সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম

ও দৈনন্দিন টুকিটাকি

সাখাওয়াত হোসেন মজনু

সোমবার , ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ

: চট্টগ্রাম কলেজ-গৌরবের ১৫০ বছর।
: ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ, মাঝে ১৫০ বছরের আনন্দাশ্রু ও বেদনাবিধূরতায় সিক্ত এর পবিত্র অঙ্গন। পেছনে না গেলে তো আর ইতিহাসের পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না।
: কেন এবং কেমন করে চট্টগ্রাম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে তথ্যের দিকে যাওয়া যাক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এই দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করে বা মানুষের মঙ্গল চিন্তায় এই উপমহাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছিলেন এমন তথ্য সত্য ও সঠিক নয়। তবে তারা শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছিলো তাদের শাসন ও শোষণকে দীর্ঘমেয়াদী করার জন্য। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর আম্রকাননের যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদ দৌলা দেশীয় কুচক্রী এবং বেঈমানদের কারণে পরাজিত হলেন। বাংলা, বিহার, ওড়িষ্যার শাসন ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাতে। নানা কূটকৌশল ও এদেশীয় দালাল গোষ্ঠী সৃষ্টির মাধ্যমে পুরো ভারতকে তারা ব্রিটিশ রাজত্বের অধীনে নিয়ে যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ভারতবর্ষের ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে ব্রিটেনকে আরো সম্পদশালী করার জন্য তারা জাতিগত সিদ্ধান্ত নিলো।
: কি সেই সিদ্ধান্ত? হাজার বছরের চট্টগ্রামে শিক্ষা ঐতিহ্যের অংশটা ১৫০ বছর আগে কেমন করে শুরু হলো?
: ব্রিটিশরা সুকৌশলে একটি ইংরেজি শব্দ ছড়িয়ে দিলো। শব্দটি হলো জওঈঐ. এই শব্দটির বাংলা অর্থ ধনী কিন্ত ব্রিটিশরা এটাকে তাদের লুণ্ঠনের জন্য আসা একটি (ঈড়ফব ডড়ৎফ) কোড ওয়ার্ড। এই কোড ওয়ার্ডের বদৌলতে পুরো ভারতবর্ষের সম্পদ লুণ্ঠন শুরু করলো ব্রিটিশ শাসক ও তাদের বিভিন্ন ব্যবসায়িক শক্তি। পুরো জওঈঐ শব্দটির অক্ষরগত ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় জ-জঙই (লুণ্ঠন), ও-ওহফরধ (ভারত), ঈ. ঈড়সব (ফিরে আস), ঐ-ঐড়সব (ঘরে) অর্থাৎ জঙই ওঘউওঅ ঈঙগঊ ঐঙগঊ বাংলা করলে দাঁড়ায় ভারতকে লুণ্ঠন করে দেশে ফিরে আস। এর অর্থ হচ্ছে বা ব্রিটিশদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো শাসনের নামে শোষণ। এরপর তারা গ্রহণ করে ভিন্ন ধারার সিদ্ধান্ত। তাদের শাসন ও শোষণকে দীর্ঘায়িত করতে চাইছে। প্রশ্ন ছিলো তা কেমন করে? পলাশী যুদ্ধের পরতো ব্রিটিশ রাজশক্তি দিল্লির শাসনভার তাদের হাতে নিয়ে নেয়। তখন তারা শুরু করে ব্রিটিশ শক্তির জন্য একটি সুবিধাবাদী জনশক্তি। সেজন্য তারা সৃষ্টি করে একটি সুবিধাভোগী দালাল শ্রেণি, যাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিলো দুর্বল। তারা ছিলেন চিত্তে দুর্বল এবং বিত্তের জন্য কাঙাল। এই শ্রেণির ভারতবাসীর কাজ ছিলো-
১. ব্রিটিশদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করা ও তাদের অপশাসনক স্বীকৃতি দেয়া।
২. ভারতবর্ষের সম্মান ও মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত সুবিধা হাসিল করা।
এমন দুর্বল চিত্তের ভারতবাসী কিছু মানুষকে হাতে রাখার জন্য তারা অঞ্চলভিত্তিক কিছু পুতুল শাসক নিয়োগ প্রদান করে। তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও শাসন শোষণের সুবিধার জন্য ইংরেজ গোষ্ঠী কিছু পদবির সৃষ্টি করে। এতো কিছু করার পরও ব্রিটিশরা কোনোভাবেই ভারতবাসীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিলো না তারা।
১. ভারতবাসীরা তাদের কথা বুঝতে চাইছিলো না বা বুঝতে পারতো না।
২. ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহ বিপ্লব অঞ্চল ভেদে শুরু হয়ে যায়।
এমন যখন অবস্থা তখন ব্রিটিশ রাজগোষ্ঠী ভারতবর্ষের এবং অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যগুলো ধ্বংসের পথে এগুতে থাকেন। যেমন বলা যেতে পারে-
১. অঞ্চলভিত্তিক সংস্কৃতি, কৃষ্টি ধ্বংস করা শুরু করে।
২. সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির পথে পা বাড়ায়।
৩. এলিট শ্রেণি সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষে মানুষে বিভেদের সৃষ্টি করে।
এই কাজগুলো সফল বাস্তবায়নের জন্য তারা ইংরেজি ভাষাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উদ্দেশ্য ছিলো যেন পুরো দেশের মানুষরা ইংরেজদের কথা বুঝতে পারে। সেজন্যই তারা শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে ইংরেজিকে প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলো। সে কারণে তারা এদেশীয় শিক্ষা, সাহিত্য, কৃষ্টি ও ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে অনুপ্রবেশ করায় তাদের হিংস্রতার বীজ। ইংরেজ রাজশক্তি একাজ করে একটি ইংরেজি শিক্ষিত এলিট শ্রেণি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন ঠিকই কিন্তু ভারতবর্ষের মানুষরা এটাকে ব্রিটিশ তাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছিলেন। ফলে ১৯০ বছর পরে হলেও ব্রিটিশরা এদেশ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছিলো।
: ব্রিটিশরা কেমন করে শিক্ষায় এগিয়ে এলো?
: তাদের ইচ্ছা ছিলো ইংরেজি শিক্ষার প্রচলনের মাধ্যমে এদেশের মানুষকে স্থায়ী গোলামে পরিণত করবে। তাই তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে শুরু করে। ইংরেজ সমর্থিত এলিট হিন্দু ও মুসলমান সমাজ তাদের সমর্থন জানায়। এর পূর্বে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিলো বাড়ি, পরিবার, মক্তব, মঠ, কেয়াংভিত্তিক, মসজিদভিত্তিক। হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমানরা শিক্ষা গ্রহণ করে ধর্মীয় উপশনালয়ভিত্তিক। এর অবসান ঘটিয়ে শিক্ষাকে আরো উন্নত পর্যায়ে নেয়ার জন্য ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে টমাস ক্যারিংটন মেকলে শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের জন্য গভর্নর জেনারেলের নিকট প্রস্তাব দিলেন। সে প্রস্তাবটি দু’বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো। তারপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজ শুরু হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষার কার্যক্রম শুরু হয়। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন ও সিভিল সোসাইটিও এ প্রক্রিয়ার সাথে ছিলেন। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেন শহর চট্টগ্রামেই একটি মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে। শহরে স্থান নির্বাচন করা হলো। শহর বলতে সেই সময় পর্তুগীজ বণিকদের দু’চারটি দালান, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, চলার মতো সরু রাস্তা, উঁচু টিলা, টিলার উপর জঙ্গলাকীর্ণ জনপথ। এমন একটি স্থান উদ্যোক্তারা খুঁজে পেলেন। স্থানটির দক্ষিণে রহমতগঞ্জ, উত্তরে চকবাজার, পূর্বে চন্দনপুরা, পশ্চিমে জামালখান ও কাজির দেউড়ি। সেই স্থানটি ছিলো উঁচু-নিচু প্রাকৃতিক পরিবেশে পর্তুগীজদের একটি দুর্গ। উত্তরে বিশাল প্যারেড মাঠ। মাঠের দক্ষিণাংশে সেই দুর্গটিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিলো। স্কুল করার জন্য ২২টি কক্ষের একটি একতলা দালান, মোটা মোটা থাম বা পিলার দিয়ে। নাম দেওয়া হয়েছিলো ঈযরঃঃধমড়হম তরষষধ ঝপযড়ড়ষ. ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে স্কুলটি শুরু হয়েছিলো। প্রথম দিকে স্কুলটি প্রাথমিক স্তরে ছিলো, পরে স্কুলটি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রবেশিকা পর্যন্ত উন্নীত হয়। প্রবেশিকা পাসের পর স্কুলের শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষা নিতে পারছিলেন না। তাই একটি কলেজ করার চিন্তা এলো। সবার পক্ষেতো আর কোলকাতায় গিয়ে পড়া সম্ভব ছিলো না, তাইতো কলেজ করার পরিকল্পনা হলো। সেই সূত্রে ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হলো চট্টগ্রাম কলেজ। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর চট্টগ্রামের ছেলেরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। এ প্রসঙ্গে প্রমথনাথ ব্যানার্জি (চৎধসধঃযহধঃয ইধহবৎলবব) সম্পাদিত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, …ঈযরঃঃধমড়হম ঝপযড়ড়ষ (ঈযরঃঃধমড়হম ঈড়ষষবমব) ঈযরঃঃধমড়হম ঋরৎংঃ অভভরষরধঃরড়হ রহ ১৮৬৯. ওহ ঃযরং পড়ষষবমব ধিং ড়ঢ়বহবফ ধং ধ তরষষধ ঝপযড়ড়ষ রহ ১৮৩৬ নু ঃযব এবহবৎধষ ঈড়সসরঃঃবব ড়ভ চঁনষরপ রহংঃৎঁপঃরড়হ. ওঃ ধিং ৎধরংবফ ঃড় ধ ংবপড়হফ মৎধফব ঁঢ়ঃড় ঃযব ঋ.অ. ঝঃধহফধৎফ, ঋ.অ অর্থাৎ ঋরৎংঃ অৎঃ. কলেজটি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেলেও আর্থিক সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে মিরসরাই থানার ধুম নিবাসী জমিদার গোলক চন্দ্র সেন ১০ হাজার টাকা প্রদান করলে কলেজটি জীবন ফিরে পায়। এজন্য তিনি রায় বাহাদুর খেতাব পান।
: এ বছর চট্টগ্রাম কলেজের ১৫০ বছর সার্ধশত বছর।
: ইতিহাস ঐতিহ্যকে রক্ষার জন্য অনেকে চেষ্টা করেছেন এবং করছেন। আগামী ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কলেজের কিছু প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রাক্তন কর্মকর্তা-কর্মচারী সতীর্থদের কল্যাণ কামায় পালন করছেন সার্ধশত বছরটি। চট্টগ্রাম কলেজ ফাউন্ডেশনের ব্যানারে তারা এগুচ্ছেন। একজন অসহায়, অসুস্থ প্রাক্তন ছাত্রকে চিকিৎসায় কয়েক লক্ষ টাকা দানের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রা। তাদের সাফল্য কামনা করে আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এগুচ্ছেন সার্ধশত বছরের অনুষ্ঠানমালায়। সবার জয়গান গাইছি, গাইছি সম্প্রীতির মিলন মেলা ২০১৯ সফল হোক, মুখরিত হোক সকলের হৃদয় মন। বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে এই কলেজের সকল শহীদ, মুক্তচিন্তার প্রাক্তনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জয় গান গেয়ে বলছি চট্টগ্রাম কলেজ জ্ঞানচর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। প্রথম প্রিন্সিপাল জে সিসহ সকল শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলকে জানাই সার্ধশত বছরের শুভেচ্ছা।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

x