নগরে সিএনজি বেবি টেক্সির ভাড়ার ক্ষেত্রে চলছে নৈরাজ্য। এখানে কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। কারো নির্দেশনা মানার রেকর্ড নেই। সব চলছে ইচ্ছেমতো। ১৯ অক্টোবর দৈনিক আজাদীতে ‘নগরে টেক্সি ভাড়া নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ কীভাবে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নগরীর জিইসি মোড় থেকে আগ্রাবাদ। দূরত্ব চার কিলোমিটারের কম। এই পথটুকু যেতে সিএনজিচালিত টেক্সিচালকেরা ভাড়া চাইছেন ২০০ টাকা। খুলশী থানার সামনে থেকে প্রবর্তক মোড়, দেড় কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে চাওয়া হয় ১৫০ টাকা। হালিশহর থেকে আগ্রাবাদ যেতে দুই কিলোমিটারের কিছু বেশি পথের ভাড়া ১৫০ টাকা। অথচ মিটারে চললে এসব গন্তব্যের ভাড়া এর অর্ধেকের কম হওয়ার কথা। নগরীতে এখন সিএনজি টেক্সিতে ওঠা মানে চালকের চাহিদামতো ভাড়া মেনে নেওয়া। দরদাম করে কিছুটা কমানো গেলেও নির্ধারিত ভাড়ায় গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। শুধু উৎসব–পার্বণ কিংবা বিশেষ দিন নয়, বছরের প্রতিটি দিন এভাবে বাড়তি ভাড়া গুণতে হচ্ছে নগরবাসীকে। অভিযোগ রয়েছে, নগরীতে চলাচলকারী বৈধ–অবৈধ মিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি সিএনজি টেক্সি থেকে প্রতিদিন দুই কোটি টাকার বেশি বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সেই হিসাবে মাসে বাড়তি ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ৬০ কোটি টাকা। মিটারে ভাড়া আদায়ের সরকারি উদ্যোগ প্রায় দুই দশক আগে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে এই ভাড়ার নৈরাজ্য চলছে। যাত্রীদের অভিযোগ, ভাড়া নির্ধারণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় চালকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছেন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সিএনজি টেক্সিতে মিটার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০০৫ সালে। ওই বছরের ৬ এপ্রিল সরকার সার্কুলার জারি করে ভাড়ার হার নির্ধারণ করে দেয়। একই সঙ্গে ১ জুনের মধ্যে চট্টগ্রামের সব ফোর–স্ট্রোক টেক্সিতে মিটার সংযোজনের নির্দেশ দেওয়া হয়। মিটার আমদানি ও সংযোজনের জন্য ছয়টি প্রতিষ্ঠানকেও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো টেক্সিতেই মিটার সংযোজন করা সম্ভব হয়নি। পরে দফায় দফায় সময় বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে টেক্সিমালিকেরা ওই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মিটার কেনেন। এসব প্রতিষ্ঠান টেক্সিমালিকদের কাছে অন্তত ১০ কোটি টাকার মিটার বিক্রি করেছিল। কিন্তু মিটারগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়নি। একপর্যায়ে মিটার চালুর উদ্যোগ থমকে যায়।
বলা চলে, সব মিলিয়ে দুই দশক ধরে রাজধানী শহর ও বাণিজ্যিক নগর চট্টগ্রামে অটোরিকশা সেবায় নৈরাজ্য চলছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক ও চালকদের দাবির মুখে অন্তত পাঁচবার ভাড়া ও দৈনিক জমা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু একবারও বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করতে পারেনি। সিএনজিচালিত অটোরিকশার নীতিমালায় চালক ও মালিকের শাস্তির বিধান রয়েছে। ২০১৮ সালে করা সড়ক পরিবহন আইনেও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, অটোরিকশার মতো কোনো কন্ট্রাক্ট ক্যারিজের চালকেরা যেকোনো গন্তব্যে যেতে রাজি না হলে, বেশি ভাড়া চাইলে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কর্তন করা হবে। এভাবে ১২ পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায়। সড়ক পরিবহন আইনে আরও বলা হয়েছে, মালিক নির্ধারিত দৈনিক জমার বেশি টাকা দাবি করলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা ৬ মাসের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হবেন। কিন্তু আইন থাকলেও কার্যকর হওয়ার কোনো নজির আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আইন করার পরই অটোরিকশার চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে তা প্রয়োগ করা উচিত ছিল। এত দিন বিআরটিএ ও পুলিশ কেন পারেনি, এর জবাব দরকার বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করতে পারে নি। এর কারণ বাসের মতো অটোরিকশাকেও তারা খুচরা পণ্যের মতো বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। হাজারো মালিক–শ্রমিক জন্ম দিয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। তাঁরা বলেন, অটোরিকশার চাহিদা থাকলে আরও বেশি করে নামানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বড় কোনো কোম্পানির অধীন শক্ত নীতিমালার আওতায় নামানো উচিত। বিদ্যমান ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা যাবে না। তাঁরা বলেন, এখানে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। নির্ধারিত ভাড়া দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ গ্রহণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।







