বর্ণ, ভাষা ও ভৌগলিকতার সমস্ত আবরণ ছিন্নকরে দ্বীনি চেতনায় শোভিত হয়ে পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে সমস্ত মানুষের মুখে মধুর কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে– ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বইকা লাশরিকা লাকা লাব্বাইক ; ইন্নাল হাম্‌দা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক্‌ লাশরিকা লাক্‌।’ অর্থাৎ আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিয়ামত আপনারই। আর সকল সাম্রাজ্যও আপনার। আপনার কোন শরিক নেই। লাখো লাখো মানুষের এ মুহুর্মুহু তালবিয়ায় মুখরিত হয়ে ওঠে পবিত্র কা’বা শরিফ।

হজের ফরজ তিনটি। ১. হজের উদ্দেশে ইহরাম পরা ২. ৯ জিলহজ দুপুর থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। ৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা। এভাবে হজের ওয়াজিবও রয়েছে। ১. সাফামারওয়া সায়ি করা। ২. মুজদালাফায় রাতযাপন করা। ৩. শয়তানকে পাথর মারা। ৪. কুরবানি করা। ৫. মাথা মুড়িয়ে ফেলা। তবে মহিলাদের জন্যে চুলের কিছু অংশ কেটে ফেলতে হবে। ৬. বিদায়ী তাওয়াফ করা।

পবিত্র হজ সম্পন্ন করতে সাধারণত পাঁচ দিন সময় লাগে। অনুষ্ঠান শুরু হয় ৮ জিলহজ থেকে এবং শেষ হয় ১২ জিলহজ। ৮ জিলহজ যোহরের আগেই হজযাত্রীগণ মক্কা থেকে ৫ কি.মি পূর্ব দক্ষিণে মিনা প্রান্তরে সমবেত হতে হয় এবং সেখানে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং ৯ জিলহজ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হয়। ৯ জিলহজ ফজরের নামাজ মিনায় পড়ে রওয়ানা দিতে হয়। বিশাল প্রান্তর আরাফাতের ময়দান অভিমুখে। সকলের মুখেলাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক; ইন্নাল হামদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক্‌, লাশারীকা লাক্‌। ধর্মপ্রাণ লাখো মানুষের আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে কেঁপে ওঠে আরাফাত ময়দান। ৯ জিলহজ দুপুর ১২ টার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাত ময়দানে (ওকুফে আরাফা) অবস্থান করতে হয়। এটি হজের প্রধান রুকন এবং সেখানে জোহরের ও আসরের নামাজ আউয়াল ওয়াক্তে এক আযান দুই ইকামতে আদায় করতে হয়। আরাফা দোয়া কবুলের অন্যতম স্থান। এখানে অবস্থানের সময় আল্লাহপাক হাজীগণের দোয়া ফিরিয়ে দেন না। তাই একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। এ বিশাল সমাবেশে নামাজের পূর্বে হাজীদের উদ্দেশে মসজিদে নামিরাহ থেকে আরবিতে ভাষণ দেন সৌদি বাদশার প্রতিনিধি এবং তিনি নামাজের ইমামতিও করেন। নামাজ আদায়ের পর হাজীগণ দোয়াদরুদ এবং ক্ষমাপ্রার্থনায় মশগুল থাকেন। এসময় মানুষে মানুষে থাকে না কোনো ভেদাভেদ, হিংসাবিদ্বেষ। লাখ লাখ মানুষের এ জমায়েতের মাধ্যমে উদ্ভাষিত হয়ে ওঠে বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দৃশ্য।

সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আরাফাতের অবস্থান (ওকুফে আরাফা) শেষ করে আরাফাত থেকে ৪ কি. মি. উত্তরে মুজদালিফায় রওয়ানা দিতে হয়। মুজদালিফায় উপস্থিত হয়ে এশা ওয়াক্তে এক আযান দুই ইকামতে মাগরিবের তিন রাকাত ফরজ ও এশার দুই রাকাত (কছর) ফরজ নামাজ এবং বিতর আদায় করতে হয়। এ মুজদালিফায় উন্মুক্ত আকাশের নিচে হাজীগণের এক রাত অবস্থান করতে হয়। তা ওয়াজিব। মুজদালিফায় রাতযাপনের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন– ‘মুজদালিফায় রাত যাপনকারীদেরকে আল্লাহ নিজ রহমতের চাদর দিয়ে আবৃত্ত করে রাখেন এবং এ রাত স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে গোপন ও মনের কথাবার্তা বলার রাত। মিনায় শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করার জন্য ৪৯টি মুজদালিফা থেকে ছোট ছোট কঙ্কর সংগ্রহ করতে হয়।

হজের তৃতীয় দিন ১০ জিলহজ হাজীগণ খুবই ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে দিনভর হজের বিভিন্ন আহকাম পালন করতে থাকেন। ১০ জিলহজ ফজরের নামাজ মুজদালিফায় আদায় করে ২/১ কি.মি উত্তরে মিনায় রওয়ানা হতে হয়। মিনায় উপস্থিত হয়ে সর্বপ্রথমেই জামারায় উকবায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। হযরত ইবরাহিম (.) আল্লাহর নির্দেশে পুত্র হজরত ইসমাঈল (.)-কে কুরবানি দেওয়ার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় এ স্থানে শয়তান পেছন দিক থেকে হযরত ইবরাহিম (.)-কে ধোঁকা দিচ্ছিলো। তখন হজরত ইবরাহিম (.) শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করে বিতাড়িত করেছিলেন। তাই হাজীগণের জন্যে এ জায়গায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। তিন দিনে মোট ৪৯টি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। কঙ্কর নিক্ষেপের সময় তালবিয়া পাঠ নিষিদ্ধ। তবে প্রত্যেক কঙ্কর নিক্ষেপের সময় তাকবির বলতে হয় এবং ডান হাতের বৃদ্ধা ও শাহাদত আঙ্গুল দিয়ে নিক্ষেপ করতে হয়। ১০ জিলহজ জুমারায়ে উকবায়ে কঙ্কর নিক্ষেপের পর হাজীগণ দৌঁড়তে থাকেন কুরবানির উদ্দেশে। উট,গরু,ছাগল ও দুম্বা যেটা সম্ভব তা দিয়ে কুরবানি দিতে হয়। ১০ জিলহজ কুরবানি সম্পন্ন করে মাথা মুণ্ডাতে বা ছাঁটতে হয়। তারপর মক্কায় গিয়ে তাওয়াফে য়িয়ারত করতে হয়। এরপর সাফামারওয়ার মধ্যে সাতবার ‘সায়ি’ করতে হয়। এ তাওয়াফে জিয়ারত ১০ জিলহজ করতে পারলে ভালো। আর যদি ১০ জিলহজ করতে না পারেন তাহলে ১১ ও ১২ জিলহজও করা যাবে। তাওয়াফে জিয়ারত ও সায়ির পর পুনরায় মিনায় ফিরে যেতে হয়।

হজের চতুর্থ দিন ১১ জিলহজ হাজীগণ মিনার নিকটে মসজিদে খায়েফে জোহরের নামাজ আদায় করে সূর্য দুপুরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লে পর্যাক্রমে ছোটো, মেঝো ও বড়ো শয়তানের প্রতি ৭টি করে পরপর ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।

হজের পঞ্চম দিন ১২ জিলহজেও আগের দিনের মতো সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লে তিন শয়তানের প্রতি জামরায় ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ সম্পন্ন করে সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করে মক্কায় ফিরে যেতে হয়। এরপর মক্কা শরিফে এসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য ইবাদাত করবেন। তবে নফল তাওয়াফ করলে খুব বেশি সাওয়াব। পারলে প্রতিদিন তাওয়াফ করবেন। মক্কা শরিফ থেকে মদিনা শরিফ রাসুল (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করে দেশে ফিরলে মক্কা শরিফ ত্যাগের আগেই বিদায়ী তাওয়াফ করে নিবেন। আর যদি মদিনা শরিফ আগে যান তাহলে দেশে ফেরার আগে বিদায়ী তাওয়াফ করে নিবেন।

আসুুন, আমরা হজ পালনের মাধ্যমে প্রকৃত মুমিন হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করি। এবারের হজে নিজের জন্যে, পিতামাতার জন্যে, আত্মীয়স্বজনের জন্যে এবং বিশ্বের সকল মুমিনমুমিনাত, মুসলিমমুসলিমাতের জন্যে দোয়া করি। আল্লাহ্‌পাক আমাদের তাওফিক দান করুন।

লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক; প্রফেসর, আরবি বিভাগ,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসালমা চৌধুরী : শ্রদ্ধায় স্মরণ
পরবর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ-এর অন্ত্যমিল