বাংলা ভাষার বিশিষ্ট সাহিত্যে রসসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত সৈয়দ মুজতবা আলী। ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত ভারতের সিলেট জেলার করিমগঞ্জে তাঁর জন্ম। পিতা খানবাহাদুর সৈয়দ সিকন্দর আলী ছিলেন স্পেশাল সাব–রেজিস্ট্রার পদে ভারতে কর্মরত । মা আয়াতুল মন্নান খাতুন ছিলেন বাহাদুরপুর পরগনার প্রসিদ্ধ জমিদার মহসিন চৌধুরীর কন্যা।
সৈয়দ মুজতবা আলী ছাত্রজীবনেই তাঁর ব্যতিক্রমী প্রতিভার স্ফুরণ ঘটান। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথের সিলেট ভ্রমণের সময় তাঁর বক্তৃতা শুনে তিনি অত্যন্ত রবীন্দ্র অনুরাগী হয়ে ওঠেন। এমনকী ১৯২২ সালে তিনি বিশ্বভারতীতে ভর্তি হন। তখন বিশ্বভারতী সবেমাত্র স্থাপিত হয়েছে এবং রবীন্দ্রনাথ সেখানে পড়াতেন। তিনি সেখানে থেকে পাঁচ বছর পড়াশোনা করেন তিনিই বিশ্বভারতীর প্রথম মুসলিম ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি চলে যান আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সেখানে ছাত্র ইউনিয়নের সহ–সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি কাবুল যাওয়ার সুযোগ লাভ করে সেখানকার কৃষিবিজ্ঞান কলেজে সাধারণ বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। কিন্তু আফগানিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তিনি সেখান থেকে চলে যান জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানে মন না বসায়, বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে দু’বছর গবেষণার কাজ চালিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি মিশরের আল–আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো করতে যান। এবং সেখানে পরিচয় হয় ভারতের বরোদার মহারাজা সয়াজিরাও গাইকোয়াড়ের সঙ্গে, যিনি সে–সময় আল–আজহার পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। মহারাজের অনুরোধে সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৩৬ সালে দেশে ফিরে বরোদা কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। প্রায় আট বছর বরোদা কলেজে অধ্যাপনা করেন। বরোদার মহারাজের মৃত্যুর পর ১৯৪৪ সালে তিনি সেখানকার চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। আনন্দবাজার পত্রিকায় কলাম লিখতে শুরু করেন। এমনকী হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায়ও লেখালেখি আরম্ভ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুজতবা কলকাতা ছেড়ে ঢাকা চলে আসেন এবং বগুড়া কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর প্রগতিশীল মনোভাব কলেজ কর্তৃপক্ষের পছন্দ হয়নি, বিশেষভাবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বইটি প্রকাশের পর পরিস্থিতির চাপে পড়ে তিনি ভারতে চলে যান। যদিও ১৯৫১ সালে ঢাকায় রাবিয়া আলীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ইতিমধ্যে তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনের প্রথম ডিরেক্টর জেনারেলের পদে যোগদান করেন এবং সেখানে সাকায়তুল হিন্দ নামে একটি আরবি ত্রৈমাসিক সম্পাদনা করেন। ১৯৫২ সালে তাঁর কার্যকাল শেষ হলে তিনি দিল্লির অল ইন্ডিয়া রেডিওতে চাকরি নেন। আবার তিনি ফিরে এলেন বিশ্বভারতীতে, সেখানে প্রথমে জার্মান এবং পরে ইসলামি সংস্কৃতির অধ্যাপক নিযুক্ত হন। বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা, ইংরেজি ছাড়াও উর্দু, ফার্সি, ফরাসি, জার্মান ভাষা মাতৃভাষার মতো আয়ত্ত করেছিলেন। লাতিন ভাষাও জানতেন। সংস্কৃত ভাষায় ছিল তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সর্বমোট পনেরোটি ভাষায় ছিল তাঁর দখলে। ১৯৫৮ সালে তিনি আবার ইংল্যান্ড যান ও বিবিসিতে ভাষণ দেন। ১৯৬২–তে ফের জার্মানি ভ্রমণে যান। এরপর তিনি বোলপুরে ও কলকাতায় বসবাস করেন। ১৯৭০ সালে শেষবারের মতো জার্মানি ভ্রমণে যান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনি আবার ঢাকায় আসেন। ততদিনে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তিনি অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা চলে আসেন। ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সত্তর বছর বয়সে মৃত্যু হয়।
বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলী ফরাসি–জর্মন–হিব্রু–পাকতুনি–উর্দু–হিন্দি এবং আরও কয়েকটি দক্ষিণি ভাষায় তাঁর দক্ষতা ছিল। ইংরেজি তাঁর উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার ভাষা হলেও তার লেখালেখি প্রায় সবই বাংলায়। রসিকতার মোড়কে সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল তাঁর অনন্য ভাষা–শৈলী। তিনি বাংলা গদ্যে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিলেন, যাকে বলা যায় ‘রম্য–গদ্য’। তাঁর লেখায় প্রচুর বিদেশি শব্দ, প্রবাদ, প্রবচন, এবং কৌতুকপূর্ণ উপমার ব্যবহার দেখা যায়। তিনি যখন কোনো বিদেশি সংস্কৃতির কথা বর্ণনা করতেন, তখন তিনি সেই সংস্কৃতির কিছু শব্দ ও বাক্য এমনভাবে ব্যবহার করতেন যে, তা আর অপরিচিত মনে হয় না, বরং লেখার আকর্ষণ বাড়াত। এই বহুভাষিক শব্দজ্ঞান তাঁর লেখাকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর লেখার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল আত্মীয়তা। তার লেখা পড়লে মনে হয়, তিনি পাঠকের সঙ্গে যেন সরাসরি কথা বলছেন, এমন একটি ভঙ্গি তাঁর লেখায় সবসময় ফুটে উঠে। তিনি যেন পাঠককে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশীদার করে তুলছেন। এই অন্তরঙ্গতা পাঠককে তাঁর লেখার সঙ্গে এক ধরনের মানসিক সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে। সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা লেখক। তিনি কোনো ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তাঁর লেখা ছিল জীবন ও জগতের এক অন্বেষণ। তিনি মানুষের দুঃখ–বেদনা, আনন্দ–হাসি, ভয়–উৎকণ্ঠা– সবকিছুকেই তাঁর লেখার বিষয় করেছেন।
তাঁর রম্যরচনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে হালকা মনে হলেও, তার গভীরে আছে মানুষের অস্তিত্বের এক গভীর জিজ্ঞাসা। তিনি দেখিয়েছেন, হাসি আর কৌতুক কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং তা জীবনের জটিলতাকে বোঝার এবং মেনে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তিনি দেখিয়েছেন লেখালেখি কেবল সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে গুরুতর প্রবন্ধ লেখা বা গভীর উপন্যাস লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা রসিকতা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমেও প্রকাশ কর যায়। তাঁর লেখায় যে হাস্যরস আছে তা কেবল বিনোদনের জন্য না, বরং তা শাণিত বুদ্ধি এবং গভীর জ্ঞানের প্রকাশ। তিনি বাঙালির কৌতুকবোধকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তাঁর জীবন ও সাহিত্য আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, কৌতূহল, ভ্রমণ এবং মুক্ত মনই একজন মানুষকে পূর্ণতা দান করে। বাংলা সাহিত্যে তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি কৌতুক এবং জীবনকে এক অবিচ্ছেদ্য সুতোয় গেঁথেছেন। তিনি অসংখ্য গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। তাঁর লেখার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল রস এবং কৌতুকবোধ, যা অত্যন্ত গম্ভীর বিষয়কেও সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলে। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনাগুলো হলো ভ্রমণকাহিনি, ‘দেশে বিদেশে’। সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর বিশাল রচনাসম্ভার দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারকে অনেক সমৃদ্ধ করে গেছেন। তাঁর রচনাবলির মধ্য রয়েছে-(১) দেশে বিদেশে, (২) পঞ্চতন্ত্র, (৩) চাচা কাহিনী, (৪) ময়ূরকণ্ঠী, (৫) অবিশ্বাস্য, (৬) পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, (৭) জলে ডাঙ্গায়, (৮) ধূপছায়া, (৯) দ্বন্দ্ব মধুর, (১০) চতুরঙ্গ, (১১) শবনম, (১২) শ্রেষ্ঠ গল্প, (১৩) ভবঘুরে ও অন্যান্য, (১৪) বহু বিচিত্র, (১৫) শ্রেষ্ঠ রম্যরচনা, (১৬) টুনি মেম, (১৭) প্রেম, (১৮) বড়বাবু, (১৯) দু–হারা, (২০) পঞ্চতন্ত্র (২য় পর্ব), (২১) হাস্য–মধুর, (২২) পছন্দ সই, (২৩) রাজা উজির, (২৪) শহর–ইয়ার, (২৫) হিটলার, (২৬) কত না অশ্রুজল, (২৭) মুসাফির, (২৮) তুলনাহীন, (২৯) পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয়। উল্লেখ্য, তাঁর ‘তুলনাহীন’ বইটি মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে। সৈয়দ মুজতবা আলী বাঙালি জাতির জন্য এক সত্যিকারের নক্ষত্র। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ও জ্ঞানতাপস।












