টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর পানি নামতে শুরু করলেও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিডিনিউজ জানায়, গতকাল শুক্রবার বিকালে চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় যে তথ্য দিয়েছে, তাতে বিভিন্ন উপজেলার সাড়ে সাত লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় থেকে জানানো হয়, শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ১৭৬টি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন লোক বন্যা আক্রান্ত হয়েছে।
এদিকে আমাদের বাঁশখালী প্রতিনিধি জানান, এই উপজেলায় পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানতিে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে উপজেলার ৪নং বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা ও ৩নং ওয়ার্ডের রত্নপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া শিশু দুটি হচ্ছে দক্ষিণ ইলশা গ্রামের প্রবাসী মোহাম্মদ কামালের পুত্র মোহাম্মদ আশিক (৮) এবং রত্নপুর এলাকার মোহাম্মদ দেলোয়ারের দ্বিতীয় পুত্র মোহাম্মদ মিরাজ (৬)। বাহারছড়া এলাকায় বন্যার পানি নেমে না যাওয়াতে মারা যাওয়া শিশুদের নামাজে জানাযা হাঁটু সমান পানিতে দাড়িয়ে অনুষ্ঠিত হয়। অপরদিকে সরলের পশ্চিম জালিয়াঘাটা এলাকায় গতকাল সকালে পা পিছলে পানিভর্তি বিলে পড়ে নিখোঁজ হয় আব্দুল করিমের কন্যা তাহিন নুর (১২)। সে ভাদালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী বলে জানা যায়।
বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস টিম সন্ধ্যায় তার লাশ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে বলে জানান বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো: মিজানুর রহমান।
বাঁশখালীর পশ্চিমাংশের ছনুয়া, শেখেরখীল, সরল কাহারঘোনাসহ বেশ কিছু এলাকা থেকে পানি নামেনি। একদিকে সাগরের জোয়ারের পানি অপরদিকে পাহাড়ি ঢলের কারণে অনেক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। রয়েছে খাবার পানির সংকট। বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করায় রান্নার চুলাও জ্বালানো যায়নি।। ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় ৪ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ও দেড় হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয় বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও শুকনো খাদ্য সামগ্রী ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়। তবে এসব প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানান ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন।
সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে, তবে অভ্যন্তরীণ সব সড়ক এখনো পানির নিচে
সাতকানিয়া প্রতিনিধি জানান, এই উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে । উঁচু এলাকা গুলো থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে । তবে এখনো সাতকানিয়ার ৯০ ভাগ এলাকা পানির নিচে। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে ৪ লক্ষাধিক মানুষ। বন্যা কবলিত এলাকার সব রাস্তা–ঘাট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অনেক বসত ঘরে এখনো বন্যার পানি। কেরানীহাট–বান্দরবান সড়কের বড়দুয়ারা, অলি আহমেদ কলেজের সামনে ও বুড়ির দোকান এলাকায় সড়কের উপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এ সড়কে এখন যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
এদিকে, বন্যার পানি কিছুটা কমলেও বিভিন্ন ইউনিয়নের আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া এবং বসত ঘরে পানিবন্দি অবস্থায় থাকা মানুষগুলো বিশুদ্ধ পানি ও খাবার নিয়ে সংকটের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া বসত ঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করায় অনেকে খাবার তৈরি করতে পারছেন না। সরকারি ও ব্যক্তিগত ভাবে কিছু শুকনো খাবার বিতরণ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বিদুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় অন্ধকারের মধ্যে পানিবন্দি অবস্থায় মানুষ অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে।
সরেজমিনে পরিদর্শন ও বন্যা কবলিত মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, পানি সামান্য কমলেও উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯০ ভাগ এলাকায় এখনো পানি রয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ, আদালত, পৌরসভা কার্যালয়ে এবং উপজেলা পরিষদ ও থানা কম্পাউন্ডে এখনো বন্যার পানি। কেরানীহাট–বাঁশখালী সড়কের বিভিন্ন স্থানে এখনো কোমর সমপরিমাণ পানি। অভ্যন্তরীণ সব সড়ক এখনো পানির নিচে।
চন্দনাইশে মাছের প্রজেক্ট ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
চন্দনাইশ প্রতিনিধি জানান, বন্যার পানিতে উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে। এখানে এখনো অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছে। তবে গতকাল ১০ জুলাই সকাল থেকে বৃষ্টিপাত কমে আসায় বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে। গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে চট্টগ্রাম–কঙবাজার জাতীয় মহাসড়কের চন্দনাইশ হাশিমপুর অংশ ডুবে প্রায় দেড় ফুট উচ্চতায় বন্যার পানি প্রবাহিত হয়েছিল। গতকাল মহাসড়ক থেকে পানি কিছুটা কমেছে। ওই স্থান দিয়ে বড় বড় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হলেও সিএনজি, প্রাইভেটসহ ছোট ছোট যানবাহন চলাচলে বেগ পেতে হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আজাদ হোসেন জানান, বন্যায় চন্দনাইশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২২০০ হেক্টর আউশ ধান, ৯০০ হেক্টর বিভিন্ন ধরনের সবজি, ৭০ হেক্টর পেঁপে ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলা মৎস্য অফিসের দেয়া তথ্যমতে, বন্যায় এ পর্যন্ত ৫০০টিরও অধিক পুকুর, মৎস্য প্রজেক্ট ডুবে সম্পূর্ণ মাছ ভেসে গেছে। এতে মৎস্য খামারীদের কমপক্ষে ১০ কোটি টাকার উপরে ক্ষতি সাধিত হয়।
ধোপাছড়ি ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আবদুল মান্নান রানা জানান, পাহাড়ি জনপথ ধোপাছড়ি ইউনিয়নের যোগাযোগের প্রধান সড়ক খানহাট–ধোপাছড়ি–বান্দরবান সড়কের মধ্যদিয়ে পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবাহিত হওয়ায় সড়কের বিভিন্ন অংশে ধসে পড়েছে, অনেক স্থানে ভেঙে তছনছ হয়ে পড়েছে। এতে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এছাড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় অসংখ্য পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, উপজেলায় ২৭টি আশ্রয়নকেন্দ্র খোলা হয়েছে।











